কোনও তরুণের মৃত্যুকে শুধু একটি পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। বিশেষ করে সেই তরুণ যখন নিজের মেধা, স্বপ্ন, সংবেদনশীলতা এবং সংগ্রাম দিয়ে জীবনের একটি নতুন পথ তৈরি করছিল। আইআইটি-দিল্লির ৩১ বছর বয়সি এমএসসি পদার্থবিদ্যার ছাত্র ঋষিকেশ কুমারের মৃত্যু তাই নিছক একটি দুঃখজনক ঘটনা নয়। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে এক অপূর্ণ সম্ভাবনার বেদনা— একজন মেধাবী ছাত্র, একজন শিক্ষক, একজন কবিতা-প্রেমী মানুষ এবং অসংখ্য বন্ধুর নির্ভরতার জায়গা হয়ে ওঠা একজন তরুণের অকাল প্রস্থান।
ঋষিকেশকে যাঁরা কাছ থেকে চিনতেন, তাঁদের স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে তাঁর কবিতা আবৃত্তির ছবি। বন্ধুদের ছোট্ট আড্ডা হোক কিংবা ক্যাম্পাসের বড় অনুষ্ঠান— সুযোগ পেলেই তিনি শায়রি আবৃত্তি করতেন। তাঁর কথার মধ্যে ছিল প্রাণ, আবেগ এবং এক ধরনের আকর্ষণ। এমনকি সাধারণ কথাবার্তাও তাঁর মুখে এতটা জীবন্ত হয়ে উঠত যে অপরিচিত মানুষও দাঁড়িয়ে শুনতেন। একজন ভালো বক্তা হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন অনুভূতিশীল কবি। নিজের কবিতা তিনি হিন্দিতে লিখতেন, স্বাক্ষর করতেন, তারিখও দিতেন। তাঁর শেষদিকের একটি প্রকাশ্য কবিতা পাঠে স্বাধীনতা ও বিধিনিষেধের সম্পর্ক নিয়ে তিনি যে কবিতা পড়েছিলেন, তার মধ্যেও ছিল সমাজ ও মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর গভীর ভাবনা।
এই তরুণটির জীবনপথও ছিল সহজ নয়। বিহারের বেগুসরাই থেকে তাঁর পরিবার পাটনায় চলে আসে। রাউরকেলার এনআইটি-তে বিটেক পড়তে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিস্থিতির কারণে ২০১৯ সালে সেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। সেখানেই তাঁর পথ থেমে যায়নি। পরে পাটলিপুত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি সম্পূর্ণ করেন। তারপর আইআইটি-জ্যাম পরীক্ষায় সারা দেশে ৪০তম স্থান অর্জন করে ২০২৫ সালে আইআইটি-দিল্লির এমএসসি পদার্থবিদ্যা কোর্সে ভর্তি হন।
এই যাত্রাপথটি বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। কারণ এটি বলে দেয়, জীবনের প্রথম ধাক্কা কাউকে শেষ করে দেয় না। ঋষিকেশ নিজের পথ নিজেই আবার তৈরি করেছিলেন। শুধু পড়াশোনা নয়, কয়েক বছর ধরে তিনি বিজ্ঞান ও গণিত পড়িয়েছেন। প্রথমে স্বাধীনভাবে শিক্ষকতা করেছেন, পরে পাটনার একটি কোচিং প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন, পাশাপাশি অনলাইনেও ছাত্র পড়িয়েছেন। অর্থাৎ তিনি শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেননি, অন্যদের ভবিষ্যৎ গড়তেও সাহায্য করেছেন।
মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে তিনি যোধপুরে একটি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী শিক্ষকতার চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন বলে তাঁর পরিবার জানিয়েছে। সামনে ছিল একটি নতুন জীবন, নতুন কাজ, নতুন সম্ভাবনা। অথচ সেই সম্ভাবনার মাঝেই তাঁর জীবন থেমে গেল।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হল, তাঁর মানসিক যন্ত্রণার কিছু লক্ষণ পরিবার ও চিকিৎসকদের নজর এড়ায়নি। তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার কারণে তাঁকে কিছুদিন বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। এমনকি দুটি সেমেস্টার থেকে তিনি বিরতিও নিয়েছিলেন। অর্থাৎ সমস্যাটি ছিল বাস্তব এবং তা মোকাবিলার চেষ্টাও চলছিল। তাঁর মা-ও এক মাসের বেশি সময় ধরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তবু সবকিছু সামলানো যায়নি।
মৃত্যুর আগের রাতের মায়ের স্মৃতি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ঋষিকেশ মাথায় দু’হাত দিয়ে কাঁদছিলেন। মাকে বলেছিলেন, তাঁর জন্য মাকে কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে এবং তিনি আর বাঁচতে চান না। মা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, হাসপাতালে নিয়ে যাবেন, চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন। একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া আর কী হতে পারে? তিনি তাঁর সন্তানকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরদিনই ঘটে গেল সেই মর্মান্তিক ঘটনা।
এই জায়গাতেই আমাদের থামতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়— একজন মানুষ যখন ভিতর থেকে ভেঙে পড়ছেন, তখন তাঁর চারপাশের মানুষ তাঁকে কীভাবে আরও নিরাপদ করে
তুলতে পারেন?
ঋষিকেশের বন্ধুরা আজ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। কারণ তাঁরা তাঁকে এমন একজন মানুষ হিসেবেই চিনতেন, যিনি অন্যদের পাশে থাকতেন। তাঁর দাদার কথায়, তিনি ছিলেন তাঁর নিজের ‘ভরসার স্তম্ভ’। ছোট ভাই আইআইটিতে পড়ছে— এই কথা বলতে তাঁর গর্ব হতো। ঋষিকেশের নিজের কাছেও আইআইটি ছিল স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নপূরণের পরও মানুষের ভিতরে যে অদৃশ্য লড়াই চলতে পারে, সেটি হয়তো তাঁর কাছের মানুষদেরও পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি।
এখানেই মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে। আমাদের সমাজে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে কথা বলা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু মন খারাপ, দীর্ঘস্থায়ী হতাশা, একাকিত্ব, উদ্বেগ কিংবা বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলার মতো অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে এখনও অনেকেই সংকোচ বোধ করেন। বিশেষ করে মেধাবী তরুণদের ক্ষেত্রে একটি ভুল ধারণা আরও বেশি কাজ করে— যে ছেলে এত কিছু করতে পারে, সে নিজের সমস্যাও নিশ্চয়ই সামলে
নিতে পারবে।
এই ধারণা বিপজ্জনক। মেধা মানুষকে মানসিক কষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে না। বরং অনেক সময় অত্যন্ত মেধাবী এবং সংবেদনশীল মানুষ নিজের ব্যর্থতা, অপূর্ণতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যদের তুলনায় আরও গভীরভাবে ভাবতে পারেন। বাইরে থেকে যাকে আত্মবিশ্বাসী মনে হয়, তার ভিতরেও থাকতে পারে তীব্র অস্থিরতা।
আইআইটি বা অন্য কোনও নামী প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতামূলক। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে প্রতিযোগিতা যেন এমন জায়গায় না পৌঁছয়, যেখানে ছাত্র নিজেকে শুধু নম্বর, র্যাঙ্ক, গবেষণা, চাকরি বা সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করতে শুরু করে। জীবনের মূল্য কোনও পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে অনেক বড়।
ঋষিকেশের জীবন আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়। মানুষের পরিচয় একমাত্র তার পেশা বা ডিগ্রি নয়। তিনি ছিলেন পদার্থবিদ্যার ছাত্র, শিক্ষক, কবিতা লিখতেন, শায়রি আবৃত্তি করতেন, সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে ভাবতেন এবং বন্ধুদের পাশে দাঁড়াতেন। একজন মানুষের মধ্যে কতগুলি পরিচয় একসঙ্গে বাস করে— তারই সুন্দর উদাহরণ ছিলেন তিনি।
তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন শুধু কাউন্সেলিং পরিষেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। প্রয়োজন এমন একটি মানবিক পরিবেশ, যেখানে ছাত্র নিজের দুর্বলতার কথা বলতে পারে। শিক্ষক শুধু ফলাফল নয়, ছাত্রের আচরণের পরিবর্তনও লক্ষ করবেন। বন্ধুরা শুধু একসঙ্গে পড়বে না, একে অন্যের মনও বুঝতে চেষ্টা করবে। পরিবারও সন্তানের কাছে এমন নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠবে, যেখানে ব্যর্থতা বা হতাশার কথা বললে বিচার নয়, সহানুভূতি মিলবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখা। মানসিক সংকটে থাকা একজন মানুষকে দ্রুত পেশাদার সহায়তার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাকে একা না রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনও তরুণ যদি বলে যে, সে আর বাঁচতে চায় না, সেই কথাকে কখনও সাময়িক আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
ঋষিকেশের মৃত্যু আমাদের কাছে শুধু শোকের বিষয় হয়ে থাকলে চলবে না। তাঁর অসমাপ্ত কবিতাগুলির মতোই তাঁর জীবনও আমাদের কাছে একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন রেখে গেল। কেন একজন মানুষ, যার সামনে নতুন চাকরি, নতুন জীবন এবং আরও অনেক সম্ভাবনা ছিল, সেই সম্ভাবনাগুলি দেখতে পেলেন না? আমরা হয়তো এই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর কোনও দিনই পাব না।
কিন্তু তাঁর স্মৃতির প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা হবে যদি আমরা অন্তত এটুকু নিশ্চিত করতে পারি যে ভবিষ্যতে কোনও মেধাবী, সংবেদনশীল তরুণ নিজের অন্ধকারের মধ্যে একা হয়ে না পড়ে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান দেওয়ার জায়গা নয়; সেটি মানুষের বেড়ে ওঠারও জায়গা। সেখানে যেমন মেধার বিকাশ দরকার, তেমনই দরকার বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা, সৃজনশীলতা এবং নিরাপত্তার অনুভূতি। একজন ছাত্রের হাতে বই থাকবে, পরীক্ষার প্রস্তুতি থাকবে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকবে— কিন্তু তার পাশে এমন মানুষও থাকবে, যাকে সে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারবে।
ঋষিকেশ কবিতা লিখতেন। কবিতা মানুষের ভিতরের অন্ধকার ও আলোকে ভাষা দেয়। তাঁর নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টি আমরা বদলে দিতে পারব না। কিন্তু তাঁর স্মৃতি থেকে হয়তো আমরা একটি নতুন শিক্ষা নিতে পারি— কোনও তরুণের মেধার চেয়ে তার জীবন বড়, কোনও সাফল্যের চেয়ে তার সুস্থতা বেশি মূল্যবান।
মেধার দৌড়ে হারিয়ে যাওয়া আরও এক তরুণ
একজন মেধাবী ছাত্রের মৃত্যু কখনও কাম্য নয়। একজন কবির অসমাপ্ত কবিতা, একজন শিক্ষকের অসমাপ্ত পাঠ, একজন ভাইয়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন— সব মিলিয়ে ঋষিকেশের চলে যাওয়া সমাজের জন্য এক গভীর মানবিক শোক। এই শোক যেন শুধু চোখের জল হয়ে না থাকে, তা যেন আমাদের শিক্ষা ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও মানবিক করে তোলে।