বিগত কয়েক বছর ধরে এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ও অন্যান্য বড় নির্বাচন পরিচালনা করতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে মোতায়েন করা হচ্ছে। প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ হাজারের কেন্দ্রীয় বাহিনী ইতিমধ্যেই জেলায় জেলায় পৌঁছতে শুরু করেছে। সমস্যা হল, এঁদের থাকার জন্য স্কুল বিল্ডিংগুলিকেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অধিগ্রহণ করা হয়। এর ফলে বহু স্কুলকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি ঘোষণা করতে হয়। স্বাভাবিক কারণে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা থেকে মিড-ডে মিল, সব কিছুরই নীরবে অপূরণীয় ক্ষতি হতে থাকে। আগের নির্বাচনগুলিতে এই নিরাপত্তারক্ষীদের দল এক-একটি বিদ্যালয়ে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত থেকেছে বলে সংবাদে জানা গিয়েছিল। প্রশাসনকে বহু অনুরোধ করে চিঠি পাঠিয়েও নিরাশ হতে হয়েছিল সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনের ঘোষণার আগে থেকেই রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনী পাঠাচ্ছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। প্রশ্ন উঠেছে, এঁদের থাকার জন্য বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কলেজের বদলে সরকারি, বেসরকারি প্রেক্ষাগৃহ, কিসান মান্ডির কথা কি ভাবা যেতে পারে?এমনিতেই বর্তমানে এ রাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থা নানা কারণে দৈন্যদশায় ভুগছে। উপযুক্ত সংখ্যক শিক্ষক নেই, নেই পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, রয়েছে নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতিও। তার উপর উচ্চ ডিগ্রি সম্পন্ন শিক্ষা লাভ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ না-থাকায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা।
বিষয়টা এমন দাঁড়াচ্ছে, যেন সরকার নিজেদের হাত থেকে শিক্ষাকে ঝেড়ে ফেলতে পারলেই বাঁচে। তাই ছাত্রছাত্রীদের পড়ার পরিবেশ নষ্ট না করতে প্রশাসনকেই এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ করতে হবে।বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভোট নেই। তাই পশ্চিমবঙ্গের সরকার তাদের সার্বিক কল্যাণ বিষয়ে বিশেষ ভাবিত নয়— এমন অভিযোগ হামেশাই শোনা যায়। অভিযোগটি যে আদৌ মিথ্যা নয়, সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলির দৈনন্দিন পঠনপাঠনের অবস্থা, শিক্ষক-ছাত্রের অনুপাত, স্কুলবাড়িগুলির হাল, মিড-ডে মিলের বরাদ্দ, তার প্রমাণ বহন করে।
নির্বাচন তাতে আরও এক বাড়তি উপদ্রব স্বরূপ। এই বছর যেমন পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই স্কুলগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর চলে আসার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। ১৫ মার্চের মধ্যেই স্কুলগুলিতে বাহিনী পৌঁছে গেছে। এখনও শেষ হয়নি উচ্চ মাধ্যমিকের প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা। আগামী এক মাসের মধ্যে শুরু হতে চলেছে প্রথম পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষাও। তার আগে এখন থেকেই জেলা সদর ও শহরের বেশ কিছু স্কুলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর থাকার বন্দোবস্ত করার তোড়জোড় চলছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনী স্কুলে থাকতে চলে এলে কী ভাবে উচ্চ মাধ্যমিকের প্র্যাক্টিক্যাল শেষ হবে, কী ভাবেই বা প্রথম পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষা নেবে স্কুলগুলি— তা নিয়ে রীতিমতো উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যেই থানা থেকে তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কবে থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী স্কুলে থাকবে।
অনেক স্কুলে ১৫ মার্চ থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী ঢুকে পড়েছে। বহু স্কুল আছে যেখানে স্কুলে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা অনেক। তাদের প্রশ্ন, যে সব স্কুলে পড়ুয়া কম বা প্রায় নেই, এমন স্কুলে কেন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে পাঠানো হচ্ছে না। বহু স্কুল প্রশাসনকে জানিয়েছে যাতে কোনও ভাবেই ১৮ মার্চের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী স্কুলে না আসে। কারণ,১৮ মার্চের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী ঢুকলে উচ্চ মাধ্যমিকের প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা শেষ করতে অসুবিধা হবে।আবার অনেক স্কুল তাদের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে,কিন্তু সব স্কুলের সে সুবিধা নেই।
কিন্তু পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষা কী ভাবে হবে তা নিয়ে মাথায় হাত স্কুল কর্তৃপক্ষের। অনেক স্কুলে ১০ মার্চ থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।কিছু স্কুলে মেয়েদের হস্টেল রয়েছে। তা হলে হস্টেলের মেয়েদেরও ছুটি দিতে হবে। তাদের পড়াশোনা কী ভাবে হবে? দু’বেলা উচ্চ মাধ্যমিকের প্র্যাক্টিক্যাল নিয়ে পরীক্ষা শেষ করার পরিকল্পনা করছে অনেক স্কুল। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের পক্ষেও এক দিনে দু’বেলা প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা দেওয়া খুব কঠিন। বহু স্কুল একাধিক কোম্পানি বাহিনী পাঠানোর কথা হয়েছে সেক্ষেত্রে প্রথমে এক কোম্পানি বাহিনীকে স্কুলের দোতলায় কোনও ঘরে রেখে ক্লাস করা যাবে বলে ভাবা হচ্ছে। এখন থেকে স্কুল ছুটি হয়ে গেলে তো প্রথম পর্যায়ক্রমিকের পাঠ্যক্রমই শেষ হবে না।
স্কুল বন্ধ করে অনলাইনে ক্লাস করলে সেখানে সব পড়ুয়া থাকে না। শিক্ষকদেরও একটি বা দু’টি ক্লাস নিতেই ডেটা শেষ হয়ে যায়। ভোটের দিন ঘোষণা হল কি হল না,স্কুলে স্কুলে কেন্দ্রীয় বাহিনী চলে এলে কী ভাবে পঠনপাঠন হবে? নির্বাচন কমিশন অবশ্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে কেন্দ্রীয় বাহিনী কোথায় থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে স্কুলেই রাখতে হবে, এমন কোনও নির্দেশ কমিশনের তরফ থেকে নেই।স্কুলগুলিতে দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে থাকতে দেওয়ার সমস্যাটি দ্বিবিধ। প্রথমটি দৈনন্দিন পঠনপাঠন চালিয়ে যাওয়ার, বাহিনীর উপস্থিতিতে যে কাজ নির্বিঘ্নে করা সম্ভব নয়। গত কয়েক মাস ধরে রাজ্যের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন এক বিরাট সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকা।
এই দায়িত্বপূর্ণ কাজের চাপে সহজবোধ্য কারণেই তাঁদের পক্ষে বিদ্যালয়ে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ইতিমধ্যেই প্রবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনা। তার জের পুরোপুরি না কাটতেই নির্বাচনের ধাক্কা। সিলেবাস তবে শেষ হবে কোন উপায়ে? উচ্চ মাধ্যমিকের প্র্যাক্টিক্যাল যদিও বা দ্রুত শেষ করা যেতে পারে, পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষার কী ব্যবস্থা হবে? না কি সমগ্র নির্বাচন-পর্ব জুড়ে পরীক্ষা-পড়াশোনা সব শিকেয় তুলে বসে থাকাই এ রাজ্যের শিক্ষার্থীদের নিয়তি? অফলাইন ক্লাস বন্ধ রেখে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার পরিণতি কোভিডকাল দেখেছে। তার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা।
ফের সেই পথে হাঁটার চেষ্টাটি বাস্তবসম্মত হবে কি? সরকারি স্কুলে সমাজের সমস্ত আর্থসামাজিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে। ক’জনের পক্ষে সম্ভব ইন্টারনেট, ল্যাপটপ, মোবাইলের ব্যবস্থা করে শ্রেণিকক্ষের মতো নিয়ম মেনে ক্লাস করা? দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীর যেখানে নিজস্ব একখানা ঘরও জোটে না, সেখানে অন্য ব্যবস্থা দিবাস্বপ্নমাত্র। দ্বিতীয় সমস্যাটি পরিকাঠামোগত। দীর্ঘ দিন কেন্দ্রীয় বাহিনী অবস্থান করার ফলে বিদ্যালয় চত্বরটি যে ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে, সে অভিযোগ শিক্ষকরা বহু বার করেছেন।
তদুপরি সামনেই গ্রীষ্মকাল। ফের লম্বা ছুটির অপেক্ষা। অবস্থা বর্তমানে এমন দাঁড়িয়েছে, বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষা দেওয়ার কাজটি চালিয়ে যাওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে মসৃণ রেখে বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব বহু বার দেওয়া সত্ত্বেও সরকারি স্তরে তেমন ভাবনার ইঙ্গিত মেলেনি। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে রাজ্যের কোর্টে বল ঠেলে দায় ঝেড়ে ফেলেছে, রাজ্য প্রশাসন স্কুলগুলিকে বাহিনী আসার খবর জানিয়েই ক্ষান্ত দিয়েছে। মাঝখান থেকে অবরুদ্ধ এক বিরাট সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ।