পড়াশোনার চাপ ও সৃজনশীলতার সংকট: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোথায় দাঁড়িয়ে

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

শতাব্দী মালিতা

বর্তমান সময়ে শিক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো— আমরা কি জ্ঞান অর্জন করছি, নাকি শুধু নম্বর সংগ্রহ করছি? প্রতিযোগিতার এই তীব্র যুগে পড়াশোনার চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষা আর আনন্দের বিষয় নয়, বরং এক ধরনের মানসিক বোঝা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি সৃজনশীলতার সংকটে ভুগছে?

শিক্ষা মূলত মানুষের সামগ্রিক বিকাশের মাধ্যম। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ পরীক্ষামুখী হয়ে পড়ছে। মনোবিজ্ঞানী জ্যঁ পিয়াজেঁ তাঁর জ্ঞানীয় বিকাশ তত্ত্বে বলেছেন, শিশুর শেখার প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে অনুসন্ধান, কৌতূহল ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এগোয়। কিন্তু যখন শেখা মুখস্থনির্ভর হয়ে যায়, তখন এই স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা তথ্য জানে, কিন্তু চিন্তা করতে শেখে না।


অন্যদিকে, ভাইগটস্কি (Lev Vygotsky)সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার গুরুত্বের কথা বলেন। তাঁর “Zone of Proximal Development” তত্ত্ব অনুযায়ী, শেখার জন্য সহযোগিতামূলক পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। অথচ বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে সহপাঠী যেন সহযোগী নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী। এই মানসিকতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপ ও বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আজকের শিক্ষার্থীদের মনোভাবও পরিবর্তিত হয়েছে। তারা সচেতন, কিন্তু একই সঙ্গে উদ্বিগ্ন। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, ক্যারিয়ার নিয়ে চাপ এবং সামাজিক তুলনার সংস্কৃতি তাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে। অনেকেই মনে করে, নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলে হয়তো স্থায়ী ভবিষ্যৎ পাওয়া যাবে না। ফলে তারা আগ্রহের পরিবর্তে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এতে সৃজনশীলতা ধীরে ধীরে দমে যাচ্ছে।

অভিভাবকদের মনোভাবও এই বাস্তবতাকে প্রভাবিত করছে। অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানের সাফল্যকে নম্বর ও পেশার মাধ্যমে বিচার করেন। মনোবিজ্ঞানী কার্ল রজার্স মানবতাবাদী তত্ত্বে বলেছেন, শর্তহীন সমর্থন (unconditional positive regard) ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন ভালোবাসা শর্তসাপেক্ষ হয়ে যায়— অর্থাৎ ফলাফল ভালো হলে তবেই প্রশংসা— তখন শিশুর আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সৃজনশীলতার প্রসঙ্গে হাওয়ার্ড গার্ডনার তাঁর ‘Multiple Intelligences’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, বুদ্ধিমত্তা একমাত্র একাডেমিক দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংগীত, শিল্প, আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা— সবই বুদ্ধিমত্তার অংশ। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও মূলত ভাষা ও গণিত দক্ষতাকেই মূল্যায়ন করে। ফলে অনেক প্রতিভা অদেখাই থেকে যায়।

এছাড়া সৃজনশীলতার সঙ্গে আনন্দ ও মনোযোগের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিহাই চিকসেন্টমিহাই ‘Flow’ ধারণার কথা বলেন— যেখানে ব্যক্তি সম্পূর্ণ মনোনিবেশ ও আনন্দের সঙ্গে কাজ করে। কিন্তু অতিরিক্ত চাপ ও সময়ের অভাবে শিক্ষার্থীরা এই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পড়াশোনা তখন আর অনুসন্ধান নয়, হয়ে ওঠে কেবল দায়িত্ব।

বর্তমান সমাজে নানা ঘটনা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। বর্তমান সময়ে পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান মানসিক অবসাদ ও সৃজনশীলতার সংকট এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজ্যে বোর্ড পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যে আত্মহনন বা তীব্র বিষণ্ণতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে কেবল নম্বরের ভিত্তিতে মেধা যাচাইয়ের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যখন একজন শিক্ষার্থী তার পছন্দের বিষয় বেছে নিতে পারে না এবং পরিবারের প্রত্যাশার চাপে নিজের সহজাত আগ্রহকে বিসর্জন দেয়, তখন তার সত্তার এক বড় অংশ চাপা পড়ে যায়। এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে ফলাফল সামান্য খারাপ হলেই সামাজিক তুলনা ও গ্লানি তাদের আত্মবিশ্বাসকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বর্তমান যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কোনো সৃজনশীল দিকে আকৃষ্ট হওয়ার সুযোগ দেয় না; ফলে ব্যর্থতার মুহূর্তে মানসিক আশ্রয় হিসেবে তাদের কাছে শিল্প, সাহিত্য বা কোনো সৃষ্টিশীল শখ অবশিষ্ট থাকে না।

এই শূন্যতাই তাদের অবসাদকে আরও ঘনীভূত করে। অথচ শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল কৌতূহল মেটানো আর নতুন ভাবনার বিকাশের ক্ষেত্র। অভিভাবক ও সমাজকে বুঝতে হবে যে, জীবন কেবল সাফল্যের সিঁড়ি নয়, বরং শেখার এক আনন্দময় পথ। পড়াশোনার চাপকে সৃজনশীলতার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ করতে না পারলে আমরা কেবল নম্বরধারী যন্ত্র তৈরি করব, প্রাণোচ্ছল মানুষ নয়। তাই ভবিষ্যতের স্বার্থে শিক্ষাকে মানবিক করে তোলা এবং নম্বরের চেয়ে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া আজ সময়ের দাবি। বর্তমান বিশ্বে কিশোর-যুব মানসিক স্বাস্থ্য একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে আত্মহত্যা চিহ্নিত হয়েছে— যা সমস্যার তীব্রতাকে স্পষ্ট করে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই বয়সগোষ্ঠীতে প্রায় ৫৯ হাজারের বেশি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। করোনাকাল (২০২০–২০২১) চলাকালে ১২–১৭ বছর বয়সী কিশোরীদের আত্মহত্যার প্রচেষ্টাজনিত জরুরি বিভাগে আসার সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা মানসিক চাপ দ্রুত বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

এই পরিস্থিতির পেছনে বহুস্তরীয় কারণ কাজ করছে। প্রথমত, শিক্ষাজীবনে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে চাপ বাড়াচ্ছে। দ্বিতীয়ত, হতাশা, উদ্বেগ, ট্রমা, মাদকাসক্তি ইত্যাদি মানসিক সমস্যার সঙ্গে আত্মহানিমূলক চিন্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পরিবারে অশান্তি, শৈশবের প্রতিকূল অভিজ্ঞতা, কিংবা সামাজিক বৈষম্যও ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকা অধিকাংশ তরুণের ক্ষেত্রে আগে থেকেই বিষণ্নতা বা উদ্বেগজনিত লক্ষণ উপস্থিত থাকে।

ডিজিটাল যুগ এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। প্রায় সব কিশোরই অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। এর ইতিবাচক দিক থাকলেও অতিরিক্ত ব্যবহার ঘুমের ব্যাঘাত, সামাজিক তুলনা, সাইবার বুলিং ও একাকীত্বের অনুভূতি বাড়াতে পারে। বুলিং বা সাইবার বুলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে দুঃখবোধ ও আত্মহানিমূলক চিন্তা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তবে এই সংকটের মাঝেও আশার জায়গা রয়েছে— সৃজনশীলতা ও সামাজিক সংযোগ। মানুষ কেন সৃজনশীল হবে? কারণ সৃজনশীল কাজ মনকে প্রকাশের সুযোগ দেয়, চাপ কমায় এবং আত্মমর্যাদা বাড়ায়। পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও নান্দনিক চর্চা মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কবিতা আবৃত্তি, গান, নাচ, ছবি আঁকা বা সৃজনধর্মী লেখালেখি— এসব কার্যকলাপ আবেগকে সুস্থ পথে প্রকাশ করতে সাহায্য করে।

মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সামাজিক সম্পর্কও অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক একধরনের সুরক্ষা বলয় তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের শক্তিশালী সামাজিক সমর্থন থাকে তাদের মধ্যে মানসিক সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা বেশি। তাই নিয়মিত বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, দলগত খেলাধুলায় অংশ নেওয়া বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা মানসিক স্থিতি বাড়ায়।

এছাড়া জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনে ভ্রমণ বা প্রকৃতির সংস্পর্শে যাওয়া মানসিক ক্লান্তি কমায়। নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা সৃজনশীল কর্মশালায় অংশ নেওয়া মনকে সতেজ করে এবং নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে রাখে।

সবশেষে বলা যায়, কিশোর-যুব মানসিক স্বাস্থ্য সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক দায়িত্বও। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং সমাজ— সবার সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। পড়াশোনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সৃজনশীলতা, বিশ্রাম, সম্পর্ক ও আত্মপ্রকাশের সুযোগও সমান জরুরি। একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা গড়ে তুলতে পারলেই তরুণ প্রজন্ম চাপের মাঝেও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারবে এবং একটি সুস্থ, সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।