খাদ্য মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান একটি মৌলিক চাহিদা। শুধুমাত্র ক্ষুধা নিবারণের জন্য নয়, সুস্থ, সবল এবং উৎপাদনশীল জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আমরা যে খাবার গ্রহণ করি, তা-ই আমাদের শরীর, স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষমতাকে নির্ধারণ করে। তাই সেই খাদ্য যদি অনিরাপদ, দূষিত বা ভেজালযুক্ত হয়, তবে তার পরিণতি হয় মারাত্মক। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর’-এর অধীনে থাকা খাদ্য সুরক্ষা শাখা বিভিন্ন পৌরসভা ও পৌরনিগম, স্থানীয় পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে যৌথ সমন্বয় রেখে সম্প্রতি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় নজরদারি ও ম্যারাথন অভিযান চালাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী। জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে গৃহীত এই উদ্যোগ বেশ নজর কেড়েছে।
আজ বিশ্বব্যাপী খাদ্যজনিত অসুস্থতা একটি অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী কিংবা বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত দূষিত খাবার খাওয়ার কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আর এই খাদ্য সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। ২০০০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্বের ১৯৪টি দেশের ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৮ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ অনিরাপদ বা দূষিত খাবার খাওয়ার কারণে কোনও না কোনও রোগে আক্রান্ত হন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৫ বছরের কম বয়সি শিশুরা এই খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকিতে প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বেশি এগিয়ে রয়েছে। ভারতবর্ষও এই সমস্যার বাইরে নয়। ২০১৫-১৬ সালে ‘জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা-৪’ (‘এনএফএইচএস-৪’)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের ৯.১৯% (শহরাঞ্চলে ৮.২৪% এবং গ্রামাঞ্চলে ৯.৫৭%) সমীক্ষার ২ সপ্তাহ আগে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী সমস্ত শিশুমৃত্যুর ২৯ শতাংশ এবং ভারতে সমস্ত শিশুমৃত্যুর ৫০ শতাংশ নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়ার কারণে ঘটে।
গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী ডায়রিয়ার কারণে হওয়া শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হল, অনিরাপদ খাদ্য ও পানীয় জল। খাদ্যজনিত রোগ শুধু ব্যক্তির জীবনহানি ঘটায় না, এটি সমাজ ও অর্থনীতির উপরও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কর্মীদের উৎপাদনশীলতা কমে, আয় হ্রাস পায়, বেকারত্ব বাড়ে এবং আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা ও গুণমান নিশ্চিত করা আজ আর শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তাও বটে।
অতীতে আমাদের সমাজে বেশিরভাগ খাবার বাড়িতেই তৈরি হতো। মশলা থেকে শুরু করে অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী ঘরেই প্রস্তুত করা হতো বলে তার বিশুদ্ধতা নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগ ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। প্রযুক্তির উন্নতি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অভাবনীয় অগ্রগতি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার কারণে আজ মানুষ ক্রমশই ঘরের বাইরের খাবারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। শহর ও মফস্বলে বসবাসকারী মানুষের একটি বড় অংশ এখন সকালের জলখাবার থেকে রাতের খাবার পর্যন্ত বাইরেই সেরে নেন। বাণিজ্যিকভাবে যখন বিশাল পরিমাণে খাবার তৈরি করা হয়, যখন একই খাবার বহু মানুষের হাত ঘুরে পরিবেশিত হয় এবং যখন খাবার অনেক ঘণ্টা আগে তৈরি করে সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করেই পরিবেশন করা হয়, তখন খাবার দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। বাজারে আজ হাজারো রকমের প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার, প্যাকেটজাত মশলা, সস, মশলার গুঁড়ো সহজলভ্য। এই খাদ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদের দূষণ এবং ভেজাল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। দূষণ হল খাদ্যে ক্ষতিকারক বা আপত্তিকর বহিরাগত পদার্থের অনিচ্ছাকৃত উপস্থিতি, যা প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ বা পরিবহনের সময় ঘটতে পারে। আর ভেজাল হল ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্যের গুণমান কমিয়ে দেওয়ার জন্য অথবা অধিক মুনাফা লাভের আশায় নিম্নমানের উপাদান মেশানো বা মূল্যবান উপাদান সরিয়ে নেওয়া, যা সম্পূর্ণভাবে একটি অসাধু এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই দূষণ ও ভেজাল মূলত তিনভাবে ঘটে থাকে। শারীরিক দূষণের ক্ষেত্রে খাবারে পাথর, চুল, কাঠের টুকরো, পোকামাকড়ের অংশের মতো বস্তু পাওয়া যায়, যা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্নতার অভাবের কারণে হয়।
রাসায়নিক বিপদ আরও ভয়াবহ, যেখানে কীটনাশক, রাসায়নিক সারের অবশিষ্টাংশ, বিষাক্ত ধাতু, নিষিদ্ধ ফুড কালার এবং ক্ষতিকারক ‘প্রিজারভেটিভ’ ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে খাবারে মেশানো হয়। মুনাফার লোভে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই বিষ মানুষের পাতে তুলে দিচ্ছে। তৃতীয়টি হল জৈবিক বিপদ, অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের মাধ্যমে দূষণ। এর মধ্যে সালমোনেলা এবং স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস নামক দুটি অত্যন্ত পরিচিত এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া অন্যতম। কাঁচা মাংস ও সবজি একই বোর্ডে কাটা, শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে খাবার স্পর্শ করা বা বাসি খাবার সঠিকভাবে গরম না করার ফলে এই জীবাণুগুলো দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে সালমোনেলা প্রতি ২০ মিনিটে দ্বিগুণ হতে পারে এবং ডায়রিয়া, জ্বর, পেটে ব্যথার কারণ হয়। আবার স্ট্যাফিলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া এমন বিষ তৈরি করে যা দেখে বা গন্ধে বোঝা যায় না, কিন্তু খেলে মারাত্মক খাদ্য বিষক্রিয়া ঘটে।
এই গভীর সংকট মোকাবিলায় আমাদের রাজ্যের খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকদের বর্তমান তল্লাশি অভিযান একটি শুভ সূচনা মাত্র। এই অভিযানকে সত্যিকারের সফল করতে হলে একে একটি ধারাবাহিক এবং সামগ্রিক ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ পালন, উৎসবের মরসুম কিংবা আকস্মিক কোনও দুর্ঘটনার পর সাময়িক লোক দেখানো তৎপরতার গণ্ডি পেরিয়ে, এই তল্লাশি অভিযানকে একটি নিরপেক্ষ, ধারাবাহিক ও স্থায়ী প্রক্রিয়ার রূপ দিতে হবে।
একই সঙ্গে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় আধুনিক ও উন্নত খাদ্য পরীক্ষাগার গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি, যাতে সংগৃহীত নমুনার দ্রুত এবং নির্ভুল পরীক্ষা করা যায়। দোষী প্রমাণিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যার মধ্যে লাইসেন্স বাতিল, বড় অঙ্কের জরিমানা এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি শুধু শাস্তি নয়, সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের উপরও জোর দিতে হবে। ছোট খাদ্য ব্যবসায়ী, ফুটপাতের খাবার বিক্রেতা এবং হোটেল-রেস্তরাঁর কর্মীদের জন্য কাঁচামালের গুণমান, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সঠিক তাপমাত্রায় খাদ্য সংরক্ষণ এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে যাতে তারা খাবার কেনার সময় ‘এফএসএসএআই’ লাইসেন্স, উৎপাদনের তারিখ এবং লেবেল দেখে কেনার অভ্যাস গড়ে তোলেন। স্কুল-কলেজেও এই বিষয়ে প্রচার চালানো প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনও একক সংস্থার কাজ নয়, এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। সরকার, প্রশাসন, খাদ্য ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তা সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। বর্তমানে খাদ্য সুরক্ষায় রাজ্য সরকার যে কঠোরতা দেখিয়েছে, তা জনস্বাস্থ্যের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। আমরা আশা করব, এই উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে চলবে এবং বাংলার প্রতিটি মানুষের থালায় নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত হবে।