বিরতির আড়ালে কৌশল

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

যখন একটি যুদ্ধ থেমে যায়, কিন্তু শান্তির দিকে এগোয় না, তখন সেই বিরতিই হয়ে ওঠে নতুন কৌশল। ইরানকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত— যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, কিন্তু একই সঙ্গে নৌ অবরোধ বজায় রাখা— এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। প্রথম দৃষ্টিতে এটি সংযম ও কূটনৈতিক সদিচ্ছার বার্তা বহন করলেও, গভীরে রয়েছে সুপরিকল্পিত চাপের রাজনীতি।

যুদ্ধবিরতি বাড়ানো মানেই যে শান্তির পথে অগ্রসর হওয়া, তা নয়। বরং এই ক্ষেত্রে শর্তগুলিই আসল কথা বলে। আমেরিকা তেহরানের উপর একটি ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব দেওয়ার দায় চাপিয়ে দিয়ে কার্যত দায়িত্ব স্থানান্তর করেছে এমন একটি নেতৃত্বের ওপর, যাকে তারা নিজেরাই বিভক্ত বলে মনে করে। ফলে আলোচনার মঞ্চ তৈরি হলেও, সেটি একপাক্ষিক চাপের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে। এটি নিছক কূটনীতি নয়, বরং আলোচনার আবরণে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি।

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির আলোচনার সেতুবন্ধন করার চেষ্টা করছেন। তবে এই মধ্যস্থতা প্রকৃত সমাধানের পথ তৈরি করছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বরং আলোচনা বারবার স্থগিত, পুনর্গঠিত বা অনিশ্চিত অবস্থায় থেকে যাচ্ছে— যেন একটি প্রক্রিয়া চলছে, কিন্তু তার কোনও নির্দিষ্ট পরিণতি নেই। এই ‘চলমান আলোচনা’ আসলে একটি কূটনৈতিক স্থবিরতা, যা সংকটকে বজায় রাখে, সমাধানকে নয়।


অন্যদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিও এই পরিস্থিতির চাপে নিজেদের অবস্থান নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী দীর্ঘদিন ধরে পারস্য উপসাগরের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তাদের জ্বালানি আয় ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ইরানের বন্দরগুলিতে অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। এর ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ছড়াচ্ছে, যার প্রভাব উপসাগরের বাইরেও বিস্তৃত। অর্থাৎ, সরাসরি যুদ্ধ না চললেও, তার অর্থনৈতিক অভিঘাত বিশ্বব্যাপী অনুভূত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের নিম্নমাত্রার চাপের কৌশল ব্যবহার করছে। সরাসরি সামরিক হামলা না চালিয়েও তারা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বজায় রেখে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার চেষ্টা করছে। এই দ্বিমুখী নীতি— একদিকে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে চাপ বৃদ্ধি— প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এখানে হুমকি ও আলোচনার দরজা পাশাপাশি খোলা রাখা হয়, সময়সীমা নির্ধারণ করে আবার তা বাড়ানো হয়, কঠোর অবস্থান নিয়ে পরে তা নমনীয় করা হয়।

এই ধারাবাহিকতার ফলে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যেখানে মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে না। এই অনিশ্চয়তাই হয়ে ওঠে কৌশলের মূল হাতিয়ার। বিশেষত ইরানের মতো দেশের ক্ষেত্রে, যার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য প্রশ্নের মুখে, এই চাপ আরও কার্যকর হয়। বিভক্ত নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত আদায়ের চেষ্টা করা হয়, আর কোনও বিলম্ব বা মতভেদকে সদিচ্ছার অভাব হিসেবে তুলে ধরে আবার উত্তেজনা বাড়ানোর পথ খোলা রাখা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সময় নিজেই এক অস্ত্র হয়ে ওঠে। আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা উন্মোচিত করা হয়, তাদের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও প্রকট করা হয়। ফলে যুদ্ধবিরতি আর শান্তির সেতু থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি কৌশলগত বিরতি— যেখানে যুদ্ধের রূপ বদলায়, কিন্তু সংঘাতের মূল সুর অটুট থাকে।

অতএব, এই পরিস্থিতি এক বিপজ্জনক ভারসাম্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে— একটি যুদ্ধ যা না এগোচ্ছে, না শেষ হচ্ছে; বরং সচেতনভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এই স্থায়ী অস্থিরতা শুধু আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও অর্থনীতির জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।