কিশোরী প্রসূতিদের সঙ্কটকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করছে নয়া রাজ্য সরকার

File Photo

সংবাদে প্রকাশ নাবালিকা বিবাহ এবং সন্তান প্রসবের হারে সারা দেশে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে পয়লা নম্বরে। কিশোরী প্রসূতিদের সঙ্কটকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করছে নয়া রাজ্য সরকার, পাশাপাশি এই খবরটিও আশা জাগাল। তাদের গর্ভাবস্থা, প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসার ক্ষেত্রে কী কী বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন, তার রূপরেখা তৈরি করতে বিশেষজ্ঞদের কমিটি তৈরি করার সরকারি সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। তৃণমূল আমলে নাবালিকা বিবাহ ও কিশোরী প্রসূতিদের বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কারণ তা ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের সাফল্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। সরকারি উপেক্ষা, স্কুলশিক্ষার দুর্বলতা এবং সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের জন্য পশ্চিমবঙ্গে কিশোরী প্রসূতিদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। শিশুদের যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রণীত ‘পকসো’ আইনও (২০১২) কিশোরী-প্রসূতিদের আড়াল করার চেষ্টার অন্যতম কারণ। যে-হেতু নাবালিকার যৌনসংসর্গ ‘ধর্ষণ’ বলে গণ্য করবে পুলিশ-প্রশাসন, তাই স্বাস্থ্যকর্মীরাও নাবালিকা গর্ভবতীদের নাম নথিভুক্তি এড়িয়ে যান। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় বোঝা গেল, এখন এই সমস্যাকে স্বীকার করা হচ্ছে। প্রসূতি ও শিশুমৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে কিশোরী প্রসূতিদের চিকিৎসা ও নজরদারির বিশেষ রূপরেখা তৈরি হবে।

আশা করা যায়, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের মিলিত প্রচেষ্টায় গর্ভাবস্থাকালীন পরীক্ষা, রক্তাল্পতা ও অপুষ্টির মোকাবিলার মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব পাবে। তবে প্রধান লক্ষ্য নিঃসন্দেহে নাবালিকা বিবাহ রোধ করা, কিশোরী প্রসূতির হার কমানো। তার যথাযথ উপায় কী? স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্ট অনুসারে গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এ রাজ্যে প্রায় ৬০ হাজার নাবালিকা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, সেই ঘটনাগুলিতে স্বামীকে শো-কজ় করা হবে। স্বামী বা স্ত্রীর বয়স আইনসম্মত না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে, এবং মা-বাবা, পুরোহিত, কাজি প্রমুখের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করবে পুলিশ। জেল, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, বড় অঙ্কের জরিমানা সবই হতে পারে। আইনের দৃষ্টিতে এ কথায় ভুল নেই— নাবালিকার সঙ্গে যৌনসংসর্গের জন্য কঠোর ধারা আইনে বাস্তবিকই মজুত রয়েছে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ নন, তিনি জনপ্রতিনিধি; রাজ্যের মুখ্য প্রশাসক এবং নীতিপ্রণেতা। সরকারি নীতিকে একই সঙ্গে ন্যায়পূর্ণ হতে হবে, এবং কার্যকর হতে হবে। নাবালিকা বিবাহের সমস্যাটি জটিল, বহুস্তরীয়। শুধু পরিবারের চাপেই কিশোরীরা বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে, এমন নয়। বহু কিশোরী নিজের আগ্রহে সঙ্গীকে বিয়ে করছে, পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে। জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে জানার উপায় তাদের স্বল্প, তাই বিয়ের অব্যবহিত পরেই গর্ভবতী হচ্ছে তারা। এই মেয়েরা সমাজবিরোধী নয়, হিংসা, বিদ্বেষ বা অবৈধ লাভের জন্য আইন লঙ্ঘন করছে, এমন নয়। তাদের সিদ্ধান্ত অনেকগুলি ব্যর্থতার ফল— উচ্চশিক্ষা এবং কর্মনিযুক্তির প্রতি আগ্রহ তৈরিতে স্কুলের ব্যর্থতা, নিজের পছন্দের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার দেওয়ায় পরিবারের ব্যর্থতা, জন্মনিয়ন্ত্রণের জ্ঞান এবং উপকরণের জোগানে সরকারের ব্যর্থতা তার কয়েকটি। নাবালিকা বিবাহ বা গর্ভবতী কিশোরীর সন্ধান পেলে সরকার গোটা পরিবারের জেল-জরিমানা করবে, তা জানতে পারলে বিবাহ ও গর্ভাবস্থা গোপন করার চেষ্টা আরও বাড়তে পারে। বাড়িতে প্রসব করানো বাড়তে পারে, যে ক্ষেত্রে কিশোরী প্রসূতির জন্য বিশেষ পরিচর্যার পরিষেবা পৌঁছবেই না। একেই বোধহয় বলা যায় হিতে বিপরীত। সরকারের যথার্থ কর্তব্য ছিল, কিশোরীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ প্রভৃতি নানা বিভাগের প্রকল্পকে একত্র করে নিবিড় কর্মসূচি গ্রহণ।

সর্বভারতীয় স্তরে মাত্র ২.১% কিশোরীর বিয়ে ১৮ বছরের নীচে হলেও পশ্চিমবঙ্গে সে অনুপাতটি ৬.৩%— এটি শুধু সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় অনেকটা বেশিই নয়, দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। পশ্চিমবঙ্গের ঠিক পরেই আছে ঝাড়খণ্ড (৪.৬%), এবং ছত্তিসগড় (৩%)। পঞ্চম জাতীয় পরিবার ও স্বাস্থ্য সমীক্ষা (এনএফএইচএস-৫), ২০১৯ থেকে ২০২১-এর পরিসংখ্যানেও একই ছবি। পশ্চিমবঙ্গে এনএফএইচএস-৫-এর সমীক্ষা চলাকালীন যে মহিলাদের বয়স ২০-২৪ বছরের মধ্যে ছিল, তাঁদের মধ্যে ৪১.৬% জানিয়েছিলেন যে, তাঁদের বিয়ে ১৮ বছরের নীচে সম্পন্ন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় গড় ২৩.৩%। গত দু’দশকের মধ্যে হওয়া যে কোনও সমীক্ষার পরিসংখ্যানই অনুরূপ দিকে নির্দেশ করে। বস্তুত, সমস্যাটি তার চেয়েও বেশি পুরনো। স্বাধীনতা-পরবর্তী সব জনশুমারিতে পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের বিয়ের গড় বয়স সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। পশ্চিমবঙ্গ-সহ পার্শ্ববর্তী রাজ্য, যেমন আসাম বা ত্রিপুরার বাংলাভাষীদের মধ্যেও বাল্যবিবাহের প্রচলন বেশি। পশ্চিমবঙ্গের শহরে (২৬%), উচ্চবর্ণের মধ্যে (৩৮%), এবং ধনী পরিবারের মধ্যে (১৩%) বাল্যবিবাহের প্রচলন সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় (যথাক্রমে ১৫%, ১৮%, ও ৮%) অনেকটাই বেশি। উত্তর ভারতের হিন্দিবলয়ের কঠোর পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাও যেখানে বাল্যবিবাহের হার ক্রমাগত কমিয়ে আনতে পেরেছে, পশ্চিমবঙ্গের মতো তথাকথিত প্রগতিশীল সমাজ তা পারছে না কেন? এই বিষয়ে আগের গবেষণা গড়পড়তা যে কারণগুলো দেখিয়েছে, সেগুলি হল— বিয়ের আইনি বয়স সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, পারিবারিক দারিদ্র, তফসিলি জাতি ও জনজাতি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সামাজিক পশ্চাৎপদতা, নারীশিক্ষার সুযোগের অপ্রতুলতা, বাবা-মায়ের মননে মেয়েদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার অভাব এবং অল্পবয়সে কুমারীত্ব হারানোর ভয়, ঘরের বাইরে মহিলাদের কাজের সুযোগের অভাব ইত্যাদি। এই কারণগুলি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং উত্তর ভারতের সব রাজ্যেই কম-বেশি প্রযোজ্য। তা হলে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও কারণ আছে কি? স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম যেহেতু একক-স্তরে তথ্য দেয় না, তাই এটা বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের জাতীয় পরিবার ও স্বাস্থ্য সমীক্ষা ও জাতীয় নমুনা সমীক্ষার আশ্রয় নিতে হবে। উপরোক্ত কারণগুলি ছাড়াও মূলত তিনটি সম্ভাব্য কারণের কথা বিশ্লেষণ করা দরকার।


প্রথমত, প্রথাগত শিক্ষা অর্জনের সঙ্গে কম বয়সে বিয়ের একটি মৌলিক স্তরে বিপরীত সম্পর্ক আছে। এনএফএইচএস-৫-এর নিরিখে পশ্চিমবঙ্গে ১৬-১৭ বছর বয়সি মেয়েদের মধ্যে প্রায় ৭৭% স্কুলে যায়, যেটা সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ-বিন্দু বেশি। অন্য দিকে, সর্বভারতীয় গড়ে ছেলেদের মধ্যে এই বয়োবন্ধনীর ৭৪ শতাংশেরও বেশি স্কুলে থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে সেটা মাত্র ৬৭%, সারা ভারতে সর্বনিম্ন। অন্য দিকে, ২০১৭-১৮ সালের ৭৫তম জাতীয় নমুনা সমীক্ষার তথ্য বলছে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পশ্চিমবঙ্গে ছেলেদের মধ্যে সরকার বা সরকার-পোষিত স্কুলগুলিতে মোট উপস্থিতির অনুপাত ৫১.৪%, যা সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ-বিন্দু কম; কিন্তু, মেয়েদের মধ্যে এই হার সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে সামান্য হলেও বেশি।রাজ্য সরকার বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব দেখালেও, নীতি ও প্রশাসনের শূন্য স্থানগুলি চিহ্নিত করে দ্রুত পূরণ করে ফেলতে হবে। সে জন্য চাই সুসংহত ব্যবস্থা ও পারস্পরিক সহায়তা। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন ভাবে উদ্যোগ করা হয়েছে, ফলে বিচ্ছিন্ন সাড়াই মিলছে। সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক পরিবেশের স্তরে যদি কোনও সমন্বিত ব্যবস্থা করা যায়, তা হলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতকে ‘বাল্যবিবাহ মুক্ত’ করার দিকে কিছুটা হলেও এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে। নাবালিকা বিবাহ প্রতিরোধ, মেয়েদের নিরাপত্তা, ও বিবাহে বাধ্য করার জন্য শাস্তি, এগুলির জন্য চাই নীতি। নাবালিকা বিবাহ প্রতিরোধের পরিকাঠামো তৈরি, বিবাহ না করতে উৎসাহ দেওয়া, বিবাহ প্রতিরোধের জন্য প্রতিষ্ঠান গঠনের জন্য চাই বিনিয়োগ। বিভিন্ন সরকার, সরকারি দফতর এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি, যাঁরা এই উদ্দেশ্যে কাজ করবেন, তাঁদের মধ্যে দরকার সমন্বয়। এই সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলির বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়ে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা যেন বাল্য বিবাহে উৎসাহ না দেয়, তা দেখতে হবে। এবং সব শেষে, বাল্যবিবাহ রুখতে, নজরদারি করতে ও বিপন্ন মেয়েদের চিহ্নিত করতে প্রযুক্তির প্রয়োজন।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন ২০০৬, ও শিশুদের যৌন নিগ্রহ প্রতিরোধের আইন ‘পকসো’ ২০১২ কঠোর ভাবে প্রয়োগ না হওয়া বাল্যবিবাহে বাড়বাড়ন্তের অন্যতম কারণ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহের সংখ্যা ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫-এ যথাক্রমে ৬৮, ৯৮ ও ১০৫। এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ বাস্তবকে ইঙ্গিত করছে। ২০১১ সালের জনগণনায় দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে ৯ লক্ষ ২০ হাজার বাল্যবিবাহ হয়েছে, সেখানে নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা মাত্র ২৭০। এটা খুবই চিন্তার বিষয়। এখন সবচেয়ে বড় কাজ হল সুস্পষ্ট ভাষায় কঠোর বার্তা দেওয়া— বাল্যবিবাহ অপরাধ, এবং এর সঙ্গে যিনি বা যাঁরা যুক্ত থাকবেন বা মদত দেবেন তাঁদের শাস্তি পেতেই হবে। এই প্রচারে অভিভাবক, শিশু থেকে শুরু করে গ্রাম পঞ্চায়েত-সহ অন্য সরকারি সংস্থা, নজরদারি সংস্থা ও নাগরিক সমাজকে থাকতে হবে। বিভিন্ন ধর্মের নেতাদেরও শামিল করতে হবে। তাঁদের কাজ হবে মনোভাব পরিবর্তন নিশ্চিত করা। পুরোহিত, কাজি, যাজক-সহ সব ধর্মের প্রতিনিধিদের সজাগ থাকতে হবে। বাল্যবিবাহ দিলে যে তাঁদের মাথাতেও খাঁড়া নেমে আসতে পারে, মনে রাখতে হবে তাও। শুধু তা-ই নয়, এ জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট বাজেট করে একটি ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করা।বাল্যবিবাহ মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে, যা কোনও সামাজিক, ধর্মীয় বা ঐতিহ্য দিয়ে খাটো করে দেখানো যায় না। এই অপরাধ এই মুহূর্তে বন্ধ করা প্রয়োজন। যে শিশুদের বিয়ে করতে বাধ্য করা হচ্ছে ও তারা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ছে, তাদের দায় আমাদের প্রত্যেকের— সামাজিক, নৈতিক, আইনি, আর্থিক ও কৌশলগত দিক থেকে সার্বিক ব্যর্থতা। যত ক্ষণ না আরও সুসংহত ব্যবস্থা করা হচ্ছে, ঘড়ির কাঁটা কিন্তু ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে চলবে।