রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন: দ্বৈত দায়িত্বের সামনে বিএনপি সরকার

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সৈয়দ হাসমত জালাল

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোট— দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দুই দশক পর আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), আর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবার প্রথমবারের মতো সরাসরি নির্বাচনী নেতৃত্ব দিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় এনে দিয়েছেন দলকে। একই সময়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় জুলাই জাতীয় সনদের আওতায় সাংবিধানিক সংস্কারের প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত করেছে। ফলে নতুন সরকারকে একদিকে ক্ষমতার ভার নিতে হবে, অন্যদিকে কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কঠিন পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হবে।

দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে অবস্থানের পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তারেক রহমান। নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে তাঁর মায়ের মৃত্যু এবং তার পরপরই দলের চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষেক— এই নাটকীয় রাজনৈতিক মুহূর্ত তাঁকে সহানুভূতি, প্রত্যাশা ও বিতর্ক— তিনটির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। ৯ জানুয়ারি জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি নির্বাচনী প্রচারের নেতৃত্ব দেন।


বিএনপির জন্য এই নির্বাচন ছিল পুনরুত্থানের পরীক্ষা। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির সেনা-সমর্থিত সরকারের আগমন— এসব ঘটনার অভিঘাত দলটিকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রান্তিক করে রেখেছিল। সেই সময় গ্রেপ্তার ও কারাবাসের পর তারেক রহমানের বিদেশযাত্রা এবং সেখান থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা— সব মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্ব ছিল যথেষ্ট দূরবর্তী ও বিতর্কিত। এবার সরাসরি দেশে ফিরে নির্বাচনী নেতৃত্ব দেওয়া তাঁর রাজনৈতিক বৈধতা পুনর্গঠনের এক প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি নির্বাচনী প্রতিযোগিতার কাঠামো বদলে দেয়। ফলে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী বিএনপি ও তার মিত্ররা ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে, আরও কয়েকটি আসনের ফল বাকি। জামায়াত জোট ৭৭টি আসন পেলেও উল্লেখযোগ্য কয়েকজন নেতা পরাজিত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির কয়েকজন বিদ্রোহী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হলেও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তা অবশ্যই নতুন সরকারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার ইঙ্গিত বহন করছে।

নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে ৪ কোটি ৮০ লক্ষের বেশি ভোটার ‘হ্যাঁ’ মত দিয়েছেন। প্রশ্নটি ছিল— জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলোর প্রতি সম্মতি আছে কি না। ‘হ্যাঁ’ জেতায় এখন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রথম ১৮০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবেন। অর্থাৎ, নির্বাচনী বিজয় এখন কেবল সরকার গঠনের অনুমতি নয়, বরং সাংবিধানিক পুনর্গঠনের দায়িত্বও।
গণভোটের আওতায় চারটি প্রধান দিক রয়েছে—প্রথমত, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনে নতুন প্রক্রিয়া নির্ধারণ।

অতীতের রাজনৈতিক সংকট, বিশেষত ২০০৬-০৭ সালের অভিজ্ঞতা, এখানে বড় প্রেক্ষাপট। নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার কাঠামো স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করাই এই সংস্কারের লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তন। ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতিতে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের হার অনুযায়ী আসন বণ্টন হবে। এতে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বাড়বে। তবে উচ্চকক্ষ আইন প্রণয়ন করবে না, নিম্নকক্ষে পাস হওয়া বিল (অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া) অনুমোদনের জন্য যাবে সেখানে। দু’মাসের বেশি আটকে রাখলে বিলটি পাস হয়েছে বলে গণ্য হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন বাধ্যতামূলক। তৃতীয়ত, জুলাই সনদে ঐকমত্য হওয়া ৩০টি প্রস্তাবের বাস্তবায়ন— যার মধ্যে রয়েছে সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্বে ভারসাম্য আনা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা। চতুর্থত, সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী বাস্তবায়ন।

বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্দিষ্ট নয়। গণভোট-উত্তীর্ণ প্রস্তাব অনুযায়ী একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভাঙার একটি কাঠামোগত উদ্যোগ। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংসদীয় ভারসাম্য আনার প্রস্তাব কার্যকর হলে নির্বাহী ও আইন বিভাগের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে।

তবে এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত করা সহজ নয়। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। ফলে বিএনপি সরকারকে কেবল সংখ্যার জোরে নয়, রাজনৈতিক ঐকমত্য রক্ষা করেও এগোতে হবে।

এক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা কতটা কঠোর? প্রধান উপদেষ্টা আগেই ঘোষণা করেছিলেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, নির্বাচনে বিজয়ী দল সেগুলো বাস্তবায়িত করতে বাধ্য থাকবে। অর্থাৎ এটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি মাত্র নয়, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি অনুমোদনপ্রাপ্ত অঙ্গীকার। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা আংশিক বাস্তবায়িত হলে তা রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়বে।

বিএনপির জন্য এটি দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে তারা দীর্ঘদিন ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবি করে এসেছে, অন্যদিকে এখন সেই দাবিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। একইভাবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও মেয়াদসীমা নির্ধারণের প্রশ্নে তাদের বাস্তব পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে বিএনপি সংস্কারমুখী নাকি কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্ভাব্য কী কী পরিবর্তন হতে পারে? দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি চালু হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটভিত্তিক সমঝোতা বাড়তে পারে। ছোট দলগুলোর অভিমত উচ্চকক্ষে প্রতিফলিত হলে নীতিনির্ধারণে বৈচিত্র্য আসবে। তবে উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নক্ষমতা না থাকায় এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। একইসঙ্গে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ও সংসদীয় কমিটিতে ভারসাম্য আনার প্রস্তাব কার্যকর হলে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা শক্তিশালী হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে, সংসদ বয়কট ও সংঘাতমুখী রাজনীতি আইনসভাকে দুর্বল করেছে। নতুন কাঠামো সেই সংস্কৃতি বদলাতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট— দুটি ফলাফল মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির প্রত্যাবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার পুনর্গঠনও। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা এখন শুরু— জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে শক্তিশালী করেছে, তবে একইসঙ্গে জনগণের প্রত্যাশার ভারও বাড়িয়েছে। যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পারে, তবে এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। আর যদি প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক তৈরি হয়, তবে এই ঐতিহাসিক জয়ই পরিণত হতে পারে নতুন বিতর্কের সূচনায়।

সুতরাং, বিএনপি সরকারের সামনে এখন দ্বৈত দায়িত্ব— রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিজয় তাদের জন্য কেবল রাজনৈতিক সমর্থন নয়– এটি এক বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার, যার সফল বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী অধ্যায়।