শ্রীরামকৃষ্ণের শেষ দোল উৎসব

ফাইল চিত্র

কুমারেশ চক্রবর্তী

গদাধর (রামকৃষ্ণ) ছোট বয়স থেকেই দোল খেলতে ভীষণ ভালবাসতেন। আবির ফাক আর জল রঙ দিয়ে রং খেলা ছিল প্রিয় উৎসব। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে এমনকি প্রতিবেশী মেয়ে বৌদিদের সঙ্গেও গদাধর নির্দ্বিধায় রং খেলত। রং মেখে সং সাজতে খুব ভালো লাগতো। পরে যখন শ্রীরামকৃষ্ণ হলেন তখনও তিনি দক্ষিণেশ্বরে তার শিষ্য- সামন্ত, ভক্তদের নিয়ে দোল উৎসবে মেতে উঠতেন। এমনকি দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে যখন কাশীপুরের উদ্যানবাটিতে বাস করছেন সেখানেও তিনি দোল উৎসব পালন করেছেন।

ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের জন্ম হয়েছিল তাই এই দিনটি বাঙালি তথা ভারতীয়দের কাছে এক পুণ্য পবিত্র দিন। আবার এই দিনেই শ্রীকৃষ্ণ রাধা ও অন্যান্য সখীদের সঙ্গে রঙ খেলেছিলেন। এর অনেক নাম। দোলযাত্রা, হোলি, আমরা বলি রং খেলা। আমার মনে হয় বসন্তকালের এই উৎসবটি আসলে মনের উৎসব, হৃদয়ের উৎসব, শরীরে বসন্তের ছোঁয়া লাগার উৎসব। যে বসন্ত উৎসবের সূচনা হয় সরস্বতী পুজোতে তার সমাপ্তি ঘটে এই বসন্তর শেষে। রঙের খেলায়, হৃদয়ের দোলায় তাই দোল উৎসব সর্বদাই তরুণ তরুণীদের কাছে অন্যরূপ পায়। সারা বিশ্বেই রঙের এই উৎসবকে অত্যন্ত গুরুত্ব এবং শ্রদ্ধার চোখেই দেখা হয়। তাই অন্য সময় হোক বা না হোক রঙের উৎসবে বহু বিদেশের রাষ্ট্রনেতা ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা প্রেরণ করেন। এ তাই ভারতের একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। বিশেষ করে আকবরকে তো দেখাই গেছে বসন্ত উৎসবে যোগ দিতে। আসলে রং শুধু ধর্ম নয় আবেগ উৎসাহ ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হয় রঙের মাধ্যমে।


দোল বা হোলি বসন্ত, প্রেম এবং রঙের উৎসব হিসেবেই ভারতে পরিচিত। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে রাধা কৃষ্ণের ঐশ্বরিক প্রেম এবং চিরায়াত ভালোবাসা উদযাপন করা হয়। এই উৎসবের অঙ্গ হিসেবেই হোলিকা দহন, যা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয় ঘোষণা করে। হোলিকা দহন শব্দটা বাংলায় একটু অপরিচিত। এখানে সাধারণত চ্যাচর বা ন্যাড়া পোড়া বলা হয়, দোলের আগের দিন রাত্রে বাঁশের খুঁটিতে বিভিন্ন গাছের শুকনো ডালপালা জোগাড় করে আগুন দেয়া হয়। বলা হয়, আজ আমাদের ন্যাড় পোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বল হরি বল। এই ন্যাড়াপোড়ার পেছনেও কিন্তু একটা গল্প আছে। ভাগবত পুরাণে আছে, অসুর রাজা হিরণ্যকশিপুরের কনিষ্ঠা ভগ্নির নাম ছিল হোলিকা। এটা সকলের জানা যে, হিরণ্যকশিপুর ছিলেন অত্যন্ত বিষ্ণু বিদ্বেষী। তিনি কিছুতেই নারায়নকে দেবতা বলে স্বীকার করতেন না। অথচ তার পুত্র প্রহল্লাদ ছিলেন অত্যন্ত বিষ্ণু ভক্ত। একেবারেই বাবা তথা পরিবারের বিপরীত চরিত্র। নারায়ণ ছিল তার ধ্যান জ্ঞান মন্ত্র। রাত দিন মগ্ন থাকতেন বিষ্ণু চিন্তায়। তাই হিরণ্যকোশিপুরের চক্ষুশুল এই পুত্রকে ধরাধাম থেকে সরাবার বহু চেষ্টা করেছেন রাজা। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের ছোট বোন হোলিকাকে পাঠালেন প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারার জন্য। কিন্তু ঘটনাচক্রে প্রহ্লাদকে হত্যা করতে এসে হোলিকা নিজেই আগুনে পুড়ে মারা গেল। এই হোলিকা দহন থেকেই হোলি নামটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। এর আরো একটি উৎস আছে, হোলি শব্দের উৎপত্তি হোলা থেকে, যার অর্থ আগাম ফসলের প্রত্যাশায় ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানানো। সাধারণত পাঞ্জাবে এই প্রথা দেখা যায়। সেখানে হোলির দুমাস পরেই অর্থাৎ বৈশাখ মাসে গম কাটা, ছোলা তোলা হয়। তাই হোলির সময় অপক্ক গম ছোলা প্রভৃতি শস্য খাওয়ার রীতি পাঞ্জাবে প্রচলিত আছে। মুলতানে বিখ্যাত প্রহল্লাপুরী মন্দির থেকেই এ অঞ্চলের উৎসবের সূচনা হয়। ওখানে প্রহ্লাদ ছাড়াও নৃসিংহ মূর্তি পূজা করা হয়। অবশ্য ভারতবর্ষে বিভিন্ন প্রান্তেই দোল উৎসব জাঁকজমক সহকারে পালিত হয়। বৃন্দাবন, অযোধ্যা, পশ্চিমবঙ্গের শান্তিপুর, নবদ্বীপ, মায়াপুর প্রভৃতি স্থানে অত্যন্ত ধুমধাম সহ সপ্তাহব্যাপী দোল উৎসব পালিত হয়। বাংলার দোল উৎসবের সঙ্গে মূলত মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জন্মদিনটি জড়িত আছে। দোলের পরের দিন শুরু হয় হোলি।

রামকৃষ্ণ শিশু বয়স থেকেই রং খেলতে ভালোবাসতেন। তার বিভিন্ন বন্ধু-বান্ধব সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে দলবেঁধে তিনি দোলযাত্রা করতেন। আবির মাখা ও পরস্পরকে রং আবির মাখিয়ে নানান রকমের গান গেয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়ে তিনি গ্রামের পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন। এই সময় তার প্রিয় খাদ্য ছিল ফুটকরাই বা মটর ভাজা এবং নারকেল নাড়ু। শুধু নিজেদের বাড়ি নয় বিভিন্ন বাড়ি থেকেও তারা এগুলো সংগ্রহ করতেন, খেতেন। এটাই ছিল সেই সময়ের একটা মজার খেলা, আনন্দের দিন। দক্ষিণেশ্বরেও দোল উৎসব পালন করেছেন। বিশেষ করে যখন তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ রূপে জনপ্রিয় সেই সময় তিনি তাঁর ভক্ত শিষ্যদের নিয়ে মন্দিরের মধ্যেই রং খেলেছেন।

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের দক্ষিণেশ্বর মন্দির চত্বরে দোল পূর্ণিমার দিনটি সমগ্র ভারতবাসীর কাছে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিন অর্থাৎ ১৮৮৫-র পয়লা মার্চ (১৮ ফাল্গুন ১২৯১ বঙ্গাব্দ) শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে, ঠাকুর তাঁর অতি প্রিয় ভবিষ্যতের প্রধান সেনাপতি নরেন্দ্রনাথ কে প্রথম আধ্যাত্মিক পথে দীক্ষিত করেন। সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে সেই পবিত্র মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন রাম দত্ত, মহিমাচরণ, মনমোহন,মাস্টারমশাই প্রভৃতি। রামকৃষ্ণ নরেন কে প্রথম দেখেন ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার সিমলায় সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে। সেদিন ছিল রথযাত্রা! প্রতিবছর সুরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়ন করে আনতেন বাড়িতে। সেই দিন ঠাকুর সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। ঠাকুর গান ভালবাসেন। কিন্তু গায়ক কোথায়? তখন খবর পাঠালেন তার পাড়ার বিখ্যাত বিশ্বনাথ দত্তের ছেলে নরেন্দ্রনাথকে। তিনি জানতেন তরুণ নরেন্দ্রনাথ খুব ভালো গান করে। তাই তাকেই ডেকে পাঠানো হলো। সেদিনই শ্রীরামকৃষ্ণ প্রথম দর্শন করলেন নারায়ণ রুপি নরেন্দ্রনাথকে। শুধু গান শুনলেন না তিনি তার মধ্যেই দর্শন করলেন ভবিষ্যতের এক অতি পবিত্র আধার।

১৮৮৬! উদ্যানবাটি। দোলযাত্রা। দক্ষিণেশ্বর থেকে বিতাড়িত হয়ে তখন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ভক্ত ও শিষ্যদের নিয়ে কাশীপুরের উদ্যানবাটিতে বাস করছিলেন। সেই দোলযাত্রার দিনেই রং খেলার জন্য সকাল থেকে প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন নরেন্দ্রনাথ। তখন শ্রীরামকৃষ্ণের শরীর অত্যন্ত খারাপ। তিনি চলাফেরা করতে পারছেন না বললেই চলে। গলার রোগে অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছেন। অনাগত দুঃসংবাদের দুশ্চিন্তায় সকলেই ভারাক্রান্ত, ব্যথিত হৃদয়ে কাজ করে চলেছেন। ঠিক সেই সময় নরেন্দ্রনাথের এই উদ্যোগ সকলকে চমকিত করল। রাখাল অর্থাৎ ব্রহ্মানন্দ সোজাসুজি নরেন্দ্রনাথকে ডেকে বললেন, তুই কিরে নরেন! ঠাকুরের এই অবস্থা, তার মধ্যে তুই নাচ গান করে দোল উৎসব করবি? নরেন্দ্রনাথ হেঁসে বললেন, হ্যাঁ তাইতো, দোল পূর্ণিমা কি জানিস? এ হলো মহান ত্যাগ ও প্রেমের মিলন উৎসব, আমাদের ঠাকুর তো প্রেমের দেবতা! তাই আজ প্রেমময় চৈতন্যদেবের জন্মদিন পালন করব সবাই মিলে। নরেন্দ্রনাথের প্রস্তাবে সকলেই একমত। শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। খোল, করতাল, আবির সব আনা হলো। সকাল থেকেই শুরু হয়ে গেল উৎসব। প্রথমে সবাই মিলে উদ্যানবাটির দোতলায় ঠাকুরের ঘরে গিয়ে তাঁর পদযুগলে আবির দিলেন প্রণাম করলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সকলকেই রেকাবিতে থাকা আবির দিয়ে কপালে তিলক এঁকে দিলেন এবং সবাইকে বললে, হ্যাঁ রে, রং মেখে সং সেজে এই লোকটার বেজার মুখে বসে থাকার মত যেন থাকিস না, যা সবাই মজা কর আনন্দ কর। যেন বেজার মুখে থাকা এই লোকটার জন্য আনন্দ কম না হয়।

সেদিন উদ্যানবাটিতে ভক্ত, শিষ্য, সন্ন্যাসী সহ আরো বহু সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটেছিল। তারা সকলেই দোল উৎসবে যোগ দিল। তারা বাগানের এক প্রান্ত থেকে গান গাইতে গাইতে হরিনাম কীর্তন করতে করতে এগিয়ে আসতে লাগলেন। সেই দৃশ্যের ধারা বিবরণী ঠাকুরকে বলছিলেন মা সারদা। তিনি বললেন, দেখো নরেন রাখাল রং খেলতে খেলতে কি সুন্দর গান করছে। তুমি দেখবে নাকি? ঠাকুর এক কথায় রাজি। বললেন, তাহলে তো খুব ভালো হয়। আমায় নিয়ে চলো। মা সারদা একটা কেদারা টেনে নিয়ে এসে জানলার সামনে রাখলেন, তারপর ঠাকুরকে ধরে ধরে নিয়ে এসে সেই চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। ঠাকুর দেখতে লাগলেন। খুব আনন্দ পাচ্ছিলেন। নিজের মনেই হাততালি দিয়ে উঠছিলেন। তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছিল দক্ষিণেশ্বরে দোল উৎসবের দিন মন্দির চত্বরে হরিনাম কীর্তন এবং রং খেলার কথা। ঠাকুরের মনে পড়ল, ছোটবেলায় কামারপুকুরে বন্ধুদের সঙ্গে রং খেলা, গান গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে পাড়া পরিক্রমা করা এবং ফুটকরাই ভাজা ও নাড়ু খাওয়ার কথা, অবশেষে দল বেঁধে গ্রামের পুকুরে চান করা। এক মনে ঠাকুর উদ্যানবাটিতে নরেন রাখালদের দোল উৎসব দেখছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণকে জানালায় ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিচের ছেলেরাও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল! ঠাকুর আপন মনে দুটি শব্দ উচ্চারণ করলেন, জয় মা, জয় মা।