ভারতের জোট রাজনীতিতে নতুন করে অস্বস্তির সুর শোনা যাচ্ছে। তামিলনাড়ুর প্রধান আঞ্চলিক দল দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (ডিএমকে) যে আসন্ন ৮ জুনের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দেবে না, সেই সিদ্ধান্ত কেবল একটি কৌশলগত অনুপস্থিতি নয়— বরং তা জোট রাজনীতির গভীরে জমে থাকা অবিশ্বাস ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে কংগ্রেসের সঙ্গে দুই দশকের সম্পর্ক হঠাৎ ছিন্ন হওয়ার পর ডিএমকের এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
ডিএমকের বক্তব্যে স্পষ্ট, এই সিদ্ধান্ত দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একক অবস্থান নয়; বরং তা দলের তৃণমূল স্তরের কর্মী-সমর্থকদের অনুভূতির প্রতিফলন। ‘বিশ্বাসঘাতকতা’— এই শব্দটির ব্যবহার থেকেই বোঝা যায়, কংগ্রেসের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ডিএমকের কাছে কতটা আঘাত। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী হঠাৎ ভিন্ন পথে হাঁটলে রাজনৈতিক অঙ্কের বাইরে আবেগের প্রশ্নও সামনে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠতেই পারে— জাতীয় স্তরে যে বৃহত্তর উদ্দেশ্যে ‘ইন্ডিয়া’ জোট গঠিত হয়েছিল, তা কি আঞ্চলিক স্তরের রাজনৈতিক সমীকরণের চাপে দুর্বল হয়ে পড়ছে? ডিএমকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দল, যারা শুরু থেকেই এই জোটের অন্যতম মুখ্য শক্তি হিসেবে বিবেচিত, তাদের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি বড় বার্তা বহন করে।
মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের বক্তব্যে যে ক্ষোভ ফুটে উঠেছে, তা কেবল রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, কংগ্রেস একদিনে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এই অভিযোগ শুধু জোট ভাঙার নয়, বরং রাজনৈতিক সৌজন্যের অভাবের দিকেও ইঙ্গিত করে। রাজনীতিতে মতপার্থক্য স্বাভাবিক, কিন্তু তা যদি সংলাপের মাধ্যমে সমাধান না হয়ে হঠাৎ বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয়, তবে তার অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অন্যদিকে, ডিএমকে তাদের বিবৃতিতে যে বিষয়গুলির উল্লেখ করেছে— যেমন নীট পরীক্ষা, আসন পুনর্বিন্যাস, ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা— তা থেকে বোঝা যায়, তারা এখনও জাতীয় ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসছে না। অর্থাৎ, জোটের বৈঠকে অনুপস্থিতি মানে এই নয় যে তারা বৃহত্তর বিরোধী রাজনীতির বাইরে চলে যাচ্ছে। বরং এটি একটি চাপ সৃষ্টির কৌশল, যাতে তাদের উদ্বেগ ও অসন্তোষ গুরুত্ব পায়।
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের নীরবতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে অনীহা দেখিয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে কৌশলী হলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান নয়। কারণ, জোট রাজনীতির মূল ভিত্তি হল পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান। যদি তা ক্ষুণ্ণ হয়, তবে কেবল সংখ্যার সমীকরণ দিয়ে জোট টিকিয়ে রাখা যায় না।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে অভিনেতা বিজয়ের উত্থান এবং তাঁকে ঘিরে নতুন সমীকরণও এই দ্বন্দ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। কংগ্রেসের সেই দিকেই ঝোঁক ডিএমকের কাছে অস্বস্তির কারণ হওয়া স্বাভাবিক। আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন শক্তির আবির্ভাব প্রায়ই পুরনো জোটকে নাড়া দেয় এবং এখানে সেটাই ঘটছে।
সব মিলিয়ে, ডিএমকের এই সিদ্ধান্ত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সামনে একটি সতর্কবার্তা। যদি জোটের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য ও ক্ষোভকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধান না করা হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বড় ভাঙনের রূপ নিতে পারে।
এখন দেখার, আগামী দিনে কংগ্রেস ও ডিএমকে উভয়েই কি সংলাপের পথে ফিরে আসবে, নাকি এই দূরত্ব আরও বাড়বে। কারণ, ভারতের বহুদলীয় গণতন্ত্রে জোট রাজনীতি শুধুমাত্র প্রয়োজনের ফল নয়— তা একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা, যেখানে বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় পুঁজি।