বিশ্বের প্রথম বইমেলার কিছু কথা

মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ হল বই। বই হল আয়নার মতো, যাতে আমাদের মনের প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে। বইয়ের মতো অন্তরঙ্গ সহচর পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আমাদের নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোকে বই ভরিয়ে তোলে। শিশু কিশোরের কাছে বই দিক দর্শনের কাজ করে। বইমেলা বইপ্রেমী মানুষের মিলনতীর্থ। বইকে সর্বজনীন করার জন্য বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম। বইমেলা নবীন লেখকদের কাছে প্রতিভা বিকাশের মুক্তমেলা। প্রবীণ নবীন লেখকদের রচনা প্রকাশিত হয় বইমেলায়। তাছাড়া এই মেলা উপলক্ষে শিল্পী, কলাকুশলীরা ও তাঁদের সৃষ্টির সম্ভার নিয়ে উপস্থিত হতে পারেন, এইভাবে বইমেলা প্রকৃতই এক মিলনমেলা হয়ে ওঠে।

যে কোনও জাতির জীবন ও সংস্কৃতিতে বইমেলার গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। মানবজীবনে বইমেলা সদর্থক ভূমিকা পালন করে। জিজ্ঞাসু মননের ক্ষুধা যত বৃদ্ধি পাবে বইমেলার চাহিদাও ততই সম্প্রসারিত হবে। বইমেলায় বইয়ের সাগরে অবগাহন করে মানুষ জ্ঞানমুক্ত আহরণের পাশাপাশি লাভ করে মুক্তির আস্বাদ। তাই বইমেলা যেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সহায়ক। যে কোনও অন্যান্য গণমাধ্যমের মতো বইমেলাও পাঠকমনে বিপ্লব ঘটাতে পারে, তাদের চেতনা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। বই ব্যক্তিমনে যেমন সামাজিক বোধ জাগ্রত করে তেমনি যুক্তিনিষ্ঠ মনন ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিরও বিকাশ ঘটায়।

তাই পরোক্ষভাবে তা গণচেতনাকে সমৃদ্ধ ও বর্ধিত করে।প্রতিবছর সারা পৃথিবীজুড়ে উদযাপন হয় হাজারো উৎসব। কিন্তু বইয়ের উৎসব ঘিরে মানুষের আবেগ অন্যরকম। নতুন বইয়ের গন্ধে আর কত অজানা সব বিষয় নিয়ে উৎসাহী মানুষ এই ডট কম-এর যুগেও গিয়ে ভিড় করে বই মেলায়। আজকের জেনারেশান যেখানে ডিজিটাল লাইফেই অভস্থ সেখানে বইস্ব-মহিমায় একটা আস্ত মেলার আঙ্গিকে আমাদের সামনে হাজির হয় প্রতিবছর। ওয়েব দুনিয়ার পাশাপাশি ছাপার কালি-কাগজের দুনিয়া নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিজেই অক্ষুণ্ণ রেখেছে নীরবে। আর প্রতিনিয়ত চালিয়ে যাচ্ছে এক অনন্য বিপ্লব।


পৃথিবীতে প্রথম দিকে মানুষ গাছের বল্কলে, গুহায়, পাথরের গায়ে লেখালেখি করতো। আজ থেকে পাঁচ সাতশ বছর আগে যখন মানুষ প্রথম ছাপা যন্ত্র আবিষ্কার করলো তারপর থেকেই নীরবে ঘটে গেলো এক রেনেসাঁ। ইতিহাস বলছে প্রথম নাকি বাইবেলের কয়েকটি অধ্যায় ছেপেছিলেন গুটেনবার্গ সাহেব। তবে পৃথিবীর প্রথম উপন্যাসের নাম ‘গিলগামেশ’, যা প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় লেখা হয়েছিল। বর্তমানের ইরাক আর সিরিয়াজুড়ে ছিল সেই মেসোপটেমিয়া। লেখকের নাম জানা যায়নি।

হাজার হাজার বছর ধরে কেউ এই লেখা পড়তে পারেনি। ১৮৭০ সালে জর্জ স্মিথ নামে লন্ডনের এক শ্রমজীবী মানুষ ব্রিটিশ জাদুঘরের এই মাটির ফলক দেখতে দেখতে তার পাঠোদ্ধার করেন। ফলে গিলমামেশ–এর গল্পটা আমরা জানতে পারি।গিলগামেশ ছিলেন উড়ুক প্রদেশ, যা বর্তমানে ইরাকের দক্ষিণে অবস্থিত শহরের রাজা। তাঁর মা ছিলেন একজন দেবী। গিলগামেশ একজন বীর যোদ্ধা ছিলেন। গ্লেজ করা ইট দিয়ে তিনি এক অসাধারণ সুন্দর শহর তৈরি করেছিলেন, যা ছিল অভিনব প্রযুক্তি। অথচ তিনি ছিলেন নারীলিপ্সু আর অত্যাচারী। বিয়ের আসর থেকে মেয়েদের তুলে নিয়ে আসতেন তিনি। এই কারণে দেবতারা মিলে ‘এনকিডু’ নামের এক বন্য মানুষ তৈরি করেন উড়ুকের বাসিন্দাদের নিপীড়ন থেকে উদ্ধারের জন্য।

এনকিডু ছিলেন দেবীর হাত থেকে ঝেড়ে ফেলা মাটি দিয়ে তৈরি আধা মানুষ, আধা পশু, যাঁর সারা শরীর লোমে ভরা আর যিনি গাজেলাদের সঙ্গে ঘাস খেয়ে বড় হন। পরে কীভাবে তিনি পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠেন, গিলগামেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিস্তার এবং তার কারণে গিলগামেশের মানসিক পরিবর্তন, পৃথিবীর সুরক্ষার জন্য তাঁদের একসঙ্গে যুদ্ধের কথা আছে এই উপন্যাসে। আর আছে শেষ পর্যন্ত গিলগামেশের উপলব্ধি। যত বড় বীরই হোন না কেন, মৃত্যুকে জয় করতে পারে না কেউই। ২০১১ সালে গিলগামেশ-এর দ্বিতীয় একটা ফলক উদ্ধার হয়েছে। এখন সেটা আছে ইরাকের সুলায়মানিয়া জাদুঘরে।

বিশ্বের প্রথম বইমেলা শুরু হয় জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বইমেলা শুরু হয়েছিল পঞ্চদশ শতকে। মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারক ইয়োহানেস গুটেনবার্গ থাকতেন ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে সামান্য দূরের মেঞ্জ শহরে। তার আবিষ্কৃত ছাপাখানার যন্ত্র বইয়ের জগতে নিয়ে আসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তিনি নিজের ছাপাখানার যন্ত্রাংশ এবং ছাপানো বই বিক্রির জন্য ফ্রাঙ্কফুর্টে আসেন। গুটেনবার্গের দেখাদেখি ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের স্থানীয় কিছু বই বিক্রেতাও তাদের প্রকাশিত বই নিয়ে বসতে থাকে। আর এগুলো কিনতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষও আসতে শুরু করল। সেই আসা-যাওয়া থেকেই জমে উঠতে থাকে ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা। বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপের বাণিজ্য ও ব্যাংকিংয়ের কেন্দ্রে ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর। সেই সুবাদে ফ্রাঙ্কফুর্টাস মেসের কথা সেই দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই শোনা যায়।

বেশ কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সেই ১৪৭৮ সাল থেকেই এখানে বইমেলা হতো এবং তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালে এই মেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় ‘জার্মান প্রকাশক সমিতি’। আর ১৯৬৪ সাল থেকে এই মেলা পেয়ে যায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। পিটার ওয়েডহাস এই মেলার একজন পরিচালক ছিলেন ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত। তাঁর একটা বই আছে, ‘আ হিস্টি অব দ্য ফ্রাঙ্কফুর্ট বুকফেয়ার’ (ফাঙ্কফুর্ট বইমেলার ইতিহাস) নামে। সেখানে তিনি লিখেছেন, রাজা অষ্টম হেনরি নাকি স্যার টমাস বোডলিকে এই বইমেলায় পাঠিয়েছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন লাইব্রেরির জন্য বই কিনতে।

পরবর্তীকালে, সম্ভবত রানি মেরির রাজত্বকালে (ধর্মের নামে গণনিধনের কারণে যাঁর ডাকনাম হয়েছে ব্লাডি মেরি) নিষিদ্ধ বইয়ের এক তালিকা বানানো হলো। মেলার বহু বই ছিল সেই তালিকায়। এ কারণে ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রকাশনা ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্তও হয়। ১৭ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, প্রটেসন্ট্যান্ট শাসনাকালে ফ্রাঙ্কফুর্টকে ম্লান করে দিয়ে লেইপজিগ শহর প্রকাশনা বাণিজ্যের কেন্দ্রে চলে আসে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ১৯৪৯ সালে ২০৫টি জার্মান প্রকাশনীকে নিয়ে নতুন উদ্যমে চালু হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট মেলা। সেই মেলাই এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল আকারে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর অক্টোবর মাসে।

চলতি বছরে অক্টোবর মাসে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বইমেলার ৭৫তম আসর শেষ হল। জার্মানি এবং বিশ্বের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে প্রতিবছর এই মেলার আয়োজন করা হয়। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার বইপ্রেমীদের পদচারণে জমজমাট হয়ে উঠেছিল মেলা প্রাঙ্গণ। বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশক থেকে শুরু করে বইবিষয়ক নানা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত মানুষদের পাঁচ দিনের মিলনমেলা ছিল জমজমাট। বই প্রকাশক ও লেখকদের বৃহত্তম এই বইমেলায় মিলিত হয়েছিলেন ১৩০ দেশের বইপ্রেমী। বইমেলাকে কেন্দ্র করে ফ্রাঙ্কফুর্ট যেন উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছিল।