নারী হেনস্থার বিরুদ্ধে আরও কঠোর হতে হবে সমাজকে

প্রতীকী চিত্র

বিহারের জামুই জেলার একটি ঘটনা আবার আমাদের সমাজের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। দুই কিশোর-কিশোরী, দু’জনেই দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রী, একই কোচিং প্রতিষ্ঠানে পড়ত। পড়াশোনা শেষ করে তারা কিছু ছবি তুলতে একটি এলাকায় গিয়েছিল। সেখানেই একদল যুবক তাদের পথ আটকায়। কিশোরটিকে মারধর করা হয় এবং তার বন্ধুকে অর্থাৎ কিশোরীটিকে প্রকাশ্যে যৌন হেনস্থা করা হয়। ঘটনার কিছু অংশ মোবাইল ফোনে তুলে রাখা হয় এবং পরে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে
ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাটি নিছক একটি অপরাধের ঘটনা নয়। এর মধ্যে রয়েছে নারীকে তার নিজের শরীর, চলাফেরা, বন্ধুত্ব এবং পছন্দের ওপর অধিকারহীন মনে করার এক গভীর মানসিকতা। প্রশ্ন উঠতেই পারে— কোনও তরুণীকে তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা গেলেই তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার, অপমান করার বা শারীরিকভাবে হেনস্থা করার অধিকার কে দিয়েছে ওই ব্যক্তিদের? উত্তর একটাই— কেউ দেয়নি।
একজন মেয়ে কোথায় যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে কিংবা কোথায় ছবি তুলবে— এসব তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ। তার পোশাক, চলাফেরা বা বন্ধুত্বকে অজুহাত করে তাকে হেনস্থা করার অধিকার কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। এই মৌলিক কথাটি আমাদের সমাজে যত দ্রুত এবং যত স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, ততই মঙ্গল।
নারী হেনস্থার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান তাই দ্ব্যর্থহীন হওয়া দরকার। রাস্তায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, গণপরিবহনে কিংবা কোনও নির্জন জায়গায়— কোথাও একজন নারী বা কিশোরীকে অপমান, ভয় দেখানো, অনিচ্ছাকৃতভাবে স্পর্শ করা বা যৌন হয়রানি করার অধিকার কারও নেই। বিশেষত কোনও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ক্ষেত্রে এমন আচরণ অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।
এই ঘটনার আর একটি ভয়াবহ দিক হল ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া। অপরাধের দৃশ্য ধারণ করে তা প্রচার করা আক্রান্ত ব্যক্তির যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ভুক্তভোগী যখন অপ্রাপ্তবয়স্ক, তখন তার পরিচয়, ছবি বা এমন কোনও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া তার ভবিষ্যৎ জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এমন ভিডিও দেখা, সংরক্ষণ করা বা অন্যের কাছে পাঠানোর পরিবর্তে তা রিপোর্ট করা এবং ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করার চেষ্টা করাই মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ।
জামুইয়ের ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওতে দেখা একটি গাড়ির নম্বরের সূত্র ধরে দুই কিশোর-কিশোরীকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাদের বক্তব্য নেওয়া হয় এবং কিশোরীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়। শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে সুরক্ষার জন্য প্রযোজ্য পকসো আইনেও মামলা হয়েছে। পুলিশ তিন নাবালককে গ্রেফতার করেছে এবং আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানানো হয়েছে। তদন্তকারী দল গঠন করে বাকি অভিযুক্তদের খোঁজ চলছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি— অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনই তদন্তও হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক। কেউ অপরাধী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের মধ্যে যারা নাবালক, তাদের ক্ষেত্রেও শিশু-ন্যায়বিচারের বিধান অনুসরণ করতে হবে। অপরাধের গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেই আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে চলাই সভ্য সমাজের পথ।
জামুইয়ের ঘটনাটি ‘মরাল পুলিশিং’-এর বিপদ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একজন তরুণ-তরুণীকে একসঙ্গে দেখলেই তাদের নৈতিকতা বিচার করার অধিকার কোনও ব্যক্তি বা দল পায় না। আরও বড় কথা, কাউকে ‘শিক্ষা দেওয়ার’ নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তিগত নৈতিকতার নামে হিংসা বা যৌন হেনস্থাকে বৈধতা দেওয়া যায় না।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার পরে রাজ্যের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেছেন, কেউ সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাজনৈতিক বিতর্ক গণতন্ত্রে স্বাভাবিক। কিন্তু একটি কিশোরীর ওপর যৌন হেনস্থার মতো গুরুতর ঘটনাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব হল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, ভুক্তভোগীকে নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া এবং তার পরিচয় গোপন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের উদ্বেগকে ছোট না করে তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
তবে এই ঘটনার দায় কেবল পুলিশের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। পরিবারে ছেলে ও মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে— সম্মতি কী, ব্যক্তিগত সীমারেখা কী, অন্যের মর্যাদার প্রতি সম্মান কী এবং ‘না’ কথাটির অর্থ কী। স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নারী-পুরুষের সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সম্মানের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।
এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। আক্রান্ত কিশোরী বা তার বন্ধুকে নিয়ে কোনও ধরনের কটূক্তি, দোষারোপ বা চরিত্র বিচার করা উচিত নয়। একজন নারী হেনস্থার শিকার হলে প্রশ্ন হওয়া উচিত— কেন তাকে হেনস্থা করা হল এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সে কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে ছিল বা কেন সেখানে গিয়েছিল— এসব প্রশ্ন কখনও অপরাধীর দায়কে মুছে দিতে পারে না। নারীর স্বাধীনতা কোনও দয়া নয়, এটি তার অধিকার। একটি মেয়ে তার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলবে, পড়াশোনা করবে, ছবি তুলবে, কাজ করবে, একা চলাফেরা করবে— এসব স্বাভাবিক নাগরিক স্বাধীনতার অংশ। সমাজ যদি প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে ভয় দেখায়, তবে নারী-নিরাপত্তা নিয়ে যত আইনই থাকুক, প্রকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে না।
জামুইয়ের ঘটনা তাই শুধু বিহারের একটি জেলার ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আমাদের সকলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নারী হেনস্থা, যৌন হিংসা এবং ‘মরাল পুলিশিং’-এর বিরুদ্ধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, প্রশাসন এবং আইন— সব স্তরেই স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার দুর্বল বা অসহায় মানুষের সঙ্গে আচরণে প্রকাশ পায়। কোনও কিশোরী যেন রাস্তায় বেরিয়ে এই ভয় না পায় যে তাকে কেউ অপমান করবে, পথ আটকাবে বা তার স্বাধীনতার বিচার করবে— এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আইন অপরাধীর বিরুদ্ধে কাজ করবে, সমাজ ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াবে এবং মানুষ বুঝবে— নারীর শরীর, মর্যাদা ও স্বাধীনতার ওপর তার নিজেরই অধিকার।
নারীকে ‘রক্ষা’ করার নামে তাকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং তার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আধুনিক সমাজের প্রকৃত দায়িত্ব। জামুইয়ের ঘটনার পর আমাদের সেই কথাটিই আরও জোর দিয়ে বলা দরকার— নারী হেনস্থা কোনওভাবেই স্বাভাবিক নয়, গ্রহণযোগ্য নয়; এর বিরুদ্ধে সমাজকে আরও কঠোর এবং আরও সচেতন হতে হবে।