নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। ব্যালট বাক্সের লড়াইয়ে কোন দল জিতল আর কে হারল, তার চেয়েও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা হয়ে দাঁড়ায়— কে কত বড় বা কত বেশি সামাজিক প্রকল্পের ডালি সাজিয়ে বসতে পারল। ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ থেকে ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’ ‘বিনামূল্যে রেশন’ থেকে ‘বার্ধক্য ভাতা’, ‘আয়ুষ্মান ভারত’ কিংবা ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষক যোজনা’ থেকে ‘কন্যাশ্রী’— আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন এই সামাজিক কল্যাণকামী প্রকল্পগুলোই। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্নচিহ্ন তোলা জরুরি— এই সামাজিক প্রকল্পগুলো কি সত্যিই সাধারণ জনগণের দীর্ঘমেয়াদী আস্থা অর্জনে সফল হচ্ছে? নাকি এগুলো কেবল সাময়িক ভোট বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল এবং সরকারের স্থায়িত্বের একমাত্র নির্ভরশীল রক্ষাকবচ? সরাসরি বলতে গেলে, সামাজিক প্রকল্প এবং জনমানসের আস্থার সম্পর্কটি দ্বিমুখী, জটিল এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল।
প্রথমত, আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে যেখানে এক বিশাল জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক এবং প্রাত্যহিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, সেখানে এই প্রকল্পগুলো কেবল ‘রাজনীতি’ নয়, জীবনধারণের অন্যতম দৈনিক অবলম্বন। একটি দরিদ্র পরিবারের নারী যখন প্রতি মাসে নিশ্চিতভাবে কিছু অর্থ সরাসরি নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে হাতে পান, কোনও পরিবার যখন মাথার উপর একটা পাকা ছাদ পায়, কিংবা হঠাৎ নেমে আসা গুরুতর অসুস্থতায় ‘আয়ুষ্মান ভারত’ বা ‘স্বাস্থ্য সাথী’-র কার্ডটি পাশে ভরসা জোগায়— তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক এবং আবেগগত নির্ভরতা তৈরি হয়। রাষ্ট্রকে তখন আর কোনও দূরবর্তী, জটিল বা বিমূর্ত প্রশাসনিক কাঠামো মনে হয় না, মনে হয় এক পরম আশ্রয়দাতা এবং অভিভাবক। এই দৃশ্যমান সাহায্যই সরকারের প্রতি এক নিবিড় আস্থার জন্ম দেয়।
সাম্প্রতিককালের একাধিক জাতীয় এবং আঞ্চলিক নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, প্রথাগত জাত-পাত, ধর্ম বা ভাবাদর্শের রাজনীতির চেয়েও লাভার্থী বা সুবিধাভোগী শ্রেণির নীরব সমর্থন যে কোনও সরকারের স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে অনেক বেশি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করছে। রাজনীতি বিজ্ঞানীদের পরিভাষায়— এটি হলো ‘সুবিধাভোগী অর্থনীতি’ যা প্রথাগত প্রতিষ্ঠান-বিরোধী তীব্র হওয়াকেও অনায়াসে রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সামাজিক প্রকল্প মানেই কি সরকারের নিষ্কণ্টক স্থায়িত্ব? ইতিহাস এবং সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি বলছে, তা একেবারেই নয়। যদি শুধুমাত্র ভাতার রাজনীতিই স্থায়িত্বের চাবিকাঠি হতো, তবে কোনও কল্যাণকামী সরকারকেই কখনও গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত হতে হতো না। জনগণের আস্থা অর্জনের মূল চালিকাশক্তি হলো প্রকল্পের ‘স্বচ্ছতা’ এবং ‘ন্যায্যতা।’ একটি কল্যাণমুখী প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও যদি তা পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপোষণ, দলবাজি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা কাটমানির মতো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে তা আস্থার পরিবর্তে জনমানসে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষ যখন দেখেন যে, প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তি বা চরম দরিদ্র পরিবারটি বঞ্চিত হচ্ছে, অথচ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশীল বা শাসকদলের ঘনিষ্ঠরা অনায়াসে সুবিধা পাচ্ছেন, তখন সেই প্রকল্পই উল্টে সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানেই উঠে আসে এক গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, যা নিয়ে আধুনিক অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক চলছে। কল্যাণকামী প্রকল্প আর ‘খয়রাতি’ বা ‘পপুলিজম’-এর মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ রেখা রয়েছে। সাময়িক আর্থিক অনুদান বা বিনামূল্যে খাদ্যশস্য হয়তো প্রান্তিক মানুষকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয় এবং দারিদ্র্যের চরম রূপকে সামাল দেয়, কিন্তু তা কখনও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী কর্মসংস্থান বা দারিদ্র্য দূরীকরণের স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার বিভিন্ন আর্থিক সমীক্ষায় বারবার রাজ্যগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে যে, অনুৎপাদক খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের বোঝা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে তোলে। কোনও সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূলধনী বিনিয়োগ এড়িয়ে শুধু সাময়িক ভাতার রাজনীতি দিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে তা একসময় বড়সড়ো সমষ্টিগত অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। রাজকোষের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো বা রাস্তার মতো বুনিয়াদি ক্ষেত্রগুলো চরমভাবে অবহেলিত হয়। সচেতন নাগরিক সমাজ এবং করদাতা মধ্যবিত্ত শ্রেণি তখন এই বিপুল খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। ফলে যে রাজনৈতিক স্থায়িত্বের লোভে দেদার প্রকল্প চালানো হচ্ছিল, অর্থনৈতিক দেউলিয়াপনার মুখে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
জনগণের প্রকৃত এবং দীর্ঘমেয়াদী আস্থা তখনই অর্জিত এবং বজায় থাকে, যখন এই সামাজিক প্রকল্পগুলো মানুষকে চিরকাল পরনির্ভরশীল না করে ক্রমান্বয়ে স্বনির্ভর করে তোলে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ বা সক্ষমতা বৃদ্ধির তত্ত্ব অনুযায়ী— রাষ্ট্রের মূল কাজ হওয়া উচিত মানুষের অন্তর্দৃষ্টি ও সামর্থ্য বাড়ানো, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ— ‘১০০ দিনের কাজ’ যদি শুধু কৃত্রিমভাবে গর্ত খোঁড়া আর বোজানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থায়ী গ্রামীণ সম্পদ যেমন জলাশয় সংস্কার, গ্রামীণ রাস্তা বা উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়, তবে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে। একইভাবে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা করে তোলা গেলে তারা পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ‘কন্যাশ্রী’-র মত প্রকল্প যখন বাল্যবিবাহ রোধ করে ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষার দিকে ধাবিত করে, তখন তা কেবল একটি বার্ষিক আর্থিক অনুদান থাকে না, তা হয়ে উঠে এক সুদূরপ্রসারী সামাজিক রূপান্তরের নীরব হাতিয়ার। জনগণ তখন মন থেকে বোঝে যে, সরকার তাদের কেবল দয়া বা খয়রাতি করছে না বরং তাদের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিচ্ছে এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার স্থায়ী সুযোগ করে দিচ্ছে। এই আত্মমর্যাদা বোধই যে কোনও গণতান্ত্রিক সরকারের স্থায়িত্বের সবচেয়ে মজবুত এবং দুর্ভেদ্য ভিত।
পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক প্রকল্পগুলো নিঃসন্দেহে আধুনিক রাষ্ট্রে জনগণের আস্থা অর্জন ও সরকারের স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী, শক্তিশালী এবং নির্ভরশীল উপাদান। কিন্তু এই নির্ভরতা কখনই শর্তহীন বা চিরস্থায়ী নয়। প্রকল্পকে যদি কেবল নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য এবং ভোটের অঙ্ক মেলানোর ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তার রাজনৈতিক মেয়াদ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হতে বাধ্য। কারণ, মানুষের চাহিদা পরিবর্তনশীল, আজকের ভাতা আগামীকালের কর্মসংস্থানের দাবির কাছে ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু কল্যাণকামী প্রকল্পগুলোকে যদি সুশাসনের হাতিয়ার, মানবসম্পদ উন্নয়ন, লিঙ্গ সমতা এবং সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের দীর্ঘমেয়াদি মাধ্যম হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োগ করা যায়— তবে তা শুধু একটি নির্দিষ্ট সরকারের স্থায়িত্বই নিশ্চিত করে না, বরং একটি সুস্থ, সবল ও পরিপক্ক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দেয়।