মনোজকুমার হালদার: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল তা নতুন মাত্রা পেয়েছে এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায় শেষ হবার পরেই। এখন তা আর নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়াকে একটি নিয়মিত ও আইনসম্মত উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও তার বাস্তবতা রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রের উপর জনগণের আস্থা এই সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলমান এস আই আর প্রক্রিয়ায় এ রাজ্যে প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ৭.৬ শতাংশ। বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় ২৪ লক্ষ মৃত, প্রায় ২০ লক্ষ স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত এবং প্রায় ১২ লক্ষ অনুপস্থিত বা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া ডুপ্লিকেট ও অন্যান্য ত্রুটির কারণে আরও বেশ কিছু নাম বাদ পড়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে— যদি এত বড় সংখ্যক ভোটারের অস্তিত্ব যাচাইযোগ্য না হয়ে থাকে, তারা পূর্ববর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছিলেন কীভাবে? গণতন্ত্রের সবচেয়ে পবিত্র প্রক্রিয়া হল নির্বাচন, সেই নির্বাচন কি দীর্ঘদিন ধরে ত্রুটিপূর্ণ ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ছিল?
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ও নাগরিকত্ব যাচাই কমিশনের সরাসরি এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না; তা সংশ্লিষ্ট আইন ও নথিভিত্তিক ঘোষণার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আজকের তথ্য আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন করে— তাহলে ২০০২–২০২৫ সালের মধ্যে যুক্ত নতুন ভোটারদের যাচাই কি যথাযথ হয়নি বা সেই প্রক্রিয়ায় কি আবহেলা করা হয়েছিল? আজকের এসআইআর কি সেই অতীতের অবহেলারই প্রতিফলন? মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা দেখায় এখানে প্রশাসনিক শিথিলতা, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং কখনও কখনও নজরদারির অভাব একত্রিত হয়ে ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতাকে এই প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এসআইআর চলাকালীন এক বিপুল সংখ্যক (প্রায় ১.৩৬ কোটি) ভোটারের তথ্য যুক্তিগ্রাহ্য বা তথ্যের অসঙ্গতি (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) হিসেবে চিহ্নিতকরণ। যেখানে বয়সের গরমিল, পিতা-মাতার নামের ভুল, ঠিকানার অসংগতি প্রভৃতি ধরা পড়েছে। যা থেকে স্পষ্ট হয়, ভোটার তালিকা দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত দুর্বলতার শিকার। যদিও এই ভোটারদের নাম চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়া হয়নি, কিন্তু এত বড় সংখ্যক অসঙ্গতি প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থায় নাড়া দিচ্ছে। দেশের শীর্ষ আদালতও সপ্রতি এই যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
প্রশাসনিক ত্রুটির দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে বি এল ও অ্যাপের প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে প্রায় ১.৩ লক্ষ বৈধ ভোটারকে ভুলভাবে ডাটাবেসে সংযুক্ত নয় বা (আনম্যাপড) হিসেবে চিহ্নিত করে শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছিল, যা পরে বাতিল করতে হয়। আবার সম্প্রতি বয়স্ক ও অসুস্থ ভোটারদের সশরীরে শুনানিতে আসতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠার পর, নির্বাচন কমিশন এক নির্দেশে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, অসুস্থ অথবা প্রতিবন্ধী কোনো ভোটারকে এসআইআর সংক্রান্ত শুনানিতে সশরীরে হাজির হতে বাধ্য করা যাবে না।
অর্থাৎ, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ঘটনার বিশ্লেষণ দেখায় কমিশনের ত্রুটি তিনভাবে হয়েছে— প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়, প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার যতই প্রয়োজনীয় হোক না কেন, তা নির্ভুল পরিকল্পনা ও মানবিক নজরদারি ছাড়া কার্যকর হতে পারে না। এই সব ত্রুটি আরও প্রমাণ করে যে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ যদি প্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তবে তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পারে না। এস আই আর প্রক্রিয়া তখন কেবল শুদ্ধিকরণের প্রচেষ্টা নয়, বরং কমিশনের ত্রুটি ও অবহেলার প্রমাণ হিসেবেও দেখা যায়।
সাধারণত এত বড় সরকারি প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে একটি পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করাই দস্তুর; যাতে বড় পরিসরে প্রয়োগের সময় ত্রুটি কমানো যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে তার ইতিবাচক প্রতিফলন কোথায় ? নাহলে কমিশনের তরফে দিনে দিনে নতুন নির্দেশ ও সংশোধনী একদিকে প্রশাসনিক কর্মীদের, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে চরম হয়রানি ও বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই নানাভাবে দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলিও এখানে তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারেনা । যে কোনো প্রশাসনিক কাজ বা ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো কাজ দেশের স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে হওয়াই উচিত। এখানে দলীয় স্বার্থ কখনও দেশের স্বার্থের উপরে স্থান পাওয়া কাম্য নয়। এই বিশাল কাজে কিছু বিচ্যুতি স্বাভাবিক—কিন্তু সেই বিচ্যুতিকে নিয়ন্ত্রণ ও সমাধান করার দায়িত্ব প্রশাসনের। গণতন্ত্রে জনগণের স্বার্থে এই কাজে রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংবেদনশীলতা কাম্য হলেও তা এখানে কল্পনাতীত । এই প্রক্রিয়া যে স্বাভাবিক এবং স্বচ্ছ তা জনগণকে বোঝানোর দায়িত্ব প্রশাসন আস্বীকার করতে পারেনা।
সেই দায়িত্বের দুর্বলতাই আসলে পরোক্ষে এক বড় অংশের সাধারণ মানুষকে ভীত, অজানা আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন করেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও পরিযায়ী ভোটার তাদের ভোটাধিকার হারাবার ভয়; কখন দেশ ছাড়ার অহেতুক উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি, এবং ভয়ের অনুভূতি তাদের গ্রাস করেছে। কে প্রকৃত নাগরিক, কে নয়— এই প্রশ্নগুলো জনমনে এমন একটি বাতাবরণ তৈরি করেছে যা গণতান্ত্রিক আস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই ভয়, বিভ্রান্তি দূর করার জন্য প্রকৃত তথ্য ও তার বাস্তব বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে না সরকারী দল বা বিরোধী দলগুলি কিংবা নির্বাচন কমিশন—কেউই সদর্থক কার্যকর ভূমিকা তুলে ধরতে সফল হয়নি।
রাজনৈতিক দলগুলির উচিত ছিল দলীয় স্বার্থের আগে দেশের স্বার্থ রক্ষায় মানুষকে আশ্বস্ত করা। কিন্তু এখানে দল ও নির্বাচন কমিশন যেন একে অন্যের প্রতিপক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ।এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই পশ্চিমবঙ্গের সরকারি দলের পক্ষ থেকে এর বিরোধিতার সুর বেঁধে দেওয়া হয় সারের উদ্দেশ্য ও উপায় একপ্রকার গুলিয়ে দিয়ে ; দাবি তোলা হয় একজনও বৈধ ভোটারের নাম যেন বাদ না যায়। অন্যদিকে রাজ্যের বিরোধী দল একে প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করে যে ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারী বা অবৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেয়া উচিত।
আবার নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার স্পষ্ট করা হয়েছে যে এস আই আর – এর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বৈধ ভোটারদের নিয়ে একটি শুদ্ধ, নির্ভুল ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রকাশ করা। প্রশ্ন ওঠে— তাহলে সমস্যা কোথায়? সব পক্ষই তো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে একটি শুদ্ধ, নির্ভুল ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকার কথাই বলেছে। আসলে মূল সমস্যা ছিল এস আই আর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলির পারস্পরিক রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা। গোলোক ধাঁধায় আটকে গেছে প্রকৃত বৈধ ভোটার কে ? এই প্রশ্নে ।
যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে দিক হারিয়েছে রাজনৈতিক দল বা নির্বাচন কমিশন নয়; আম জনতা । আর এই দিকভ্রান্তিই রাজনীতির কারবারিদের মূলধন। এই আবহে, এস আই আর আজ শুধুই প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রও বটে।ভোটার তালিকা শুদ্ধ হওয়া গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। তবে সেই শুদ্ধিকরণ যদি রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা এবং অতীতের অবহেলা ঢাকার কৌশলে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জনগণের আস্থা আরও ক্ষুণ্ণ করবে।
এসআইআর তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা পূর্ণ স্বচ্ছতা, পূর্ববর্তী অনিয়মের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত হবে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য এসআইআর কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি গণতান্ত্রিক আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ। প্রশ্ন একটাই— এই সুযোগ কি সত্যিই কাজে লাগানো হবে, নাকি ইতিহাস লিখবে, এস আই আর-এর আরেকটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার অধ্যায়?