পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, খসড়া তালিকার পর ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল, তার সঙ্গে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’র অজুহাতে আরও বিপুল সংখ্যক নাম মুছে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা পরিচয়ে নাম বাদ দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবু রাজনৈতিক পরিসরে সংখ্যা ও পরিচয়— দুই নিয়েই তর্ক তীব্র।
এই প্রসঙ্গে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী-সহ একাধিক বিজেপি নেতা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ ‘বাংলাদেশি মুসলমান’ ও রোহিঙ্গার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। প্রশ্ন হল, নির্বাচন কমিশন যখন এ ধরনের কোনও সরকারি ঘোষণা করেনি, তখন এই নির্দিষ্ট সংখ্যা ও পরিচয়ের ভিত্তি কী? রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিসংখ্যানের ব্যবহার নতুন নয়, কিন্তু ভোটার তালিকার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে পূর্বঘোষণা বা পূর্বাভাস জনমনে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ বাড়ায়।
নির্বাচন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে আস্থা। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্বই হল সেই আস্থা অটুট রাখা। ভোটার তালিকা সংশোধন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া— মৃত ভোটার বাদ পড়বেন, ঠিকানা বদলালে সংশোধন হবে, ডুপ্লিকেট নাম মুছে যাবে। কিন্তু ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ শব্দবন্ধ যদি অস্পষ্ট থেকে যায়, কিংবা যথাযথ নোটিস ও আপিলের সুযোগ না থাকে, তবে সাধারণ নাগরিকের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষত যখন সংখ্যাটি কোটি ছুঁইছুঁই বলে রাজনৈতিক মহলে উচ্চারিত হচ্ছে।
এখানেই মূল সঙ্কট— প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বনাম রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। যদি সত্যিই ১ কোটির বেশি নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে নির্বাচন কমিশনের উচিত স্পষ্ট তথ্য-পরিসংখ্যান প্রকাশ করা– কতজন মৃত, কতজন স্থানান্তরিত, কতজনের নথিতে অসঙ্গতি, কতজন আপিল করেছেন এবং কতজনের নাম পুনর্বহাল হয়েছে। এই বিশদ তথ্য না দিলে জল্পনা বাড়বে, আর সেই ফাঁকেই রাজনৈতিক ব্যাখ্যা স্থান করে নেবে। অন্যদিকে, রাজনীতির ময়দানে নাগরিকত্ব ও অভিবাসন প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র আবেগের বিষয়। ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ তকমা ব্যবহার করে ভোটার তালিকা সংশোধনের আগাম ইঙ্গিত দেওয়া হলে তা সহজেই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ডেকে আনতে পারে। অথচ নির্বাচন কমিশন কখনও এমন পরিচয়ভিত্তিক বাছাইয়ের কথা বলেনি। ফলে প্রশ্ন জাগে, রাজনৈতিক বক্তব্য কি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে, না কি প্রশাসনিক নীরবতা রাজনৈতিক বক্তব্যকে উৎসাহ দিচ্ছে?
মুখ্যমন্ত্রী একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, কমিশন নাকি শাসক দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে কাজ করছে। এই অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষ হলেও দেশজুড়ে এই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি নিজেই একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে। গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা শুধু বাস্তবে নয়, প্রতীয়মানভাবেও নিশ্চিত হওয়া জরুরি। যদি সাধারণ ভোটার মনে করেন তাঁর নাম অকারণে বাদ পড়তে পারে, তবে তা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণে নিরুৎসাহ সৃষ্টি করবে।
সমাধান কী? প্রথমত, পূর্ণ স্বচ্ছতা। খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকার মধ্যে পরিবর্তনের বিশদ কারণ জনসমক্ষে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ আপিল প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যাতে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁরা দ্রুত প্রতিকার পান। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলিরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন— অসম্পূর্ণ তথ্য বা অনুমাননির্ভর সংখ্যা প্রচার না করে প্রমাণসহ বক্তব্য রাখা উচিত।
ভোটার তালিকা কেবল একটি প্রশাসনিক নথি নয়, এটি নাগরিক অধিকারের ভিত্তিপত্র। একবার যদি মানুষের মনে সন্দেহ জন্মায় যে, তালিকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে, তবে সেই ক্ষত সহজে সারবে না। তাই নির্বাচন কমিশনের উচিত দ্রুত ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিষ্কার করা। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক পক্ষেরও মনে রাখা দরকার, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা খর্ব করা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রেরই ক্ষতি। এসআইআর বিতর্ক তাই কেবল সংখ্যা-তর্ক নয়, এটি আস্থার প্রশ্ন। সেই আস্থা রক্ষা করাই নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।