সংশোধনের নামে সংকট তৈরি করেছে এসআইআর

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সৈয়দ হাসমত জালাল

পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর) ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি বা রুটিন তালিকা সংশোধনের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ভোটার তালিকা একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া— আইন অনুযায়ী এটি চলমান সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের মধ্য দিয়ে আপডেট হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকা নামের বানান নিয়ে ২০২৫ সালে হঠাৎ শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিস পাঠানো হচ্ছে। দুই দশকেরও বেশি পুরনো নথির তথাকথিত ‘ত্রুটি’ নিয়ে নাগরিকদের জবাবদিহি করতে বলা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠবেই, এতদিন নির্বাচন কমিশন কোথায় ছিল?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নামের বানান ভুলের জন্য ভোটারদের কার্যত কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ একটি মৌলিক সত্য উপেক্ষিত, ভোটার কখনোই নিজের নাম ভোটার তালিকায় লেখেন না, তা লেখেন সরকারি কর্মীরা। বানানগত ত্রুটি, ভাষাগত রূপভেদ, ইংরেজি-হিন্দি-বাংলা রূপান্তরের সমস্যার দায় প্রশাসনের। বহু ভোটার বছরের পর বছর ধরে সংশোধনের আবেদন করেছেন, কিন্তু সংশোধিত বানান প্রতিফলিত হয়নি। এখন সেই পুরনো ত্রুটিকে হাতিয়ার করে তাঁদেরই শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। অত্যন্ত বয়স্ক মানুষদের, যাঁরা ২০০২ সালেও প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন, তাঁদের হাজিরা দিতে বলা— এ এক ধরনের প্রশাসনিক অসংবেদনশীলতার উদাহরণ।


এই প্রক্রিয়াকে আরও বিতর্কিত করেছে সময়সীমা। তিন মাসের মধ্যে এত বিস্তৃত যাচাই ও সংশোধন শেষ করার নির্দেশ বাস্তবসম্মত কি? একটি ঘনবসতিপূর্ণ, অভিবাসনপ্রবণ রাজ্যে বাড়ি বাড়ি যাচাই, নথি পরীক্ষা, শুনানি— সব মিলিয়ে এটি একটি বিশাল প্রশাসনিক কাজ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই তাড়াহুড়োর পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে কি না। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আস্থাই মূল সম্পদ। যখন সিদ্ধান্ত ও সময়সূচি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় না, তখন সন্দেহের জন্ম হয়।

সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। আদালতের নির্দেশে মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড ও আধার কার্ড গ্রহণযোগ্য নথি হিসেবে মানতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম পর্যায়ে কমিশনের নির্ধারিত নথিপত্রের তালিকা নিয়ে আপত্তি ছিল বলেই বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছে। শুধু তাই নয়, আইনি যাচাই প্রক্রিয়ায় বিচারকদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশও এসেছে। এর অর্থ স্পষ্ট— প্রক্রিয়াটি নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠেছে, যা বিচারবিভাগীয় নজরদারির প্রয়োজন তৈরি করেছে। এটি গণতন্ত্রের পক্ষে সুস্থ লক্ষণ নয়, বরং প্রশাসনিক আস্থাহীনতার ইঙ্গিত।

ভোটার তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজনীয়। সেটিই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কিন্তু যখন অভিযোগ ওঠে যে তুচ্ছ অজুহাতে যোগ্য ভোটারদের নামও বাদ যাচ্ছে বানানের অমিল, ঠিকানার ক্ষুদ্র অসঙ্গতি, নথির সামান্য ঘাটতির কারণে, তখন বিষয়টি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিবাহিত মহিলাদের ঠিকানা পরিবর্তন, শ্রমজীবী মানুষের অস্থায়ী স্থানান্তর, ভাষাগত রূপভেদের মতো বাস্তব সমস্যাকে উপেক্ষা করলে প্রকৃত ভোটারদের বাদ পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।

এই প্রক্রিয়ার মানবিক মূল্যও কম নয়। সংশোধন ও শুনানির চাপে প্রায় ১৪০ জন মানুষের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যে বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)-রাও আছেন। কেউ আত্মহত্যা করেছেন, কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনাগুলি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং অনভিপ্রেত।

প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মী বা সাধারণ নাগরিক চরম মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা সংশোধন একটি স্বাভাবিক কাজ, তা কেন আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠবে?

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— ভোটাধিকার কি নাগরিকের প্রাপ্য, না প্রশাসনের অনুগ্রহ? সংবিধান সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। সেই অধিকার প্রয়োগের জন্য নাগরিককে অতিরিক্ত প্রমাণের বোঝা বইতে বাধ্য করা কতটা ন্যায়সঙ্গত? বিশেষ করে যখন ত্রুটির উৎস প্রশাসনিক, তখন দায়ভার নাগরিকের উপর চাপানো গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী।

আরও একটি প্রেক্ষাপট বিবেচ্য। জনগণনার সাম্প্রতিক তথ্য বহু বছর ধরে অনুপস্থিত। জনসংখ্যার গঠন, অভিবাসন, নগরায়ন—সব বদলেছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে হঠাৎ বৃহৎ আকারের যাচাই শুরু করলে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ভোটার তালিকা একটি চলমান প্রক্রিয়া— ২০০২-এর তালিকা থেকে ২০২৫-এ এসে হঠাৎ এই জেগে ওঠা প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার অভাবকেই বড় করে তুলে ধরেছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। নির্বাচন কমিশনের শক্তি তার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতায়। সেই বিশ্বাস যদি ক্ষুণ্ণ হয়, তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এই অবস্থায় প্রয়োজন কয়েকটি স্পষ্ট পদক্ষেপ। প্রথমত, সংশোধন প্রক্রিয়ার সময়সীমা বাস্তবসম্মত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বানান বা ভাষাগত ত্রুটির জন্য ভোটারকে দায়ী না করে প্রশাসনিক দায় স্বীকার করতে হবে। তৃতীয়ত, শুনানি প্রক্রিয়াকে মানবিক ও প্রবীণদের জন্য সহজ করতে হবে। চতুর্থত, সমস্ত সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা বজায় রেখে তথ্য প্রকাশ করতে হবে— কত নাম বাদ গেল, কেন বাদ গেল, কতজন আপিল করলেন ইত্যাদি।
গণতন্ত্রে নির্বাচন কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়, এটি নাগরিকের আস্থার উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় যদি ভয়, বিভ্রান্তি ও সন্দেহ প্রবেশ করে, তবে তা সমগ্র ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।

পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-র অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক কে তুলেছে— সংশোধনের নামে যেন সংকট তৈরি না হয়। ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ হোক, কিন্তু সেই পথে নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকুক। সেটিই নাগরিকদের দাবি।