পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, এটি এখন গণতান্ত্রিক অধিকারের এক গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। ভোটার তালিকা কোনও সাধারণ নথি নয়; এটি নাগরিকের রাজনৈতিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি। সেই তালিকাকেই যদি অনিশ্চয়তা, বাদ পড়া আর আতঙ্কের উৎসে পরিণত করা হয়, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার পর আরও ৬২ লক্ষ নামকে ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর তালিকায় রাখা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন আশ্বাস দিয়েছিল, যথাযথ নথি পেশ করতে পারলে কেউই বঞ্চিত হবেন না। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও হস্তক্ষেপ করে জানিয়েছিল, আপিলের সুযোগ রেখে পরিপূরক তালিকা প্রকাশ করা হবে। কিন্তু বাস্তব ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র ২৪ দিনের মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি নাম যাচাই করা হয়েছে, আর বাকি প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ এখনও অনিশ্চয়তায় ঝুলছেন। এর মধ্যেই ১২.৮ লক্ষ আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— যাঁদের নাম বাদ যাচ্ছে, তাঁদের সামনে কি কোনও স্বচ্ছ ও কার্যকর আপিলের পথ খোলা আছে? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সেই পরিকাঠামো কার্যকর হয়েছে কি? বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ জানতেই পারছেন না কেন তাঁদের নাম বাদ পড়ল। কোনও স্পষ্ট কারণ, কোনও নির্দিষ্ট নথি-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁরা ভোটাধিকার হারানোর মুখে দাঁড়িয়ে। এই অনিশ্চয়তা ও অস্বচ্ছতাই আজ সবচেয়ে বড় আতঙ্কের উৎস।
গ্রামের প্রান্তিক মানুষ থেকে শহরের মধ্যবিত্ত, সব স্তরের নাগরিকের মধ্যে এক অদ্ভুত ভয় ছড়িয়ে পড়েছে। ভোটাধিকার, যা সংবিধান-প্রদত্ত মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার, সেটিই যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি কোথায় দাঁড়াবে?
এখন সময়ের চাপও অত্যন্ত গুরুতর। নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়ে গিয়েছে, এপ্রিলের শুরুতেই মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। একজন প্রার্থী হতে গেলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের ভোটার তালিকায় নাম থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ বহু সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম এখনও ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর জটিলতায় আটকে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাংবিধানিক সুযোগ থেকেও বহু মানুষ বঞ্চিত হতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিরপেক্ষতা নিয়েও বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। বিরোধী মহলের অভিযোগ— তিনি কেন্দ্রের শাসক দল ও সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এমন একটি প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন, যার ফলে তৃণমূল সমর্থক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় অংশের নাম বাদ পড়ছে। এসআইআরের নামে আসলে চলছে একটি চক্রান্ত। অভিযোগ কতটা সত্য, তা নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের আচরণ যে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। সেই বিশ্বাসযোগ্যতাই যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণ নয়, এটি একটি বিশ্বাসের প্রক্রিয়া। মানুষ বিশ্বাস করে যে তাদের ভোট গণনা হবে, তাদের মতামত প্রতিফলিত হবে। সেই বিশ্বাস যদি নষ্ট হয়, তবে গণতন্ত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিণত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ কী হতে পারে? প্রথমত, এসআইআর প্রক্রিয়াটি অবিলম্বে স্থগিত রেখে আগের বৈধ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। দ্বিতীয়ত, যাঁদের নাম বাদ পড়েছে বা ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এ রয়েছে, তাঁদের জন্য দ্রুত স্বচ্ছ এবং সহজ পদ্ধতিতে আপিলের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি বাদ পড়া নামের ক্ষেত্রে স্পষ্ট কারণ জানানো বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে নাগরিক বুঝতে পারেন, কোথায় সমস্যা হয়েছে এবং কীভাবে তা সংশোধন করা সম্ভব।
সবশেষে, মনে রাখতে হবে— ভোটাধিকার কোনও দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। এই অধিকারকে যদি প্রশাসনিক জটিলতা, অস্বচ্ছতা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণে খর্ব করা হয়, তবে তা শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।