‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক নয়

প্রতীকী চিত্র

ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে দেশপ্রেম, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ— এই তিনের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা একটি দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ২৮ জানুয়ারির নির্দেশিকা— যেখানে ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গান হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণভাবে গাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল— তা বাধ্যতামূলক নয়, কেবলমাত্র একটি পরামর্শমূলক নির্দেশ— এই মর্মে আদালতের অবস্থান গণতান্ত্রিক চেতনাকে পুনরায় স্পষ্ট করেছে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, এই নির্দেশিকায় কোথাও শাস্তির বিধান বা আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ, ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বা না-গাওয়া— এটি নাগরিকের ব্যক্তিগত পছন্দ ও বিবেকের বিষয়। এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভারতের সংবিধান ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিবেকের স্বাধীনতা— এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের গণতন্ত্র। দেশপ্রেম একটি গভীর ব্যক্তিগত অনুভূতি, এটি রাষ্ট্রের নির্দেশে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আদালতের এই বক্তব্য সেই মৌলিক সত্যকেই পুনরায় তুলে ধরেছে।


আদালতে আবেদনকারীর পক্ষ থেকে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। যে, এই নির্দেশিকাটি সামাজিকভাবে একধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে— তা একেবারেই অমূলক নয়। বাস্তবে, বহু ক্ষেত্রেই আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সামাজিক চাপ ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি অনুষ্ঠানে, যেখানে ‘প্রোটোকল’ মানার এক অঘোষিত চাপ থাকে, সেখানে এই ধরনের নির্দেশিকা ভিন্নমত বা ভিন্ন আচরণের জন্য মানুষকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলতে পারে।

তবে আদালত এই আশঙ্কাকে ‘অস্পষ্ট’ বলে অভিহিত করে আবেদনটি খারিজ করেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিকও তুলে ধরেছে— যদি ভবিষ্যতে এই নির্দেশিকার কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হন, তবে আদালতের দ্বার খোলা থাকবে। অর্থাৎ, আদালত একদিকে যেমন নির্দেশিকাটিকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেনি, তেমনি নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাও নিশ্চিত করেছে।

এই প্রসঙ্গে ‘জাতীয় সঙ্গীত’ এবং ‘জাতীয় গান’-এর মধ্যে পার্থক্যটিও স্মরণযোগ্য। ‘জনগণমন’ জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫১(ক)-এ- এর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনকে নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গান হলেও, তার ক্ষেত্রে এই ধরনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। এই ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক পার্থক্যকে অগ্রাহ্য করা উচিত নয়।

এই রায় আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে— দেশপ্রেমের প্রকৃত রূপ কী? দেশপ্রেম কি কেবল গান গাওয়া বা নির্দিষ্ট আচরণে সীমাবদ্ধ, নাকি এটি নাগরিক দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের মধ্যে নিহিত? বাস্তবে, একজন নাগরিকের দেশপ্রেম তার দৈনন্দিন আচরণে, আইন মেনে চলায়, অন্যের অধিকারকে সম্মান করার মধ্যেই বেশি প্রতিফলিত হয়।

অতএব, ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া ঐচ্ছিক— এই ঘোষণা কেবল একটি আইনি ব্যাখ্যা নয়, এটি আমাদের গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের অনুভূতিকে সম্মান করে, তবেই প্রকৃত দেশপ্রেম বিকশিত হতে পারে। জোর করে নয়, বরং স্বাধীনতার মধ্য দিয়েই দেশপ্রেমের সত্যিকারের বিকাশ সম্ভব।