ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ইতিহাসে জল কখনও নিছক জল ছিল না। সীমান্ত, কাশ্মীর, সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে সিন্ধু নদের জলও বারবার জড়িয়ে পড়েছে। ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু জলচুক্তি দুই দেশের দীর্ঘ বৈরিতার মধ্যেও ছয় দশকের বেশি সময় টিকে ছিল। তিনটি যুদ্ধ, অসংখ্য সীমান্ত সংঘাত এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামার পরেও চুক্তিটি কার্যকর থাকার ঘটনাটি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিরল। কিন্তু এখন সেই চুক্তিই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের নতুন সংঘাতের কেন্দ্রে।
সম্প্রতি হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত বা পার্মানেন্ট কোর্ট অফ আর্বিট্রেশন-এর রায়ের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আদালত বলেছে, ভারত একতরফাভাবে সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখতে পারে না এবং চুক্তিটি কার্যকর রয়েছে। পাকিস্তান স্বভাবতই এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে এবং ভারতের কাছে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু ভারত সেই রায় মানতে অস্বীকার করেছে। দিল্লির বক্তব্য স্পষ্ট— যে সালিশি প্রক্রিয়াকে ভারত স্বীকৃতিই দেয়নি, তার রায় ভারতের উপর কার্যকর হতে পারে না। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের মতে, সংশ্লিষ্ট সালিশি কাঠামোই অবৈধভাবে গঠিত এবং সিন্ধু জলচুক্তি ‘স্থগিত’ রাখার ভারতের সিদ্ধান্ত
বহাল রয়েছে।
অতএব, সমস্যাটি এখন শুধু জলবণ্টনের নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ— সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে।
এই অবস্থার শিকড় অবশ্যই ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের পহেলগাম হত্যাকাণ্ডে। কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্তপারের সন্ত্রাসে মদত দেওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো করে। পরদিন ভারত সিন্ধু জলচুক্তি ‘স্থগিত’ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। দিল্লির যুক্তি ছিল, যে পরিস্থিতিতে চুক্তিটি হয়েছিল, তা আমূল বদলে গিয়েছে। যত দিন না পাকিস্তান সীমান্তপারের সন্ত্রাসে সমর্থন সম্পূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে বন্ধ করছে, তত দিন চুক্তি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না।
এরপর আসে ‘অপারেশন সিঁদুর’। পহেলগামের জঙ্গি হামলার জবাবে ভারত পাকিস্তান ও
পাক-অধিকৃত অঞ্চলে জঙ্গি পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। সেই অভিযান দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। যুদ্ধের সম্ভাবনা, পাল্টা হামলা এবং কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে জলচুক্তিও আর নিছক একটি প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক বিষয় থাকেনি; তা হয়ে ওঠে ভারতের নিরাপত্তা-নীতির বৃহত্তর অংশ।
ভারতের অবস্থানের পেছনে তাই একটি রাজনৈতিক যুক্তি রয়েছে— একদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের দাবি করা যাবে না, অন্যদিকে সন্ত্রাসের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে পুরনো চুক্তিও আগের মতো চলবে না। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে, সন্ত্রাসের জবাব কি নদীর জল দিয়ে দেওয়া যায়?
ভারতের নিরাপত্তার উদ্বেগকে অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। পহেলগামের মতো বর্বর হামলার পরে রাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। ‘অপারেশন সিঁদুর’ও সেই বৃহত্তর নিরাপত্তা-বার্তারই অংশ ছিল। কিন্তু জল একটি ভিন্ন বিষয়। নদী কোনও সীমান্ত মানে না, আর নদীর জল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার উপর।
পাকিস্তানের জন্য সিন্ধু নদী ব্যবস্থা জীবনরেখার মতো। দেশটির কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা এই জলসম্পদের উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গেও এই নদীগুলির সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ দুই দেশই এই জলব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
সেই কারণেই জলকে রাজনৈতিক বা সামরিক চাপের হাতিয়ারে পরিণত করার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত দু’দেশের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে। আজ জল নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হল, কাল অন্য কোনও বিষয়ে পাল্টা চাপ আসতে পারে। এতে একটি স্থায়ী সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হবে, যার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভারতকে পুরনো চুক্তির সব সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে চুপ করে থাকতে হবে। ১৯৬০ সালের চুক্তির সময়কার বাস্তবতা আর ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষির পরিবর্তিত চাহিদা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন এবং হিমবাহের পরিবর্তন— সবকিছুই নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। ভারত তার ন্যায্য জলব্যবহারের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারে। চুক্তির কাঠামো আধুনিক করার দাবিও অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সেই আলোচনা হওয়া উচিত আলোচনার টেবিলে, ক্ষেপণাস্ত্রের ছায়ায় নয়।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ‘গঠনমূলক সংলাপ’-এর আহ্বানও তাই গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা দরকার। শুধু আন্তর্জাতিক আদালতের রায় দেখিয়ে ভারতকে চাপে ফেলার চেষ্টা করলে হবে না। একই সঙ্গে পাকিস্তানকেও বুঝতে হবে, সন্ত্রাসের প্রশ্নটি এড়িয়ে কেবল জলচুক্তির পুরনো কাঠামো ফিরিয়ে আনার দাবি ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
দুই দেশের সামনে তাই কঠিন হলেও একটি বাস্তবসম্মত পথ রয়েছে। প্রথমে সন্ত্রাস ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ, তার পাশাপাশি জলসম্পর্কিত প্রযুক্তিগত আলোচনা। প্রয়োজনে পুরনো চুক্তির দুর্বলতা সংশোধন করে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার
ভূমিকা নিয়েও দুই দেশকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
হেগের রায় হয়তো আইনি বিতর্ককে আরও বাড়াবে, কিন্তু কোনও আদালতের রায়ই ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবিশ্বাসের অবসান ঘটাতে পারবে না। সেই কাজ করতে হবে দুই দেশকেই।
আর ভারত বরাবরই জোর দিয়েছে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার উপর।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং শান্তির জন্য সংলাপ— এই দুই নীতিকে পরস্পরের বিরোধী ভাবার কোনও কারণ নেই। ভারতের নিরাপত্তা অটুট রেখেই জল নিয়ে ন্যায্যতা ও মানবিকতার পথ খোঁজা সম্ভব। কারণ সিন্ধু শুধু একটি নদী নয়, তার জল বহু মানুষের জীবনধারণের অবলম্বন।
অতএব আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, কে হেগে জিতল বা কে হারল, তা নয়। জরুরি প্রশ্ন হল— সিন্ধুর জল কি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের আর একটি অস্ত্র হবে, নাকি একদিন সেই জলই দুই দেশের মধ্যে সংলাপের নতুন সেতু তৈরি করবে?
সিন্ধুর জল হোক ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংলাপের নতুন সেতু
PIC- GROK