কাজল চট্টোপাধ্যায়
‘গোমাতা’ বা ‘লাভ জিহাদ’-এর ধুয়ো তুলে নিরীহ নিষ্পাপ ভারতীয় মুসলমানদের গণপ্রহার বা অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে হত্যার বিরুদ্ধে বা তাদের খাদ্য-পোশাক-প্রার্থনার অধিকারের উপর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যদি কোনও ইসলামিক রাষ্ট্র নিন্দাসূচক মন্তব্য করার সাহস প্রদর্শন করে, তখন জাতীয়তাবাদীরা তাদের ভর্ৎসনা করে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর অপরাধে৷
কিন্তু পাকিস্তান বা বাংলাদেশে হিন্দুদের বা মন্দিরের উপর আক্রমণের অভিযোগ এলেই তৎক্ষণাৎ সে দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে আদৌ কোনও সমস্যা নেই, তাই না!
বাংলাদেশের অশান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই সে দেশের সরকারের উপর ছেড়ে দিয়ে ভারতের স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদীগণ কি সর্বপ্রথমে নিজেদের উঠোন পরিষ্কারে অনুগ্রহ করে মনোনিবেশ করবেন!
এক বিদেশি রাষ্ট্র থেকে অনুপ্রবেশ করা অপশক্তির সৌজন্যে পহলগামে ‘হিন্দু’ পর্যটকদের হত্যাকে যেভাবে নৃশংসতার সঙ্গে অপব্যবহার করা হয়েছিল দেশ জুড়ে ইসলাম বা কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত ভারতীয় নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার জন্য, অনুরূপভাবেই এখন বাংলাদেশের এই তাণ্ডবকে (যেখানে সেকুলার মুসলমান, যুক্তিবাদী বুদ্ধিজীবী থেকে গণমাধ্যমও হিংসার শিকার হয়) কট্টর বাঙালি-বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নির্লজ্জভাবে মূলধন করবে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য, যাতে ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পিছন দরজা দিয়ে জয় করে অবশেষে ‘সুনার বঙ্গাল’-এর ক্ষমতা দখল করা যায়৷ ট্র্যাজেডি, হিংসা এবং হত্যাকেও তুচ্ছ নির্বাচনী স্বার্থে ব্যবহার করার কী অসভ্য বর্বর সাম্প্রদায়িক নগ্ন প্রচেষ্টা!
বাংলা সংস্কৃতির উপর আক্রমণ নিয়ে যাঁরা এত উদ্বিগ্ন, তাঁরা কি অনুগ্রহ করে ব্যাখ্যা করবেন যে, কেন্দ্র-নিয়ন্ত্রিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলা ভাষাকে কেন ‘বাংলাদেশি’ আখ্যায় ভূষিত করেছে এবং পরবর্তী সময়ে এক গেরুয়াকর্তা বাংলা ভাষার অস্তিত্ব পর্যন্ত অস্বীকার করেছে৷ কেন এক ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশনাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা প্রদান করেছে এবং সে শিবিরের আর এক অংশ কবিগুরুকে ব্রিটিশদের ‘দালাল’ বলে চলেছে৷
এমনকি রাজা রামমোহন রায়ও নাকি একজন ‘ব্রিটিশ এজেন্ট’ ছিলেন আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার বর্বর ঘটনা সম্পর্কে তো যত কম বলা যায় ততই মঙ্গল৷
আর হিন্দু বাঙালিদের প্রতি গেরুয়া বাহিনীর উদ্বেগও সত্যিই কিংবদন্তিতুল্য৷ তা (মুসলিম ভাইদের সঙ্গে) বাঙালি হিন্দুরা ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যগুলিতে কেন পাশবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, জেলে আটক হচ্ছেন, যার ফলে জীবিকা ত্যাগ করে প্রাণ বাঁচাতে তাঁরা বাংলায় পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন— সে বিষয়ে আমাদের কি কিঞ্চিৎ আলোকপ্রাপ্ত করা হবে ওই বাঙালি হিন্দুদের প্রতি সহানুভূতিশীল গেরুয়াবাবুরা কি অনুগ্রহ করে উত্তর দেবেন কেন ‘ডবল ইঞ্জিন’ ওড়িশার মালকানগিরি জেলায় ১৬০-টিরও বেশি বাঙালির বাড়ি ঠান্ডা মাথায় পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হল? আর তা সত্ত্বেও গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে একটিও প্রতিবাদসূচক শব্দ শোনা গেল না৷ ওড়িশার সেই হতভাগ্য মানুষরা বুঝি বাঙালি হিন্দু ছিলেন না, যারা কিনা আবার দেশভাগজনিত হিংসার কারণে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে মালকানগিরিতে পুনর্বাসিত হন৷ সত্যিই বাঙালি হিন্দুদের প্রতি কী গভীর ‘ভালোবাসা’ জাতীয়তাবাদী গেরুয়া শিবিরের৷
বাংলাদেশের হিংসাত্মক ঘটনাবলীকে পুঁজি করে যে ভণ্ডরা বাঙালি হিন্দুদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু নির্গত করে চলেছে, তাদের অবশ্যই উত্তর দিতে হবে কেন তারা সম্পূর্ণ নীরব ছিল যখন ‘ডবল ইঞ্জিন’ উত্তর প্রদেশের এক সিং গুণ্ডা কৃষ্ণনগরের বাড়িতে ঢুকে এক বাঙালি হিন্দু মেয়েকে গুলি করে হত্যা করলো৷ আর আরজি কর হাসপাতালে যে অসভ্য বর্বর পিশাচ সঞ্জয় রাই আমাদের বাঙালি হিন্দু মেয়েটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করলো, বহিরাগত সম্প্রদায়ের সেই কুলাঙ্গারটার ধম্মোটা যেন কী?
হ্যাঁ, অপরাধীরা অপরাধী, তাদের কোনও ধর্ম দেশ হয় না৷ তাই যারা বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মৌলবাদীদের হিংসাত্মক কার্যকলাপকে মূলধন করে ইসলামকেই কলঙ্কিত করার হীন প্রচেষ্টা করছে স্রেফ নির্বাচনী স্বার্থ চরিতার্থ করতে, সেই বর্বর সাম্প্রদায়িকরা হল সভ্যতা তথা মানবতার শত্রু।
অন্তিমে যেহেতু ‘Charity must begin at home’, তাই বাংলাদেশের একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলিয়ে গেরুয়া বাহিনীকে অবশ্যই জবাব দিতে হবে যে, মহম্মদ আখলাক, জুনায়েদ, পেহলু খান, আসগর আলী, তাবরেজ আনসারি, আফরাজুল খান, সাবির মালিক-সহ অসংখ্য ভারতীয় নাগরিককে গোমাংস ভক্ষণ-পরিবহন, গবাদি পশু পাচার বা সেই কাল্পনিক ‘লাভ জিহাদে’ জড়িত থাকার অভিযোগে ভয়াবহ হত্যালীলার শিকার হতে হল কেন?
বাংলাদেশের বর্তমান নৈরাজ্যকে যারা সে দেশে ‘বাঙালি হিন্দু এবং তাদের সংস্কৃতির উপর আঘাত’ রূপে প্রচার করে সাম্প্রদায়িক খেলায় নিমজ্জিত হয়েছে তাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, বাংলা সংস্কৃতি কেবলমাত্র হিন্দুদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়৷ বরং বাংলাদেশের মুসলমানরাও বাংলা সংস্কৃতিরই অংশ৷ সর্বোপরি, এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির জন্মই হয়েছে বাংলা সংস্কৃতি ও ভাষার উপর ভিত্তি করে৷
তাই বিস্ময়ের কোনও অবকাশ নেই যে, ছায়ানটের (ঢাকার যে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি আক্রমণের শিকার হল) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম যথাক্রমে সরোয়ার আলী এবং লাইসা আহমেদ লিসা৷ এবং এই হামলার পর, ছায়ানটের ছাত্রছাত্রী, অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষ মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ঢাকার রাস্তায় নেমে আসেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, মুকুন্দ দাস এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান কন্ঠে নিয়ে যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান’৷
এই হল বাংলা সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ রূপ যার কোনও হিন্দু মুসলিম ক্রিস্টান বৌদ্ধ হয় না৷ ‘নূতন ভারতের’ সেই বাংলা-বিরোধী গোষ্ঠী, যাঁরা বাংলাকে ‘বাংলাদেশি’ ভাষা বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন, বাংলাতে কথা বললে ‘ডবল ইঞ্জিনে’ অত্যাচার করে এবং ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়াকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মরূপে ভূষিত করে, তারা কি বাংলাদেশের মৌলবাদীদের বর্বরতাকে মূলধন করে বাঙালি হিন্দু ও বাংলা সংস্কৃতির জন্য কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ অনুগ্রহ করে বন্ধ করবে!
তাই বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য প্রাণ কেঁদে ওঠা বাহিনী সর্বাগ্রে ওড়িশা-সহ ‘নূতন ভারতের ডবল ইঞ্জিন’ পরিচালিত রাজ্যগুলিতে বরং আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করুক ও দেশ স্বাধীনতার লক্ষ্যে সর্বাধিক প্রাণ-রক্ত-জমি বিসর্জন দেওয়া বাঙালি জাতিকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অত্যাচারের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করুক৷
মালকানগিরির অত্যাচারিত বাঙালিরাও কিন্তু দিনের শেষে হিন্দু ধর্মেরই অন্তর্ভুক্ত৷ তা সত্ত্বেও হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বনিযুক্ত অভিবাবকদের শ্রীমুখে কুলুপ কেন? আদিবাসীরা মুসলিম নয় বলে কি? ধর্মকে কেন্দ্র করে বিষাক্ত খেলাটা ঠিক জমবে না, তাই না৷
হ্যাঁ, দিনের শেষে অন্তিম সত্য এই যে, ‘হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান’ শিবিরের চোখে দুর্বল ‘আমিষ’ প্যাটি বিক্রেতা শেখ রিয়াজুলরা ও দেশভাগের আগুনে দগ্ধ হয়ে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মালকানগিরির অসহায় মহানন্দ বৈরাগীরা সবাই কিন্তু একই নৌকোর যাত্রী— কেবলমাত্র বহু-ঘৃণিত ‘বঙ্গালি’ যারা ‘বাংলাদেশি’ ভাষাতে কথা বলে আর যাদের ওই ‘ব্রিটিশদের অনুচর’ কবির ‘আমার সোনার বাংলা’ ‘দেশদ্রোহিতার’ নামান্তর৷ আর এরপরও তারা আশা করে যে, বহু-ঘৃণিত অত্যাচারিত বঞ্চিত বাঙালি দলে দলে এই নির্ভেজাল বাংলা-বাঙালি-পশ্চিমবঙ্গ বিদ্বেষী শিবিরকে দুই হাতে ভোট দিয়ে আশীর্বাদ করবে!