বাংলা কথাসাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবির্ভাব শুধু জনপ্রিয় এক কথাশিল্পীর আবির্ভাব নয়, তা ছিল বাংলা সমাজের অন্তঃপুরে একটি নতুন জানালা খুলে যাওয়ার ঘটনা। সেই জানালা দিয়ে দেখা গেল এমন নারীকে, যাকে এতদিন সমাজ প্রধানত দেখেছে স্ত্রী, মা, বিধবা, কন্যা, সতী কিংবা ‘চরিত্রহীন’ হিসেবে— কিন্তু ‘মানুষ’ হিসেবে নয়। শরৎচন্দ্র সেই ‘মানুষ’টিকেই আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। তাই তাঁর নারীচরিত্রের গুরুত্ব শুধু তাদের আবেগময় জীবনে নয়; তাদের ভিতর দিয়ে তিনি তাঁর সময়ের সমাজ, নৈতিকতা, ধর্মীয় সংস্কার এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোকেও প্রশ্ন করেছেন।
শরৎচন্দ্রের নারীভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক উপলব্ধি— নারীকে বিচার করার সামাজিক মাপকাঠি এবং পুরুষকে বিচার করার মাপকাঠি এক নয়। পুরুষের ভুলকে সমাজ অনেক সময় অভিজ্ঞতা, দুর্বলতা কিংবা পরিস্থিতির ফল বলে মেনে নেয়; অথচ নারীর সামান্য বিচ্যুতিকেও তার সমগ্র অস্তিত্বের বিরুদ্ধে রায় হিসেবে ব্যবহার করে। তাঁর ‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধের ভাবনার সঙ্গে তাঁর কথাসাহিত্যের নারীচরিত্রগুলিকে পাশাপাশি রাখলে এই দ্বৈত নৈতিকতার বিরুদ্ধে তাঁর আপত্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর প্রশ্ন যেন এই— যে সমাজ পুরুষের জন্য ক্ষমার দরজা খোলা রাখে, সেই সমাজ নারীর জন্য এত কঠোর কেন?
এই প্রশ্নের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পরূপ পাওয়া যায় ‘চরিত্রহীন’-এ। উপন্যাসটির নামই আসলে একটি সামাজিক রায়। কিন্তু শরৎচন্দ্র সেই রায়কে গ্রহণ করেন না, বরং পাঠকের সামনে প্রশ্নটি ফিরিয়ে দেন— কার চরিত্রহীনতা? কিরণময়ীর? সাবিত্রীর? নাকি সেই সমাজের, যে মানুষের জটিল মনকে একটি মাত্র নৈতিক শব্দে বন্দী করতে চায়?
কিরণময়ী শরৎচন্দ্রের অন্যতম জটিল নারীচরিত্র। সে শুধু প্রেমিকা নয়, শুধু স্ত্রীও নয়; সে বুদ্ধিমান, আত্মসচেতন, আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন একজন নারী। তার ভুল আছে, আবেগের অস্থিরতা আছে, কিন্তু সেই ভুলকে তিনি একমাত্রিক নৈতিক অপরাধে পরিণত করেননি। কিরণময়ীর বিপর্যয়ের ভিতরে তাই ব্যক্তিগত ভুলের পাশাপাশি সামাজিক শাস্তিরও ইতিহাস রয়েছে। অন্যদিকে সাবিত্রী নিজের ভালোবাসাকে স্বীকার করেও সামাজিক বিধির সামনে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। তার ট্র্যাজেডি এই যে, সে নিজের হৃদয়ের সত্যকে জানে, কিন্তু সেই সত্যকে সামাজিক জীবনের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
এইখানেই শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্রের একটি গভীর দ্বন্দ্ব ধরা পড়ে। তাঁর নারী হৃদয়ের স্বাধীনতা চায়, কিন্তু সমাজ তার দেহ, বিবাহ, যৌনতা এবং সম্পর্কের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। ফলে নারীর প্রেমও ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে সামাজিক বিচারের বিষয়। ‘গৃহদাহ’-এর অচলার জীবনেও এই সংঘাত তীব্র। প্রেম, বিবাহ, কর্তব্য ও সামাজিক নৈতিকতার মধ্যে সে যে দ্বন্দ্বে পড়ে, তা কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত দুর্বলতার কাহিনি নয়— এটি এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে বিবাহ নারীর ব্যক্তিসত্তাকে প্রায় সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিতে চায়।
শরৎচন্দ্রের নারীকে বুঝতে গেলে তাই ‘সতীত্ব’ এবং ‘নারীত্ব’-এর পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত সমাজ নারীর মূল্য নির্ধারণ করেছে সতীত্ব, সেবাপরায়ণতা, সহিষ্ণুতা এবং স্বামীনিষ্ঠার মাধ্যমে। শরৎচন্দ্র সেখানে মানুষের বৃহত্তর পরিচয়টিকে সামনে আনেন। তাঁর কাছে একজন নারী কেবল কারও স্ত্রী নয়; সে প্রেম করতে পারে, ভুল করতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ তার মানবিকতার মূল্য তার বৈবাহিক পরিচয়ের চেয়ে বড়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির অসাধারণ প্রকাশ ‘শেষ প্রশ্ন’-এর কমল চরিত্রে। কমল প্রচলিত নারী-আদর্শের ভিতর নিজেকে আবদ্ধ রাখতে রাজি নয়। বিবাহ, প্রেম, সামাজিক স্বীকৃতি— সবকিছুকেই সে যুক্তির আলোয় পরীক্ষা করে। কমলের বক্তব্যে শরৎচন্দ্র যেন নিজের সময়ের পাঠককেই প্রশ্ন করেন— যে সম্পর্কের সত্য হৃদয়ে নেই, কেবল সামাজিক অনুষ্ঠানের স্বীকৃতি দিয়ে তাকে সত্য করে তোলা যায় কি? কমল তাই শুধু একটি চরিত্র নয়, শরৎচন্দ্রের নারীভাবনার সবচেয়ে আধুনিক প্রশ্নগুলির একটি জীবন্ত রূপ।
অন্যদিকে তাঁর সমস্ত নারীই বিদ্রোহী নয়। বরং এখানেই তাঁর শিল্পের সূক্ষ্মতা। ‘মেজদিদি’র হেমাঙ্গিনী সমাজ ভাঙতে চায় না, কিন্তু অন্যায়ের সামনে নীরব থাকতেও পারে না। কেষ্টার প্রতি তার মমতা ক্রমে প্রতিবাদে পরিণত হয়। সে বুঝতে পারে, সংসারের শান্তি যদি একজন অসহায় শিশুর উপর অত্যাচারের বিনিময়ে কিনতে হয়, তবে সেই শান্তি আসলে অন্যায়ের আরেক নাম। ফলে তার মাতৃত্ব রক্তের সম্পর্ক অতিক্রম করে মানবিক দায়িত্বে পরিণত হয়।
‘বড়দিদি’র মাধবী, ‘নিষ্কৃতি’র শৈলজা কিংবা ‘বিন্দুর ছেলে’র বিন্দুবাসিনীর মতো চরিত্রগুলির ক্ষেত্রেও নারীসত্তার অন্য এক দিক প্রকাশিত হয়— স্নেহ, আত্মত্যাগ এবং সম্পর্ককে ধরে রাখার ক্ষমতা। কিন্তু শরৎচন্দ্রের কৃতিত্ব এই যে, তিনি এই গুণগুলিকে কেবল নারীর ‘স্বাভাবিক কর্তব্য’ হিসেবে দেখাননি; তাঁর রচনায় এগুলি নৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
শরৎচন্দ্রের সমাজদৃষ্টির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। তাঁর বহু নারী দরিদ্র, অসহায় এবং সম্পত্তিহীন। ফলে তাদের জীবনের উপর নিজেদের সিদ্ধান্তের অধিকারও সীমিত। ‘অরক্ষণীয়া’র জ্ঞানদার মতো কিশোরীর জীবন দেখায়, অর্থনৈতিক দুর্বলতা কীভাবে নারীর শরীর ও ভবিষ্যৎকে অন্যের দর-কষাকষির বস্তুতে পরিণত করে। সেখানে বিবাহ আর ভালোবাসার সম্পর্ক নয়, তা হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক লেনদেনের এক
নির্মম ব্যবস্থা।
‘অনুপমার প্রেম’-এর মতো রচনাতেও দেখা যায়, সম্পদ থাকলেই নারী নিরাপদ নয়। পারিবারিক ক্ষমতার কাঠামোর ভিতরে তার নিজস্ব ইচ্ছা কত সহজে অগ্রাহ্য হতে পারে, শরৎচন্দ্র তা দেখিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর নারীসমস্যা কেবল পুরুষ বনাম নারী নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রেণি, সম্পত্তি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং পারিবারিক ক্ষমতা।
পতিতা নারীদের ক্ষেত্রেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। চন্দ্রমুখী বা রাজলক্ষ্মীর মতো চরিত্রের মাধ্যমে শরৎচন্দ্র প্রশ্ন তুলেছেন— একজন নারীর পেশা কি তার সমগ্র মানবিক পরিচয়কে মুছে দিতে পারে? সমাজ তাদের দেহকে দেখেছে, শরৎচন্দ্র দেখেছেন তাদের হৃদয়। তাদের প্রেম, আত্মত্যাগ, বিশ্বস্ততা ও মমতার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন, সামাজিক পরিচয় কখনও মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।
তবে শরৎচন্দ্রকে আধুনিক অর্থে সম্পূর্ণ নারীমুক্তির তাত্ত্বিক লেখক ভাবলে তাঁর সাহিত্যকে সরলীকরণ করা হবে। তাঁর অনেক নারী শেষ পর্যন্ত প্রচলিত নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করতে পারে না। কেউ আত্মত্যাগে ফিরে যায়, কেউ সামাজিক স্বীকৃতির অভাবে ভেঙে পড়ে, কেউ বিদ্রোহ করেও একাকিত্বের দিকে চলে যায়। এই সীমাবদ্ধতা আসলে শরৎচন্দ্রের সময়ের সীমাবদ্ধতাও। তিনি সমাজের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু সব প্রশ্নের সামাজিক সমাধান তাঁর হাতে ছিল না। তাঁর শক্তি সমাধানে নয়, প্রশ্নটিকে মানুষের হৃদয়ের ভিতর স্থাপন করার মধ্যে।
এই কারণেই শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্র আজও পুরনো হয়ে যায়নি। কারণ তাঁদের সমস্যা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের সমস্যা নয়। প্রেম ও সামাজিক স্বীকৃতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারিবারিক কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিগত সত্য ও সামাজিক নৈতিকতা— এই দ্বন্দ্বগুলি মানুষের জীবন থেকে এখনও মুছে যায়নি।
শরৎচন্দ্রের নারী তাই কেবল অশ্রুসিক্ত নয়, অন্তর্গত শক্তিতেও দীপ্ত। কখনও সে মাধবীর মতো নীরব, কখনও কিরণময়ীর মতো প্রশ্নমুখর, কখনও কমলের মতো যুক্তিবাদী, কখনও হেমাঙ্গিনীর মতো প্রতিবাদী, কখনও চন্দ্রমুখীর মতো আত্মবিসর্জিত, আবার কখনও জ্ঞানদার মতো নির্মম সামাজিক বাস্তবতার শিকার। কিন্তু প্রত্যেকের ভিতরেই একটি স্বতন্ত্র মানুষ আছে।
এই ‘মানুষ’-টিকেই শরৎচন্দ্র আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর নারীকে তাই কেবল করুণার চোখে দেখলে তাঁর শিল্পের অর্ধেকই দেখা হয়; নারীকে বুঝতে হলে দেখতে হবে তার আত্মমর্যাদা, আকাঙ্ক্ষা, প্রতিবাদ, ভালোবাসা এবং নীরব প্রতিরোধকেও। শরৎচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ নারীচরিত্রগুলি সেই অর্থে নিছক সাহিত্যিক চরিত্র নয়— তারা বাঙালি সমাজের বিবেকের প্রতিফলন।
সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, নারীর জীবনও অনেক দূর এগিয়েছে। তবু শরৎচন্দ্রের মাধবী, সাবিত্রী, কিরণময়ী, রাজলক্ষ্মী, চন্দ্রমুখী, অচলা, কমল, জ্ঞানদা কিংবা হেমাঙ্গিনীকে পড়লে মনে হয়— তারা আমাদের থেকে খুব দূরের কেউ নয়। তারা আজও আমাদের ঘরের অন্দরমহলে, সম্পর্কের টানাপোড়েনে, সামাজিক বিচারবোধে এবং নারীর নীরব প্রশ্নে বেঁচে আছে। শরৎচন্দ্রের জন্মের দেড়শো বছরে দাঁড়িয়ে তাই মনে হয়, এইখানেই শরৎচন্দ্রের নারীচিত্রণের চিরকালীন সার্থকতা— তিনি নারীর গল্প লেখেননি শুধু, তিনি নারীর ভিতর দিয়ে মানুষকে লিখেছেন।
শুধু নারীর গল্প লেখেননি, তিনি নারীর ভিতর দিয়ে মানুষকে লিখেছেন
ai