শঙ্করাচার্য ও রাষ্ট্রের সহিষ্ণুতা

প্রয়াগরাজের সঙ্গম শুধু তিন নদীর মিলনস্থল নয়— এটি ভারতের ধর্মীয় ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও বহুত্বের এক প্রতীক। সেই সঙ্গমেই সম্প্রতি যে ঘটনাপ্রবাহ দেখা গেল, তা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পুলিশের অতি-উৎসাহের গল্প নয়; বরং তা ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে ভিন্নমত, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
জ্যোতিষপীঠের শঙ্করাচার্য স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতীর অভিযোগ গুরুতর। তাঁর দাবি, সঙ্গমে স্নান করতে যাওয়ার পথে তাঁর শিষ্যদের পুলিশি বাধা, ধাক্কাধাক্কি ও মারধরের শিকার হতে হয়েছে। সেই ঘটনার প্রতিবাদেই তিনি অনশন শুরু করেন। এর পরপরই যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন শঙ্করাচার্যকে একটি নোটিস পাঠিয়ে প্রশ্ন তোলে—তিনি কীভাবে ‘জ্যোতিষপীঠের শঙ্করাচার্য’ উপাধি ব্যবহার করছেন।’
এই নোটিসের সময় নির্বাচনই প্রশ্ন তুলছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পুলিশের আচরণ নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখন প্রশাসনের তরফে হঠাৎ শঙ্করাচার্যের ‘উপাধি’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া? নাকি এর আড়ালে রয়েছে ভিন্ন মতকে কোণঠাসা করার রাজনৈতিক ইঙ্গিত?
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন— হোক তা মন্দির-রাজনীতি, গোরক্ষা বা ধর্মকে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে মেলানোর প্রবণতা। তাঁর বক্তব্য অনেক সময়ই ক্ষমতাসীন রাজনীতির অস্বস্তির কারণ হয়েছে। কিন্তু সেই অস্বস্তি থেকেই যদি রাষ্ট্রযন্ত্র কোনও ধর্মীয় গুরুকে ‘বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তবে তা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক সংকেত।
প্রশ্নটি এখানে ব্যক্তিগত শঙ্করাচার্যের নয়। প্রশ্নটি নীতিগত। ভিন্ন মত পোষণ করলেই কি একজন ধর্মীয় গুরুকে ও তাঁর শিষ্যদের ধর্মাচরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায়?সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ সকল নাগরিককে ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার দেয়। সেই অধিকারের কোনও শর্ত নেই যে, ধর্মগুরু হতে গেলে সরকারপন্থী মতই পোষণ করতে হবে।
পুলিশ ও প্রশাসনের যুক্তি— ‘ভিড় নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘নিরাপত্তা’— এই দেশে নতুন নয়। কিন্তু সেই যুক্তি বারবার এমন পরিস্থিতিতেই সামনে আসে, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে মতাদর্শগত সংঘাত রয়েছে। কুম্ভ, মাঘ মেলা কিংবা অন্য যে কোনও বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ নির্বিঘ্নে স্নান করেন। সেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে আলাদা করে থামানো হলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
আরও উদ্বেগের বিষয় হল, এই ঘটনার পর রাজ্যের শাসকদলের একাংশের বক্তব্য। সামাজিক মাধ্যমে ও প্রকাশ্য মন্তব্যে শঙ্করাচার্যকে ‘রাজনৈতিক’, ‘বিরোধী এজেন্ডার মুখ’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর অর্থ কি এই যে, ধর্মীয় নেতৃত্বও এখন শাসকদলের অনুগত ও অনুগত-নন— এই দুই ভাগে বিভক্ত?
ভারতের ধর্মীয় ঐতিহ্য কখনও একরৈখিক ছিল না। শঙ্করাচার্যদের মধ্যেও মতভেদ ছিল, বিতর্ক ছিল, রাজসভার বিরুদ্ধেও কণ্ঠ উঠেছে। ইতিহাস সাক্ষী, ধর্মীয় নেতৃত্ব অনেক সময়ই রাষ্ট্রক্ষমতার সমালোচক হয়েছে। সেই সমালোচনাকে দমন করা হলে ধর্মের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়, আর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে অসহিষ্ণুতার পথে এগোয়।
আজ প্রশ্নটা তাই আরও বড়।
এটা কি কেবল একটি স্নানযাত্রার বাধা? নাকি এটি সেই প্রবণতার অংশ, যেখানে রাষ্ট্র নিজেকে ধর্মের অভিভাবক হিসেবে স্থাপন করতে চাইছে, আর ধর্মীয় কণ্ঠস্বরকে শাসনযোগ্য করে তুলতে চাইছে? গণতন্ত্রে ভিন্ন মত অপরাধ নয়। ধর্মীয় গুরুও নাগরিক। তাঁর মত পছন্দ না হলেই যদি রাষ্ট্রযন্ত্র নোটিস, বাধা ও পুলিশের লাঠি নিয়ে হাজির হয়, তবে আগামী দিনে সেই লাঠি কার দিকে যাবে— সে প্রশ্ন থেকেই যায়।সঙ্গম তো মিলনের প্রতীক। সেখানে বিভাজনের রাজনীতি ভারতীয় রাষ্ট্রের পক্ষেই শুভ নয়।