শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌনশিক্ষা, বদলাবে মানসিকতা?

Pic Source- AI

ভারতে যৌনশিক্ষা নিয়ে বহুদিনের এক অস্বস্তিকর নীরবতা ছিল। পরিবারে এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, স্কুলে তা প্রায় অনুপস্থিত থেকেছে, আর সমাজে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনাকে বহুক্ষেত্রেই অশোভন বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। বাস্তব সমস্যাগুলিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—এই নীরবতা আর কাম্য নয়। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে স্কুল-কলেজে ‘সমগ্র যৌনশিক্ষা’ চালুর সম্মতি জানানো নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।
এই উদ্যোগের পেছনে যে প্রেক্ষাপট রয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে গর্ভধারণের ঘটনা বৃদ্ধি, কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আইনের আওতায় এনে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা— এই সবই সমাজ ও আইনব্যবস্থার সামনে নতুন প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ‘পকসো’ আইনের উদ্দেশ্য শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সম্মতিপূর্ণ কিশোর প্রেমও অপরাধের রূপ পাচ্ছে। এই জটিলতার সমাধান কেবল আইনের কঠোরতা বাড়িয়ে নয়, বরং সচেতনতা ও শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভব— এই উপলব্ধিই যৌনশিক্ষা চালুর প্রস্তাবকে সামনে এনেছে।
যৌনশিক্ষা বলতে শুধু শারীরবৃত্তীয় তথ্য নয়; এটি একটি সমগ্র জীবনদক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ভালো ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য বোঝানো— এসব অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর ফলে তারা শুধু নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে না, বরং কোনও অস্বস্তিকর বা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, তাও শিখবে। শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল বিষয় মোকাবিলায় এই শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম।
কিশোর বয়সে এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও বাড়ে। এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দ্রুত ঘটে, নানা প্রশ্ন জাগে, কৌতূহল তৈরি হয়। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে তারা অনেক সময় ভুল ধারণা বা অবৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর নির্ভর করে। ইন্টারনেট বা বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য সবসময় নির্ভরযোগ্য হয় না। ফলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। স্কুলে বৈজ্ঞানিক, সংবেদনশীল এবং বয়সোপযোগী যৌনশিক্ষা থাকলে এই বিভ্রান্তি অনেকটাই কমবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র যে সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, যৌনশিক্ষা তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষা কেবল বইয়ের জ্ঞান নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুতি— এই ধারণাকে শক্তিশালী করে যৌনশিক্ষা। এতে কিশোর-কিশোরীরা নিজের শরীর, সম্পর্ক, সম্মতি, দায়িত্ববোধ— এসব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে। এর ফলে তারা আরও সচেতন, আত্মবিশ্বাসী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— অভিভাবক ও শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, বড়রাই এই বিষয় নিয়ে অস্বস্তিতে থাকেন, ফলে শিশুদের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান বা ভুলভাবে উত্তর দেন। যদি অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য আলাদা করে সচেতনতা সভা করা হয়, তবে তারা বিষয়টি বুঝতে পারবেন এবং শিশুদের সঠিকভাবে পথ দেখাতে সক্ষম হবেন। এতে পরিবার ও স্কুল— দুই ক্ষেত্রেই একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।
তবে এই উদ্যোগ সফল করতে কিছু বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি। প্রথমত, পাঠ্যক্রমটি হতে হবে বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল এবং বয়সভিত্তিক। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিষয়টি পড়ানোর জন্য শুধু জ্ঞান নয়, সংবেদনশীলতা ও দক্ষতাও প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সমাজের বিভিন্ন স্তরে এই বিষয়ে ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনও ভুল বোঝাবুঝি বা অযথা বিতর্ক তৈরি না হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌনশিক্ষা চালুর এই পদক্ষেপ কেবল একটি শিক্ষানীতি পরিবর্তন নয়; এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা। দীর্ঘদিনের ট্যাবু ভেঙে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখানোই এর মূল সাফল্য। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সচেতন, নিরাপদ এবং মানবিক করে তুলবে, যা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য
অত্যন্ত জরুরি।