ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভর ভারত

File Photo

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ কোনও দেশের উন্নয়নের সহায়ক মাত্র নয়, বরং তার অর্থনৈতিক শক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা নির্ধারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি গ্রহণ, নতুন উদ্ভাবনে সাহসী পদক্ষেপ এবং বিশ্বকে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ভারত যে এগিয়ে চলেছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে এই আত্মবিশ্বাসী ভারতেরই প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর মতে, ভারতকে শুধু অন্য দেশের আবিষ্কৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই চলবে না, বরং নিজেদের উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির গতিপথও নির্ধারণ করতে হবে।

সম্প্রতি নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে ‘এমার্জিং টেকনোলজি, সায়েন্স অ্যান্ড ইনোভেশন কনক্লেভ ২০২৬’-এর উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, একবিংশ শতাব্দীর ভারত আর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা দেশ হিসেবে পরিচিত থাকতে চায় না। বরং নিজস্ব মেধা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী শক্তির সাহায্যে বিশ্বের প্রথম সারিতে উঠে আসাই তার লক্ষ্য।

ভারতের এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। দেশীয় প্রযুক্তিতে কোভিড-১৯-এর টিকা তৈরি, প্রথম প্রচেষ্টাতেই মঙ্গল অভিযানে সাফল্য এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে সফল অবতরণ ভারতের বৈজ্ঞানিক দক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একসময় উন্নত দেশগুলির প্রযুক্তি ভারতে পৌঁছতে কয়েক বছর সময় লাগত। ভারত সেই প্রযুক্তি গ্রহণ করে সামান্য পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলেছে। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেরাই নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছেন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন।


বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। এই প্রযুক্তি দৈনন্দিন কাজ সহজ করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রী যথার্থভাবেই মনে করিয়ে দিয়েছেন, এআই যেন মানুষের চিন্তাশক্তিকে সীমাবদ্ধ না করে, বরং আরও উন্নত করে। প্রযুক্তির সাহায্যে সময় বাঁচিয়ে গবেষকেরা যাতে নতুন পরীক্ষা, জটিল সমস্যার সমাধান এবং অভিনব ধারণা যাচাই করার সুযোগ পান, সেটিই হওয়া উচিত বিজ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সাইবার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

পরমাণু শক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও ভারতের অগ্রগতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উন্নত ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য পূরণে পারমাণবিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তামিলনাড়ুর কালপাক্কমে দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টরের ক্রিটিক্যালিটি অর্জন ভারতের পারমাণবিক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অন্যদিকে, ভারতে তৈরি সেমিকন্ডাক্টর চিপের প্রথম চালান বিদেশে পৌঁছতে শুরু করা দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরছে।

ভারতের আর একটি বড় শক্তি হল, বৃহৎ জনসংখ্যার কাছে অল্প সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা। ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং দেশীয় ৫জি প্রযুক্তির সাফল্য তার উদাহরণ। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, যোগাযোগ ও প্রশাসনের মতো ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও সহজ করা সম্ভব। দেশীয় কাঁচামালের উপর নির্ভর করে ব্যাটারি সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ জ্বালানি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার পথও প্রশস্ত করতে পারে।

দেশের স্টার্ট-আপগুলির উদ্ভাবনী উদ্যোগও আশার আলো দেখাচ্ছে। মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য পরিধানযোগ্য ইইজি প্রযুক্তি, নিজস্ব বেতার ও উপগ্রহ যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ পুষ্টিপণ্য, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং ইস্পাতশিল্পের বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মতো ক্ষেত্রে তাদের কাজ প্রমাণ করছে যে গবেষণা এখন শুধু পরীক্ষাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

এই অগ্রগতিকে আরও শক্তিশালী করতে গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের জন্য এক লক্ষ কোটি টাকার তহবিলের সরকারি অঙ্গীকার এবং পরীক্ষাগারে তৈরি বাজার-উপযোগী প্রযুক্তিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অংশগ্রহণ বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।