সাম্প্রতিক সময়ে বোর্ড পরীক্ষাকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রশাসনিক ভুলের ঘটনা নয়, এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এক গভীর সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এ বছরের দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় অনস্ক্রিন মার্কিং পদ্ধতি চালু করার সিদ্ধান্তকে আধুনিকতার দিকে এক ধাপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এই ডিজিটাল অগ্রগতি বহু ছাত্রছাত্রীর জীবনে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ডেকে এনেছে।
নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষার্থীদের খাতা স্ক্যান করে ডিজিটালভাবে পরীক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়। তত্ত্বগতভাবে এটি স্বচ্ছতা বাড়ানোর কথা। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, অনেক ছাত্রছাত্রী অস্বাভাবিকভাবে কম নম্বর পেয়েছে। তারা যখন পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করে এবং নিজেদের খাতা দেখতে পায়, তখন চমকে ওঠে— কারণ সেই খাতা তাদের নিজের নয়! অর্থাৎ, অন্য কারও উত্তরপত্র তাদের নামে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
এই ধরনের ভুল কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি একেবারে মৌলিক স্তরের ব্যর্থতা। পরীক্ষার নম্বরই যেখানে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি, সেখানে এই ধরনের গাফিলতি ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎকে সরাসরি বিপন্ন করে। একদিকে কেউ নিজের প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কেউ হয়তো অযাচিত সুবিধা পাচ্ছে। এই দ্বিমুখী অন্যায় পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
বোর্ড অবশ্য ভুল স্বীকার করেছে এবং সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এতে কি ভরসা ফিরে আসে? একটি ভুল নম্বর, একটি মিসম্যাচ— এসব শুধুই সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন পরীক্ষার্থীর পরিশ্রম, স্বপ্ন এবং মানসিক স্থিতি। ভুল ধরা পড়ার পর সংশোধন করা যতটা জরুরি, তার থেকেও বেশি জরুরি ছিল এমন ভুল যেন আদৌ না ঘটে, তা নিশ্চিত করা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হল, এই সমস্যাগুলি বিচ্ছিন্ন নয়। পরীক্ষকদের অভিযোগ, স্ক্যান করা খাতা অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে, ফলে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়। অনলাইন পোর্টাল বারবার বিকল হচ্ছে, লগইন সমস্যা দেখা দিচ্ছে, পুনর্মূল্যায়নের পেমেন্ট প্রক্রিয়াও ঠিকমতো কাজ করছে না। অর্থাৎ, গোটা ডিজিটাল পরিকাঠামোই এখনও পরিপক্ক নয়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— কেন এই তাড়াহুড়ো? ডিজিটাল পদ্ধতি অবশ্যই ভবিষ্যতের দিশা, কিন্তু তা কার্যকর করার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং পরীক্ষামূলক প্রয়োগ জরুরি ছিল। ‘পাইলট প্রজেক্ট’ ছাড়া সরাসরি সারাদেশে এমন একটি সংবেদনশীল ব্যবস্থার প্রয়োগ করা নিছক দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলেই মনে হয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে—ছাত্রছাত্রীদের মানসিক চাপ। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস, বিশৃঙ্খলা— এসব তাদের আত্মবিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তার ওপর বোর্ড পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই ধরনের গণ্ডগোল তাদের আরও হতাশ করে তুলছে। এমনকি, একজন ছাত্র যখন এই সমস্যা সামনে আনতে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে, তখন তাকে ট্রোলিংয়ের শিকার হতে হয়— এটিও আমাদের সমাজের একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছাত্রছাত্রীদের প্রতি ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। প্রযুক্তি সেই লক্ষ্য পূরণের একটি মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্যকে বিসর্জন দিয়ে মাধ্যমকে অগ্রাধিকার দেওয়া বিপজ্জনক। ডিজিটাল পদ্ধতি তখনই সফল হবে, যখন তা নির্ভুল, নিরাপদ এবং ব্যবহারবান্ধব হবে।
এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। বোর্ড কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করতে হবে যে প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল এড়াতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আরও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, উন্নত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ— এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— শিক্ষা শুধু নম্বরের খেলা নয়, এটি বিশ্বাসের বিষয়ও। সেই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। তাই এখনই সময়, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি আরও নির্ভরযোগ্য ও মানবিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার।