গণতন্ত্রে নির্বাচন শুধু ভোট নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া নয়। নির্বাচনই ঠিক করে দেয় জনগণের হাতে থাকা ক্ষমতা কার হাতে যাবে। তাই নির্বাচনের সময় টাকা বিলি, কালো টাকার ব্যবহার, ভোটারকে প্রভাবিত করা বা অন্য কোনও বেআইনি পদ্ধতি গ্রহণকে কখনও ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না। অথচ এত দিন এমন একটি প্রবণতা দেখা গিয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনী অনিয়মের মামলা প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটেছে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
সম্প্রতি বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি এন কে সিংহের বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলাও ইচ্ছেমতো প্রত্যাহার করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট হাই কোর্টের অনুমতি ছাড়া এই ধরনের মামলা প্রত্যাহার করা উচিত নয়। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, সাংসদ ও বিধায়কদের বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রেও হাই কোর্টের অনুমতি প্রয়োজন। এবার সেই নীতিই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করার কথা বলেছে শীর্ষ আদালত।
এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া মানেই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে ভোট চাওয়া নয়; প্রার্থী নিজেকে সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধি হিসেবেও মানুষের সামনে তুলে ধরেন। ফলে নির্বাচনের সময় তাঁর আচরণে আইন ও নৈতিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা জরুরি। সুপ্রিম কোর্ট যথার্থই মনে করিয়েছে, কোনও প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা শুরু হওয়ার পর শুধুমাত্র সরকার বদলে যাওয়ার কারণে তাঁর দায়মুক্তি হতে পারে না।
বাস্তবে অবশ্য ছবিটা অনেক সময় অন্য রকম। যে দল ক্ষমতায় থাকে, তার বিরুদ্ধে কোনও প্রার্থী বা রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হলে বিরোধীরা সেটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে অভিযোগ করে। আবার সরকার পরিবর্তনের পরে সেই একই মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হলে যুক্তি দেওয়া হয়, মামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোথাও কোথাও অভিযোগ থাকে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে বলেই মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এই সংস্কৃতি শুধু আইনের শাসনকেই দুর্বল করে না, সাধারণ মানুষের আস্থাতেও আঘাত করে।
এখানেই সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত বলেছে, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া— এই তিনটি পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এর যে কোনও একটিতে দুর্বলতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো ব্যবস্থার উপর। কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভোটে কালো টাকার ব্যবহার যদি অবাধ হয়, তাহলে অর্থবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করবে। আর অর্থবল যদি নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারও কার্যত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কালো টাকা নির্বাচনী রাজনীতির একটি পুরনো সমস্যা। ভোটের সময় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের খবর প্রায়ই সামনে আসে। কিন্তু শুধু টাকা উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়। কোথা থেকে টাকা এল, কার জন্য তা ব্যবহার হওয়ার কথা ছিল, কী উদ্দেশ্যে তা রাখা হয়েছিল— এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। এই কারণে সুপ্রিম কোর্ট আয়কর দপ্তরকেও সক্রিয় করার নির্দেশ দিয়েছে। নির্বাচনী নজরদারির সময় স্ট্যাটিক সার্ভেল্যান্স টিমের হাতে ১০ লক্ষ টাকার বেশি নগদ ধরা পড়লে আয়কর দফতরকে ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্ত দ্রুত শেষ করার বিষয়েও আদালত গুরুত্ব দিয়েছে।
এখানে অবশ্য একটি ভারসাম্যের প্রশ্নও রয়েছে। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক কর্মী বা প্রার্থীদের কাছে নগদ টাকা পাওয়া গেলেই তাকে অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ বলে ধরে নেওয়া যায় না। বৈধ অর্থও বিভিন্ন কারণে সঙ্গে থাকতে পারে। তাই তদন্ত হতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। কোনও নির্দোষ ব্যক্তি যেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক ক্ষমতার আড়ালে যেন কেউ রক্ষা না পান, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনী অনিয়মের মামলা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে হাই কোর্টের অনুমতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব তাই বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এতে সরকারের হাতে থাকা ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কমবে। একই সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থাগুলির উপর রাজনৈতিক চাপের অভিযোগও কমানোর সুযোগ
তৈরি হবে।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হল জনগণের বিশ্বাস। ভোটার যদি মনে করেন, অর্থবল ও ক্ষমতার জোরে নির্বাচনী আইন ভাঙলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে মামলা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব, তাহলে সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়। আর গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের কাঠামোয় টিকে থাকে না; মানুষের বিশ্বাসের উপরও তার ভিত দাঁড়িয়ে থাকে।
তাই সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশকে শুধুমাত্র একটি আইনি নির্দেশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং প্রশাসন— সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা। নির্বাচন জেতার জন্য যে কোনও পথ গ্রহণযোগ্য নয়। ক্ষমতার পরিবর্তনও অপরাধের দায় মুছে দিতে পারে না।
ভোটের দুর্নীতি : সুপ্রিম কোর্টের বার্তা
The Supreme Court of India rules that DNA tests cannot be ordered routinely (Pic: ANI)