দিল্লির সত্য নিকেতনে ছাত্রদের আবাস হিসেবে ব্যবহৃত একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ার ঘটনা নিছক আর একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। এই মুহূর্তে অবশ্যই প্রথম কাজ ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করা এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জানতে হবে, ঠিক কী কারণে ভবনটি ভেঙে পড়ল। কিন্তু এই ঘটনার সঙ্গে এমন কিছু প্রশ্ন জড়িয়ে আছে, যার উত্তর শুধু একটি ভবনের ধসের কারণ খুঁজে পেলেই মিলবে না।
সত্য নিকেতন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে। ফলে বহু বছর ধরেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই এলাকা। ছাত্রছাত্রীদের চাহিদাকে সামনে রেখে সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পেয়িং গেস্ট বা পিজি আবাসন। একটি সাধারণ বাড়ি বা ফ্ল্যাটকেও অনেক সময় পরিবর্তন করে বহু ছাত্রছাত্রীকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এতে ব্যবসা হয়, বাড়িওয়ালা ও আবাসন-পরিচালকের লাভ হয়। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হল— এই ভবনগুলি এত বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাসের উপযুক্ত কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করে কে?
খবর অনুযায়ী, যে ভবনটি ধসে পড়েছে, সেখানে প্রায় ৭৫ জনের থাকার ব্যবস্থা ছিল। আগে সেটি সম্ভবত আবাসিক ফ্ল্যাট হিসেবে ব্যবহৃত হত। পরে তা বাণিজ্যিকভাবে পিজি আবাসনে পরিণত করা হয়। ভবনের নিচের অংশে মেরামতি বা নির্মাণকাজ চলছিল বলেও খবর এসেছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, ভবনটিতে আগে থেকেই হেলে পড়ার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। এই সব তথ্যের সত্যতা অবশ্য তদন্তেই প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোনও ভবন নিয়ে যদি আগে থেকেই এমন আশঙ্কা বা সতর্কবার্তা থেকে থাকে, তা হলে সেখানে এত মানুষের বসবাস চলতে থাকল কীভাবে?
এখানেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দুর্ঘটনা ঘটার পর পুলিশি তদন্ত, মামলা এবং গ্রেপ্তার— এসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দেখতে হবে, এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পুরসভা, নির্মাণ ও নিরাপত্তা দপ্তর কী করছিল। ভবনটির কাঠামোগত পরিবর্তনের অনুমতি ছিল কি? আবাসিক ভবনকে এত বড় পিজি আবাসনে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কি? ভবনটির নিরাপত্তা পরীক্ষা হয়েছিল কি? কোথাও কোনও অভিযোগ জমা পড়েছিল কি? এসব প্রশ্নের উত্তর মানুষ জানতে চায়।
ছাত্রছাত্রীরা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অসহায়। তারা বেশির ভাগই বাড়ি থেকে দূরে এসে পড়াশোনা করে। কোনও বাড়ির ভিত শক্তিশালী কি না, অনুমতি ছাড়া অতিরিক্ত তলা বা ঘর তৈরি হয়েছে কি না, বাড়ির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে কি না— এসব বিচার করার মতো প্রযুক্তিগত জ্ঞান তাদের থাকার কথা নয়। তেমন দরকষাকষির ক্ষমতাও অনেকের নেই। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের প্রয়োজনেই তারা বিজ্ঞাপন দেখে বা পরিচিতের পরামর্শে পিজিতে ওঠে। অভিভাবকেরাও স্বাভাবিকভাবেই মনে করেন, প্রকাশ্যে ব্যবসা চালানো একটি ছাত্রাবাস নিশ্চয়ই ন্যূনতম নিরাপত্তার নিয়ম মেনেই চলছে। কিন্তু সেই ধারণা যদি ভুল হয়, তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
দিল্লির সত্য নিকেতন বা অন্য বহু এলাকায় ছাত্রাবাসের সংখ্যা এবং ঘনত্ব প্রশাসনের অজানা নয়। বিশেষত শহরের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ও পুরনো বসতিতে নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যেভাবে বাড়িঘরকে বহু মানুষের আবাসনে পরিণত করা হচ্ছে, তার উপর কঠোর নজরদারি দরকার। ছাত্রদের থাকার বাড়ি মানেই শুধু ভাড়া তোলার ব্যবসা নয়; সেখানে মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে।
তাই সত্য নিকেতনের ঘটনার তদন্ত কেবল ধসের তাৎক্ষণিক কারণেই সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না। শহর জুড়ে ছাত্রাবাস ও পিজি হিসেবে ব্যবহৃত ভবনগুলির জরুরি নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হবে। যেখানে প্রয়োজন, অবিলম্বে বাসিন্দাদের সরিয়ে ভবন মেরামত বা ব্যবহার বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। বেআইনি পরিবর্তন, অতিরিক্ত চাপ বা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ী সংস্থার পাশাপাশি দায়িত্বে গাফিলতি করা প্রশাসনিক কর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আর একটি ধসের পরে তদন্ত কমিশন বসানোই যথেষ্ট নয়। আসল পরীক্ষা হল— যে ভবনগুলি এখনও দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন এখনই এগিয়ে আসে কি না। কারণ ধ্বংসস্তূপের নীচে মানুষ চাপা পড়ার পর শুরু হওয়া তৎপরতার চেয়ে, দুর্ঘটনার আগেই বিপদ ঠেকানো অনেক বেশি জরুরি।