স্বাদের শহরে নিরাপত্তার সংকট: আমাদের প্লেটে আসলে কী উঠছে?

Photo: খাদ্য নিরাপত্তায় কড়া রাজ্য সরকার (AI)

সন্ধ্যা নামলেই শহরের রাস্তায় আলো জ্বলে, আর সেই আলোর সঙ্গে বদলে যায় আমাদের খাদ্যাভ্যাস— বন্ধুর সঙ্গে কফি, পরিবারের সঙ্গে ডিনার, অফিসের পর রেস্তরাঁয় আড্ডা, সপ্তাহান্তে শপিং মলের ফুড কোর্ট; বাইরে খাওয়া এখন আর উৎসবের বিলাসিতা নয়, আধুনিক জীবনযাত্রার স্বাভাবিক অঙ্গ। কিন্তু যে প্লেটকে ঘিরে আমাদের এত আনন্দ, তার দিকে তাকিয়ে কি আমরা কখনও প্রশ্ন করি— এই খাবারটি নিরাপদ তো? কারণ খাবারের স্বাদ, গন্ধ, সাজসজ্জা কিংবা দাম দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার বিচার হয় না; রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচামালের মান, খাদ্য সংরক্ষণের তাপমাত্রা, মেয়াদ, রান্নার তেল, খাদ্য-রং, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি এবং কাঁচা ও রান্না করা খাবারের পৃথক ব্যবস্থাপনাই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে খাবারটি কতটা নিরাপদ।

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের অভিযান সেই অদৃশ্য বাস্তবতার দরজা খুলে দিয়েছে। মালদহে ২৫টি রেস্তরাঁ পরিদর্শনের সময় একটি প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর রান্নাঘর, পচা ও অনুপযোগী খাদ্যসামগ্রী এবং সম্ভাব্য অনিরাপদ খাদ্য-রং পাওয়ার কথা প্রশাসন জানিয়েছে; অন্যত্র পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রীও ধরা পড়েছে। শিলিগুড়িতেও খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর, পুরসভা ও এনফোর্সমেন্ট শাখার যৌথ দল হোটেল-রেস্তরাঁয় আচমকা পরিদর্শন করে রান্নাঘর, স্টোররুম, ফ্রিজার, মশলা, রান্নার তেল, দুগ্ধজাত পণ্য, সবজি এবং অন্যান্য কাঁচামালের গুণমান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করেছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন আর কেবল ভোক্তার সন্দেহ নয়; প্রশাসনিক নজরদারিও বলছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষার বিষয়।

আর এই প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই ফিরে আসে ২০১৮ সালের সেই বহুচর্চিত ভাগাড়-কাণ্ড। মৃত পশুর দেহ থেকে মাংস সংগ্রহ করে তা খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ঢোকানোর অভিযোগ এবং কলকাতার একটি হিমঘর থেকে বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক মাংস উদ্ধারের ঘটনায় সেই সময় রাজ্যজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। সেই ঘটনার সঙ্গে আজকের প্রতিটি রেস্তরাঁকে জুড়ে দেওয়া অবশ্যই অনুচিত; কিন্তু ঘটনাটি একটি ভয়াবহ শিক্ষা দিয়েছিল—খাদ্য সরবরাহের শৃঙ্খলের কোনও অন্ধকার কোণ যদি নজরদারির বাইরে থাকে, তার শেষ গন্তব্য হতে পারে সাধারণ মানুষের প্লেট।


আজকের ভারতেও খাদ্য-নিরাপত্তার ছবিটি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো নয়। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ভারতের খাদ্যব্যবস্থায় ভেজালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে অভিযান ও নজরদারি বাড়ার কথা উঠে এসেছে৷ গুজরাতে আগস্ট মাসে হাজার হাজার খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করে বিপুল পরিমাণ কথিত ভেজাল খাদ্য বাজেয়াপ্ত এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। মহারাষ্ট্রেও সাম্প্রতিক পরিদর্শনে মুম্বাইয়ের কিছু খাদ্য প্রতিষ্ঠানে অপরিচ্ছন্নতা, অনিরাপদ জল, ভুলভাবে সংরক্ষিত খাবার এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে লাইসেন্স-সংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার খবর এসেছে। এমনকি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জয়পুরের একটি McDonald’s outlet-এ বারবার ব্যবহৃত অনুপযুক্ত রান্নার তেল এবং পচা টমেটো পাওয়ার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কতার ঘটনাও সামনে আসে; তেলের নমুনা পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছিল। আরও সাম্প্রতিকভাবে মুম্বাইয়ে একটি গুদামে নামী ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত খাদ্যের মেয়াদ ও পুষ্টি-লেবেল বদলে দেওয়ার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে প্যাকেজিং পরিবর্তনের সরঞ্জাম ও বিপুল পরিমাণ পণ্য উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়েছে— যা দেখিয়ে দেয় খাদ্য-নিরাপত্তা শুধু রান্নাঘরের সমস্যা নয়, সম্পূর্ণ সরবরাহের প্রশ্ন।

এই বাস্তবতার মধ্যে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাও উপেক্ষা করার মতো নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অনিরাপদ খাবারে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী কিংবা রাসায়নিক পদার্থ থাকতে পারে এবং এর ফলে ২০০-রও বেশি ধরনের রোগ হতে পারে; শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ খাবারের সমস্যা শুধু এক দিনের পেটের গোলমালে সীমাবদ্ধ নয়; দূষণের ধরন ও মাত্রার উপর নির্ভর করে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদেও গুরুতর হতে পারে।

তাই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মূল সতর্কতা হওয়া উচিত— খাবারের ক্ষেত্রে ‘দেখতে ভালো’কে নিরাপত্তার সার্টিফিকেট হিসেবে না দেখা, মেয়াদোত্তীর্ণ বা সন্দেহজনক খাবার এড়ানো এবং পরিচ্ছন্নতা ও সংরক্ষণব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা আরও জরুরি। শিশুরা নিজেরা খাবারের উৎস, সংরক্ষণ বা উপাদানের নিরাপত্তা যাচাই করতে পারে না; ফলে অভিভাবক এবং খাদ্য ব্যবসায়ী— দুই পক্ষের দায়িত্বই বেশি। ভারতের খাদ্য-নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক FSSAI-র ভূমিকা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। FSSAI খাদ্য-নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক মান নির্ধারণ করে এবং খাদ্য ব্যবসাগুলির উপর নজরদারির কাঠামো তৈরি করে। এমনকি FSSAI-এর খাদ্য প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা-অনুসরণের ভিত্তিতে রেটিং দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে, যাতে ভোক্তা তুলনামূলকভাবে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

কিন্তু আইন, লাইসেন্স বা রেটিং থাকলেই দায় শেষ হয় না। দরকার নিয়মিত পরিদর্শন, আচমকা পরীক্ষা, খাদ্য নমুনার দ্রুত পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ, রিপোর্টের স্বচ্ছতা এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। কারণ খাদ্য-নিরাপত্তায় সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হল অনিয়মের স্বাভাবিকীকরণ— ‘সবাই তো এভাবেই করে’, ‘একটু বাসি হলে কিছু হয় না’, ‘রং একটু বেশি হলে কী হয়েছে’, ‘তেল তো ফেলে দিলে ব্যবসা চলবে না’— এই যুক্তিগুলিই একদিন বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

একই সঙ্গে ক্রেতাকেও বুঝতে হবে, রেস্তরাঁ মানেই সন্দেহ নয়। অসংখ্য প্রতিষ্ঠান কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা করে এবং তাদের সঙ্গে অনিয়মকারীদের এক কাতারে দাঁড় করানোও অন্যায়। দরকার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সৎ ব্যবসায়ী স্বীকৃতি পাবেন এবং নিয়মভঙ্গকারী দ্রুত চিহ্নিত হবেন। খাদ্য-নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক সচেতনতাও তাই জরুরি। আতঙ্ক নয়, প্রমাণ; গুজব নয়, পরীক্ষাগার; অভিযোগ নয়, জবাবদিহি— এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়েই খাদ্য-নিরাপত্তার ব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে।

একটি রেস্তরাঁর রান্নাঘরে পরিচ্ছন্নতার সামান্য অবহেলা, একটি গুদামে ভুল সংরক্ষণ, একটি সরবরাহ শৃঙ্খলে মেয়াদ নিয়ে কারচুপি কিংবা একটি খাবারে অননুমোদিত উপাদানের ব্যবহার— এসবকে ‘ছোটখাটো ব্যবসায়িক ভুল’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। খাদ্য-নিরাপত্তা আসলে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। আমরা যখন রেস্তরাঁয় বসে খাবারের অর্ডার দিই, তখন শুধু খাবারের মূল্য দিই না— একটি বিশ্বাসের মূল্যও দিই। সেই বিশ্বাসের বিনিময়ে আমাদের জানার অধিকার আছে, খাবারটি নিরাপদ কি না।

আগামী দিনে তাই খাদ্য দপ্তরের অভিযান যেন কেবল সংবাদপত্রের এক দিনের শিরোনাম না হয়; তা যেন হয়ে ওঠে ধারাবাহিক নজরদারির সংস্কৃতি। রেস্তরাঁর মালিক যেন বুঝতে পারেন, পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর খরচ নয়— দায়িত্ব; প্রশাসন যেন বুঝতে পারে, একটি নমুনা সংগ্রহ করাই শেষ নয়— তার রিপোর্ট ও পরবর্তী ব্যবস্থা সমান গুরুত্বপূর্ণ; আর ক্রেতা যেন বুঝতে পারেন, খাবার নিয়ে প্রশ্ন করা অভিযোগ নয়— এটি তাঁর অধিকার। কারণ আমাদের জীবন যত আধুনিক হবে, বাইরে খাওয়ার অভ্যাস যত বাড়বে, খাদ্য-নিরাপত্তার প্রশ্নও তত বড় হবে।