শোভনলাল চক্রবর্তী
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে গোটা দুনিয়ার মানুষ যেন নীলকরের প্রজা, মুলোর ক্ষেত আর উনি যখন খুশি এসে সেই ক্ষেত থেকে মুলো খেয়ে যাবেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং স্থগিতাদেশকে বোঝাতে এর চেয়ে উপযোগী উদাহরণ পাওয়া মুশকিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া বা চিনকে নিয়ে তাঁরা চিন্তিত নন, আগেই দাবি করেছিলেন আমেরিকার প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ। প্রকাশ্যে রাশিয়া বা চিন যুদ্ধে যোগ দিয়ে ইরানকে সাহায্য করার বিষয়ে কোনও মন্তব্যও করেনি তিনি। কিন্তু রিপোর্টে দাবি, রাশিয়া কলকাঠি নেড়ে গেছে এক নাগাড়ে। লাগাতার মস্কো থেকে গোয়েন্দা তথ্য পৌঁছে গিয়েছে তেহরানে! মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে রাশিয়া যুদ্ধে সাহায্য করেছে ইরানকে। তাদের সাহায্য ছাড়া ইরান যুদ্ধে বেশি দূর এগোতেই পারত না। ওয়াশিংটন পোস্ট মোতাবেক আমেরিকা এবং ইজরায়েলের বাহিনী ইরানে হামলা চালানোর পরেই তেহরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে ইরানের সেনাবাহিনী সার্বিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। তার পরেও ইরান কিন্তু পিছু হটেনি। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে নিখুঁত ভাবে নিশানা করেছে তারা। একাধিক ঘাঁটি ইরানি আঘাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এমনকি মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে এসেছে। রিপোর্টে দাবি, মস্কোর সাহায্য ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না।
কুয়েতের শুয়াবিয়া বন্দরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, ওমান, বাহরিন, ইরাক, জর্ডনের মতো একাধিক দেশে হামলা হয়েছে। রাশিয়ার সামরিক শক্তি বিশেষজ্ঞ দারা ম্যাসিকট মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, ইরান খুব নিখুঁত হামলা চালিয়েছে। খুব পরিকল্পিত ভাবে তারা কাজ করেছে। ইরানের মিলিটারি-গ্রেড স্যাটেলাইটের সংখ্যা হাতেগোনা। নিজস্ব কোনও স্যাটেলাইট কনস্টেলেশনও নেই।
তাঁর মনে হচ্ছে, রাশিয়ার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এখানে কাজে লেগেছে। ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক এবং কূটনৈতিক সহাবস্থানের সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাশিয়া বা চিন সরাসরি যোগ দেওয়ার কথা বলেনি। তবে ইরানের উপর মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার নিন্দা তারা করেছে কড়া ভাষায়। এ-ও জানিয়েছে, তেহরান যে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে, তার কোনও প্রমাণ নেই। সংঘাত অবিলম্বে থামিয়ে কূটনীতি এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ফেরানোর দাবি জানিয়েছে বেজিং। তারা আমেরিকার হামলাকে ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেছে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় মৃত্যু হয় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির। তা সত্বেও ইরান মাথা নত করার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি। বরং পাল্টা প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে তেহরান থেকে। সঙ্গে চলেছে হামলা। ক্রেমলিনের মতে, ইরানের নেতাদের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক আলোচনা হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রে এই সংঘাত একটি অদ্ভুত কৌশলগত আপাতবিরোধ তৈরি করেছে। মস্কো এক দিকে হামলাগুলিকে অবৈধ আগ্রাসন বলে সরবে নিন্দা করেছে এবং অন্য দিকে তেহরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নিয়েছে বলে জানা গেছে। আসলে, পশ্চিমের যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না-হওয়ার বিষয়ে সতর্ক রয়েছে রাশিয়া। পুতিনের হিসাব সোজা— রাশিয়ার অগ্রাধিকার ইউক্রেনের যুদ্ধ, এবং পশ্চিম এশিয়ায় যে কোনও উত্তেজনা তাদের পক্ষে কৌশলগত ভাবে কাম্য। তা ছাড়া, ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ক্রমশ রাশিয়ার অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠলেও, তেলের এই আকস্মিক রাজস্ব বৃদ্ধি পুতিনকে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিয়েছে। অন্য দিকে, আমেরিকা এবং ইজরায়েলের ইরান অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে আমেরিকার অস্ত্রসম্ভারের অনেকখানি, যা অন্যথায় কাজে লাগত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি উদ্বিগ্ন হতে পারেন, এই অস্ত্র ঘাটতি আগামী দিনে রাশিয়াকে যুদ্ধে আরও এগিয়ে দিতে পারে।
ফলে, আপাতত মস্কোর পক্ষেই ভারসাম্য ঝুঁকে রয়েছে। বস্তুত, সম্প্রতি ভারতে আমদানি করা রুশ তেলের দাম রেকর্ড ব্যারেল প্রতি ৯৮.৯৩ ডলারে পৌঁছে যায়, যা গত চার বছরে সর্বোচ্চ। তবুও এই পর্বটি সমসাময়িক ভূ-রাজনীতিতে এক পুরনো ধারারই ইঙ্গিতবাহী— প্রান্তিক দ্বন্দ্বগুলি বৃহৎ শক্তিগুলির জন্য যে সুযোগ তৈরি করে সেগুলি খুব কমই সুস্থায়ী কৌশলগত সুবিধায় রূপান্তরিত হয়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন, যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে এটি একটি গভীর বিশ্বব্যাপী মন্দার সূত্রপাত করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত হাইড্রোকার্বনের চাহিদা হ্রাস করবে। ফলে, শেষ অবধি আহত হওয়ার সম্ভাবনা রাশিয়ার অর্থনীতিরই। আপাতত ক্ষণিকের জন্য লাভবান হলেও, আগামী দিনে এই সুযোগকে রাশিয়া স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক লাভে রূপান্তরিত করতে পারবে কি না, এটাই দেখার। যে কোনও সামরিক সংঘাত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যেখানে কোনও তৃতীয় পক্ষ এই বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগায় ব্যক্তিগত, আর্থিক বা কৌশলগত লাভের জন্য। এর ব্যতিক্রম নয় আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের সাম্প্রতিক সংঘর্ষও। পশ্চিম এশিয়া জুড়ে যখন যুদ্ধের আবহ এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন আর একটি প্রধান শক্তি নীরবে এই অস্থিরতা থেকে সুবিধা লাভ করছে— রাশিয়া।
যুদ্ধের জেরে এমনিতেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর উপর আমেরিকা ও ইজরায়েলের আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিঘ্নিত হয়েছে জ্বালানি শক্তির সরবরাহ-শৃঙ্খল। স্বাভাবিক ভাবেই ভারত ও চিনের মতো এশীয় ক্রেতারা বাধ্য হয়েছে বিকল্পের সন্ধান করতে, যা এখন সরবরাহ করছে মস্কো। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর থেকে মস্কো প্রতি দিন প্রায় ১৫ কোটি ডলার অতিরিক্ত তেল রাজস্ব আয় করছে বলে অনুমান। শুধু তা-ই নয়, কিছু দিন আগে ভারতীয় পরিশোধকদের রুশ অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের ‘ছাড়’ দেওয়ার পর, এখন অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রসারিত করার কথা ঘোষণা করেছে আমেরিকা।
তেহরানকে যদি আমেরিকা আর ইজরায়েল আক্রমণ করে, তা হলে সেই যুদ্ধবাজদের শায়েস্তা করতে চিন আর রাশিয়া কি ইরানকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র জোগান দেবে? যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রশ্নে তোলপাড় হয়েছে সমাজমাধ্যম। অন্য কোনও দেশ থেকে গোপনে ইরানে অস্ত্রের জোগান এসেছে কি না তা নিশ্চিত করা কঠিন, তবে প্রকাশ্যে তেহরান কোনও সামরিক সহায়তা পায়নি। চিন আর রাশিয়া, দু’দেশই ইরানের উপর আক্রমণ, এবং আয়াতোল্লা আলি হোসেনি খামেনেইকে হত্যার নিন্দা করেছে। বলেছে, আমেরিকা এবং ইজরায়েল ইরানের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করেছে, আন্তর্জাতিক নিয়মবিধিকে নস্যাৎ করেছে। কিন্তু চিন বা রাশিয়া কেউ-ই ইরানকে সামরিক সাহায্য পাঠিয়েছে বলে জানা যায়নি। বাণিজ্যিক স্বার্থেই চিন চায় না যে এই যুদ্ধ আরও ছড়াক, কারণ পশ্চিম এশিয়ায় চিনের প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে ইজরায়েলও রয়েছে, যার দু’টি বন্দরের আধুনিকীকরণে যুক্ত আছে চিন। উচ্চপ্রযুক্তির নানা স্টার্ট আপ-এও চিন বিনিয়োগ করেছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের পেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্প, তেল শোধনাগারে চিনের প্রচুর বিনিয়োগ আছে। এই দেশগুলি থেকে অনেক তেলও দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির স্বার্থে তেল এবং গ্যাসের জোগানে কোনও ব্যাঘাত ঘটতে দিতে চায় না চিন। ইরানের সঙ্গে ২০২১ সালে এক দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে চিন— পরবর্তী পঁচিশ বছর সার্বিক সহায়তা এবং কৌশলগত অংশীদারির অঙ্গীকার করে। ইরানের পরিকাঠামো, জ্বালানি, ব্যাঙ্কিং প্রভৃতি ক্ষেত্রে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চিন। এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার দেশগুলিকে স্থলপথ এবং জলপথে সংযুক্ত করার জন্য যে বিশাল প্রকল্প (‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, ২০১৩) নিয়েছে চিন, ইরানকে তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করেছে এই চুক্তি। তবে ইরানে বিনিয়োগের ব্যাপারে চিন খানিকটা রাশ টেনে রেখেছে। এখনও অবধি চিন বিনিয়োগ করেছে প্রধানত জ্বালানির ক্ষেত্রে, স্বল্পমূল্যে ইরানের তেল এবং গ্যাস কেনায়। ইরানের উপর দীর্ঘ দিন আন্তর্জাতিক নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়ে রয়েছে, তাই চিনের এই টাকা ইরানের অর্থনীতির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালে ইরান জাহাজে যত তেল রফতানি করেছে, তার ৮০ শতাংশই কিনেছে চিন, তেলের দামে ছাড় আদায় করেছে অনেকখানি। সমুদ্রপথে চিন যত তেল আমদানি করে, তার ১৩.৫ শতাংশ আসে ইরান থেকে। প্রতিদানে ইরানের আন্তর্জাতিক কোণঠাসা অবস্থা কাটাতে অনেকটাই সাহায্য করেছে চিন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ব্রিকস’ জোট এবং ‘শাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’ জোটে শামিল করেছে ইরানকে। তবে, ইরান আণবিক অস্ত্র তৈরি করুক, তা চায় না চিনও। তাতে পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যাহত হবে। ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত আরও তীব্র হবে, কারণ এই দু’টি দেশেরই কেবল আণবিক অস্ত্র রয়েছে। আণবিক অস্ত্রের জোরে পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের আধিপত্য বৃদ্ধি পাক, চিন তা চায় না। পশ্চিম এশিয়ার অন্য দেশগুলি ইরানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আণবিক অস্ত্র তৈরির দৌড়ে নামতে পারে, যার জেরে চিনের প্রতিবেশী দেশগুলি— দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান প্রভৃতি আণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে ঝুঁকতে পারে। তাতে ভারত মহাসাগর-প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় চিনের আধিপত্য প্রশ্নের মুখে পড়বে। চিন, রাশিয়া, ব্রাজ়িল প্রভৃতি যে দেশগুলি যুদ্ধের সমালোচনা করে বক্তব্য প্রকাশ করেছে, সেগুলির কোনওটাই এই যুদ্ধে সামরিক ভাবে যোগ দেয়নি। গত কয়েক মাসে ট্রাম্পের নীতি, আচরণের জন্য এই দেশগুলির সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কে চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু কোনও দেশ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে চায় না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সব সময়েই সর্বাধিক গুরুত্ব পায় জাতীয় স্বার্থ। ইরান-যুদ্ধ সম্ভবত সেটাই আরও এক বার প্রমাণ করবে।