সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, বিপন্ন ভারতের উপকূল

সমুদ্রের দিকে তাকালে মানুষের মনে প্রথমেই জাগে অসীমের অনুভূতি। দিগন্তবিস্তৃত নীল জলরাশি আর ঢেউয়ের ওঠানামার আড়ালে ঘটে চলেছে এক গভীর পরিবর্তন। সমুদ্র ক্রমশ উঁচু হচ্ছে। এই পরিবর্তন এত ধীর যে প্রতিদিনের জীবনে তার প্রভাব সহজে বোঝা যায় না। অথচ কয়েক দশকের ব্যবধানে সমুদ্রপৃষ্ঠের সামান্য উচ্চতা বৃদ্ধিও উপকূলের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে বসতভিটে ও কৃষিজমি। বিপন্ন হতে পারে মানুষের জীবিকা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। ভারতের মতো দীর্ঘ উপকূলরেখা ও বিপুল উপকূলীয় জনবসতিসম্পন্ন দেশের কাছে এই অশনি সংকেত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি বুঝতে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন নির্ভর করতে হয়েছে উপকূলে বসানো জোয়ার-ভাটা পরিমাপক যন্ত্রের উপর। কিন্তু নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানের পরিমাপ দিয়ে পৃথিবীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা কঠিন। সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট উৎক্ষেপণ করা হয় টোপেক্স-পসেডন উপগ্রহ। পরবর্তী সময়ে জেসন-১, জেসন-২, জেসন-৩ এবং সেন্টিনেল-৬-এর মতো উপগ্রহ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিমাপের কাজে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।

রাডার অলটিমিটার প্রযুক্তির সাহায্যে উপগ্রহ থেকে সমুদ্রের দিকে মাইক্রোওয়েভ সংকেত পাঠানো হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে সেই সংকেত ফিরে আসতে কত সময় লাগে, তা পরিমাপ করা হয়। মহাকাশে উপগ্রহের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের উচ্চতা হিসাব করেন। এই প্রযুক্তির সাহায্যে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।


নাসার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এর প্রধান কারণ দুটি। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ ও মেরু অঞ্চলের স্থলভাগের বরফ গলে সমুদ্রে জল যোগ হচ্ছে। পাশাপাশি উষ্ণ সমুদ্রের জল প্রসারিত হচ্ছে। এই দুই প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাবেই বাড়ছে সমুদ্রের উচ্চতা। বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির সঙ্গে অবশ্য প্রতিটি উপকূলের পরিস্থিতি মেলে না। সমুদ্রস্রোত, স্থানীয় আবহাওয়া, ভূমির উচ্চতা ও নদীবাহিত পলির সঞ্চয় এই পরিবর্তনের প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে।

ভারতের ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ আরও গভীর। চলতি বছরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৯৩ থেকে ২০২২ সালের উপগ্রহ ও জোয়ার-ভাটার তথ্য বিশ্লেষণ করে ভারতের বিভিন্ন উপকূলে বছরে প্রায় ২.৩ থেকে ৫.৮ মিলিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির হিসাব পাওয়া গিয়েছে। গবেষণায় উপকূলীয় গড় বৃদ্ধির হার বছরে প্রায় ৪.২১ মিলিমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান ভারতের প্রতিটি উপকূলে একই হারে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে, এমন প্রমাণ দেয় না। তবে আঞ্চলিক বিপদের মাত্রা বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।

ভারতের পশ্চিম উপকূলে গুজরাত ও মহারাষ্ট্রের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে পূর্ব উপকূলের ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কোথাও নদীর পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হচ্ছে। কোথাও ঢেউ ও সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে উপকূল ক্ষয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে উচ্চ জোয়ার ও ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস যুক্ত হলে নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে বন্যার আশঙ্কা বাড়তে পারে। বন্দর, শিল্পাঞ্চল, কৃষিজমি এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলিও এই বিপদের বাইরে নয়। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এই সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নদী ও খাঁড়িতে ঘেরা এই বদ্বীপের ম্যানগ্রোভ অরণ্য ঘূর্ণিঝড়ের অভিঘাত কমাতে এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভূমিক্ষয়, লবণাক্ততার বিস্তার এবং ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস সুন্দরবনের মানুষের জীবনকে ক্রমশ অনিশ্চিত করে তুলছে। দ্বীপের কোনও অংশ ভাঙনের মুখে পড়লে শুধু জমিই হারায় না। হারিয়ে যায় বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার অবলম্বন। লবণাক্ততা বাড়লে কৃষি উৎপাদন ও পানীয় জলের জোগানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এখানে ভূমির অবনমনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি কোনও অঞ্চলের ভূমি নিচে নেমে গেলে আপেক্ষিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও দ্রুত বাড়তে পারে। আবার নদীবাহিত পলি জমে কোনও কোনও অঞ্চলে ভূমির উচ্চতা বজায় থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ বুঝতে সমুদ্রের উচ্চতা মাপার পাশাপাশি ভূমির পরিবর্তন ও নদীর পলি সঞ্চয়ের উপর নজর রাখা প্রয়োজন।

মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের মতো উপকূলীয় শহরেও সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি নতুন বিপদের আশঙ্কা তৈরি করছে। প্রবল বৃষ্টিপাত, উচ্চ জোয়ার এবং দুর্বল জলনিকাশি ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলে নগর বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কলকাতা সরাসরি সমুদ্রতীরে অবস্থিত না হলেও হুগলি নদী ও নিম্ন গাঙ্গেয় বদ্বীপের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বৃহত্তর বদ্বীপ অঞ্চলের জলস্তর ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের গুরুত্ব কলকাতার ক্ষেত্রেও অস্বীকার করা যায় না।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের নিজস্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ইসরো এবং সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির সংগৃহীত উপগ্রহের তথ্যের সঙ্গে উপকূলীয় পরিমাপের উপাত্ত মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ম্যানগ্রোভ অরণ্য সংরক্ষণ, পরিকল্পিত উপকূলীয় নির্মাণ এবং বিপন্ন জনবসতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বাঁধ নির্মাণের উপর নির্ভর না করে প্রতিটি অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশের উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধ করতে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো অপরিহার্য। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নিতে হবে। সমুদ্রকে থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু বিজ্ঞান ও পরিকল্পনার সাহায্যে তার অভিঘাত কমানো সম্ভব। সুন্দরবনের দ্বীপবাসী থেকে মুম্বাইয়ের নগরজীবন—ভারতের উপকূলের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।