দেশের অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধি এখন এক বড় উদ্বেগের কারণ। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও পরিবহণের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির পক্ষে এই বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআই রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫ শতাংশ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা সময়োপযোগী বলেই মনে হয়। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি বজায় রাখা জরুরি, কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেই বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবে না।
রেপো রেট হল সেই সুদের হার, যে হারে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে ঋণ দেয়। এই হার বাড়লে ব্যাঙ্কগুলির ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়ে গৃহঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ব্যবসায়িক ঋণের সুদেও। ফলে সাধারণ মানুষ ও শিল্প সংস্থার খরচ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তা সত্ত্বেও এই পদক্ষেপের পিছনে রয়েছে মূল্যবৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি বিপদ সম্পর্কে সতর্কতা।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী তিন মাসে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত মূল্যবৃদ্ধির হার ৯.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.৯ শতাংশ হতে পারে। এক বছরের হিসাবেও তা ৯.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে, বৃষ্টির ঘাটতি এবং সুপার এল নিনোর প্রভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যপণ্যের জোগান কমতে পারে। এই দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে তৈরি হলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়বে।
খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু ওই দুই ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহনের খরচ বাড়লে পণ্য উৎপাদন ও বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ব্যয়ও বাড়ে। সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ক্রেতার উপর চাপানো হয়। ফলে একসময় মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। মূল খাদ্য ও জ্বালানির দামের ওঠানামা বাদ দিয়েও যে মূল্যবৃদ্ধির হিসাব করা হয়, সেই মূল মূল্যস্ফীতিও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রবণতা উদ্বেগজনক। কারণ, একবার মূল্যবৃদ্ধি ব্যাপক আকার নিলে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।
এখানে টাকার দামের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরে মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মূল্য প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে এবং তা সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ডলারে নির্ধারিত হয়। ফলে টাকার দাম কমলে একই পরিমাণ তেল আমদানি করতে ভারতকে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ে, বাণিজ্যিক ভারসাম্যে চাপ পড়ে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার উপরেও প্রভাব পড়তে পারে। সুদের হার বৃদ্ধি টাকার সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু সুদের হার বাড়িয়েই মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়।
অবশ্য এই সিদ্ধান্তের বিরূপ প্রভাবও উপেক্ষা করা যায় না। ঋণের সুদ বাড়লে বাড়ি কেনা, নতুন ব্যবসা শুরু করা কিংবা শিল্পের প্রসার ঘটানো কঠিন হতে পারে। ঋণের খরচ বাড়লে বিনিয়োগ ও চাহিদার গতিও কমতে পারে। দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭.১ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পর এই আশঙ্কা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উচ্চ বৃদ্ধির হার বজায় রাখার জন্য যদি মূল্যবৃদ্ধিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তা হলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমবে। আয় বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও দ্রুত বাড়লে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে না।
তাই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে এখন ভারসাম্য রক্ষার কঠিন দায়িত্ব। একদিকে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সুদের হারকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে হবে, অন্যদিকে কৃষিপণ্যের জোগান বাড়ানো, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি এবং জ্বালানির আমদানি ব্যয়ের চাপ কমানোর মতো পদক্ষেপও জরুরি। শুধু আর্থিক নীতির উপর নির্ভর করলে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না।