যুদ্ধের মুখে স্বদেশে ফেরা: চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহির নীরব প্রতিবাদ

ফাইল চিত্র

গৌতম মণ্ডল

সুপ্রিম লিডার খামেনি-সহ দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সিংহভাগই নিহত হলেও মাসখানেক ধরে ইজরায়েল-আমেরিকার মতো মহাশক্তিধর দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে অসম যুদ্ধে ইরান রীতিমতো টক্কর দিয়ে চলেছে। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু সম্ভবত ভেবেছিলেন এঁদের হত্যা করলে দ্রুত ইরানের ইসলামিক রেজিমের পরিবর্তন হবে। এবং তাঁরা পছন্দমতো দুর্বল কাউকে শাসক হিসেবে বসিয়ে তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ নেবেন। কিন্তু দেশটা যে লিবিয়া, সৌদি আরব বা আরব আমিরশাহী নয়, তা এতদিনে বোধ হয় তাঁরা টের পেয়েছেন। তাই মরিয়া হয়ে প্রকারান্তরে পরমাণু বোমা ফেলার হুমকি দিচ্ছেন। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন— ‘A whole civilization will die today’ (একটি সমগ্র সভ্যতা ধ্বংস হবে আজ)। কিন্তু কী আশ্চর্য, ২৪ ঘন্টার মধ্যে তিনি নিজেই ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন। এই ভয়াবহ যুদ্ধে বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি তো হয়েছেই, পাশাপাশি নিহত এবং আহত হয়েছেন বহু সাধারণ মানুষ। এমনকী ইরানের শিশুদের একটা স্কুলে মিসাইল ছুঁড়ে দুই শতাধিক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এমতাবস্থায় প্রাণে বাঁচার জন্য তেল আভিভ-সহ বড় শহরের ইজরায়েলের মানুষ সাইরেন বাজলেই ঢুকে পড়ছেন বাঙ্কারে। বহু মানুষ, যাঁদের সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা দেশ ছাড়ছেন। কিন্তু ইরানিরা? মোল্লাতন্ত্রে পিষ্ট একজন স্বাধীনতাকামী মানুষও সম্ভবত দেশত্যাগ করেননি। এমনকী যেদিন ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, ইরানি সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন সেদিনও ইরানের সমস্ত মানুষ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও মসজিদের পাশে সারারাত জেগে ছিলেন।

আর ইরানের নির্বাসিত চলচ্চিত্রনির্মাতা জাফর পানাহি? গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে গত ৩১ মার্চ যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বদেশে ফিরলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই চলচ্চিত্র-পরিচালক।


এত দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ থাকা সত্ত্বেও এই অসম যুদ্ধে ইরান কীভাবে আমেরিকা-ইজরায়েলের মতো পরাক্রমশালী দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে মোকাবিলা করছে তা জানার জন্য আমাদের জাফর পানাহিকে বিশেষভাবে জানা প্রয়োজন। কারণ জাফর পানাহিই আসলে ইরান। কীভাবে ?

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রপরিচালক জাফর পানাহির (জন্ম: ১৯৬০) চলচ্চিত্রজীবন কোনোভাবেই মসৃণ ছিল না। পানাহির জীবন শুরু হয়েছিল ক্যামেরা নিয়ে নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে। ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধে বাধ্য হয়ে আর পাঁচজনের মতো তাঁকেও অংশ নিতে হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি ইরান ব্রডকাস্টিং স্কুলে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে শিক্ষালাভ করেন। নিজে কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমাও বানান। এরপর ১৯৯৪ সাল নাগাদ বিশিষ্ট চলচ্চিত্রনির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘থ্রু দি অলিভ ট্রিজ’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।

জাফর পানাহির প্রথম ছবি ‘দি হোয়াইট বেলুন’ (১৯৯৫) দেশের মাটিতে মুক্তি পায়নি ঠিকই, কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্রেই তিনি আন্তর্জাতিকস্তরে ব্যাপক পরিচিতি পান। ১৯৯৭ সালে পানাহি পরিচালিত ‘দি মিরর’ চলচ্চিত্রটিও বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। ২০০০ সালে মুক্তি পায় ‘দি সার্কল’। এই ছবিটির বিষয়: ইরানে নারীর শোচনীয় অবস্থান। খুব স্বাভাবিকভাবেই খোমেইনিশাসিত ইরানে সিনেমাটি নিষিদ্ধ হয়। সার্কল অর্থাৎ স্কুল, কলেজ, বাজার, জমায়েত— সর্বত্র মেয়েদের ওপর কঠোর দৃষ্টি রাখছে মর‍্যাল মোল্লা পুলিশ। কেন না শাসকের চোখে মেয়েদের স্বাধীনতা শুধু অবাঞ্ছিত নয়, বেআইনি। এজন্যই মায়দে, আর্জু, পারি, নার্গিস– সবার স্থান হয় কারাগারে।

জাফরের পরের ছবি ‘ক্রিমসন গোল্ড’। ছবিটি একজন পিৎজা শ্রমিকের জীবন নিয়ে নির্মিত। এই ছবিটির চিত্রনাট্য পানাহি নিজে ​লেখেননি৷ লিখেছেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। এই সিনেমায় হুসেন পিৎজা প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক। হুসেনের স্বপ্ন ছিল, ক্রিসমাসে স্ত্রীকে দামি গয়না কিনে দেবেন, কিন্তু যথেষ্ট টাকা উপার্জন করতে না পারার কারণে হতাশায় ওই গয়নার দোকানে আত্মহত্যা করেন। আসলে হুসেনকেও বাধ্যতামূলকভাবে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিতে হয়েছিল। যুদ্ধের বীভৎস রূপ কাছে থেকে দেখে তিনি ট্রমায় চলে যান। এই ট্রমা থেকে পরবর্তীকালে তিনি আর বের হতে পারেননি।

অপরপক্ষে ‘দি মিরর’ ছবিটিও বেশ অদ্ভুত। ৭ বছরের মিনা হল এই সিনেমার প্রধান চরিত্র। স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে কিন্তু মা আসছেন না দেখে ছোট্ট মিনা নিজেই বাড়ি ফেরার উদ্যোগ নেয়। প্লাস্টারবাঁধা হাত নিয়ে সে নানান উপায় অবলম্বন করে বাড়ি ফিরতে থাকে। কিন্তু ফেরার সময় সে লক্ষ করে তার প্রতি মানুষদের চূড়ান্ত নির্লিপ্ত ও উদাসীন মনোভাব। একটা সময় পরে সে রেগে গিয়ে নিজের হাতের প্লাস্টার টেনে খুলে দেয়। এবং ঘোষণা করে, এই ছবিতে সে আর অভিনয় করবে না। কারণ সে স্বাধীন, পরিচালকের অভিভাবকত্ব মানবে না। তারপর সে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। ক্যামেরা ক্রমশ অনুসরণ করতে থাকে মিনাকে।

‘দি হোয়াইট বেলুন’ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রও ৭ বছরের ইরানিয়ান বালিকা রাজিয়া। সেও মাছ কেনার জন্য বায়না করে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মাছের দোকানের দিকে দৌড়য়, কিন্তু পথিমধ্যে একটা নালার ভিতর টাকাটা পড়ে যায় ।‌ এখানে সেও লক্ষ করে পথচলতি মানুষের নির্লিপ্ত এবং নীতিবাগীশ মনোভাব।

শেষে আমরা দেখি, এক আফগান শরণার্থী বেলুনওয়ালা বালকের সাহায্যে রাজিয়া নালা থেকে টাকাটা উদ্ধার করছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, টাকা পাওয়ামাত্র দেখা যায়, রাজিয়া আর তার দাদা দৌড়োচ্ছে মাছের দোকানের দিকে। পেছনে একা পড়ে রয়েছে সেই আফগান বালক। খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসে, কে এই বালক? কেনই-বা সে আফগানিস্তান ছেড়ে এই তেহরানে? এই শরণার্থী বালক এরপর যাবে কোথায় ?
জাফর পানাহির চলচ্চিত্রের একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য, পরিচালক নিজে কোনোদিন সিদ্ধান্ত দর্শকদের উপর আরোপ করেন না।

পানাহির প্রথম চলচ্চিত্রটি ১৯৯৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘কামেরা দর’ সম্মানে ভূষিত হয়, যা কোনো ইরানি চলচ্চিত্রের জন্য কান থেকে প্রাপ্ত প্রথম প্রধান পুরস্কার। পানাহি অচিরেই ইরানের প্রভাবশালী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন হয়ে ওঠেন, কিন্তু, তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নিজের দেশেই নিষিদ্ধ হতে থাকে। তবে তাঁর জয়যাত্রাকে কোনোভাবেই আটকানো যায়নি। চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য তিনি অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন৷ এগুলোর মধ্যে দায়েরা (চক্র, ২০০০) চলচ্চিত্রের জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন, ট্যাক্সি (২০১৫) চলচ্চিত্রের জন্য বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণভল্লুক এবং ‘ইয়েক তাসাদেফ সাদেহ’-র জন্য ‘পাল্ম দর’ লাভ করেন। তার ফলে তিনি অঁরি-জর্জ ক্লুজো, মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি ও রবার্ট অল্টম্যানের পরে হলেন চতুর্থ চলচ্চিত্রনির্মাতা যিনি বড় তিন চলচ্চিত্র উৎসবের শীর্ষ পুরস্কার অর্জন করেছেন। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার ।

বিশ্বজুড়ে খ্যাতি কিন্তু ইরানি এই নির্মাতার সঙ্গে মোল্লাদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। পানাহিকে জেল এবং ২০ বছর সিনেমা বানাতে পারবেন না, এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু পানাহি তারপরও সংগোপনে সিনেমা বানিয়েছেন। এবং সেই সিনেমা একটা মাইক্রো চিপসে রেকর্ড করে সেটাকে সাবানের ভেতরে ঢুকিয়ে ইউরোপে এক শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছে পাঠান, তারপর সেই সিনেমা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু একটা সময়ের পর পানাহির পক্ষে দেশে থাকা আর সম্ভব হয়নি, তিনি দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু ইজরাইল ও আমেরিকার পারমাণবিক বোমা হামলার ক্রমাগত হুমকির মুখেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব তাঁকে নিষেধ করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এইরকম যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি, তার উপরে দেশে ঢোকামাত্র তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন। কিন্তু পানাহি কর্ণপাত করেননি। স্থলপথে সীমান্ত দিয়ে তিনি যখন দেশে প্রবেশ করছেন তখন অজস্র মানুষ তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। আশ্চর্যের বিষয়, ইরান সরকারও পানাহির বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। পানাহিকে প্রশ্ন করা হয়েছে, কেন যুদ্ধের মাঝে মোল্লাদের দেশে ফিরলেন? পানাহির উত্তর, ‘শাসকদের সঙ্গে আমার বিরোধ রয়েছে, কিন্তু দেশের মানুষের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই!’ তিনি আরও বলেছেন : ‘আমার দেশ ধ্বংস করছে, আমার দেশের মানুষকে হত্যা করছে। এইরকম সময়ে আমি তাঁদের সঙ্গেই থাকব, এক সঙ্গেই মরব।’

পানাহি একা নন, পানাহির মতো ইরানে ছড়িয়ে আছেন অসংখ্য পানাহি। তাই পানাহির স্পিরিটই হল ইরানের স্পিরিট। ৭ হাজার বছর পুরোনো একটা সভ্যতার স্পিরিট। সুপার পাওয়ার তা যতই বিধ্বংসী হোক, একটা সভ্যতার লেগ্যাসি ও স্পিরিট ধ্বংস করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেও খুব সহজে পারবে বলে মনে হয় না।‌