হিংসার পুনরাবৃত্তি

পশ্চিমবঙ্গ আবার এক অস্বস্তিকর, আতঙ্কজনক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। নির্বাচন শেষ, ফল প্রকাশিত— তবু শান্তি নেই। বরং ভোট-পরবর্তী হিংসার সেই পুরনো, অন্ধকার চিত্র যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহায়ক চন্দ্রনাথ রথের বারাসতে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে খুনের ঘটনা নিঃসন্দেহে পরিস্থিতিকে আরও গভীরভাবে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ নয়, এটি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উপর সরাসরি আঘাত।ভোট-পরবর্তী হিংসা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। গত দেড় দশকে এই রাজ্য একাধিকবার দেখেছে কীভাবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর শুরু হয় প্রতিশোধের রাজনীতি। শাসক-বিরোধী নির্বিশেষে, সাধারণ কর্মী থেকে সমর্থক— অনেকেই এই হিংসার বলি হয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত বছরের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও কেন এই প্রবণতা রোধ করা যাচ্ছে না?

এইবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজ্যের নানা প্রান্ত— ক্যানিং, খড়্গপুর, বসিরহাট— সব জায়গা থেকেই অশান্তির খবর উঠে এসেছে। কোথাও পঞ্চায়েত দখলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, কোথাও বিরোধী দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর, কোথাও আবার দলীয় পতাকা খুলে দখল নেওয়ার অভিযোগ। ক্যানিংয়ের মাখালতলায় পুলিশের উপর হামলা এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের মতো ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই প্রমাণ করে। বসিরহাটে এক বিজেপি কর্মীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও এই অশান্তির চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।


এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। বিজেপি অভিযোগ করছে, তৃণমূল কংগ্রেসের ‘গুন্ডা বাহিনী’ এই হিংসার নেপথ্যে। অন্যদিকে, তৃণমূলের পক্ষ থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া না এলেও, অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠছে— রাতারাতি দলবদল করে কেউ কেউ নতুন দলের নাম ব্যবহার করে অশান্তি ছড়াচ্ছে। এই ‘স্বঘোষিত’ কর্মীদের দায় কে নেবে? রাজনৈতিক দলগুলি কি নিজেদের দায় এড়াতে এই যুক্তি ব্যবহার করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে— রাজনীতির ক্রমবর্ধমান দুর্বৃত্তায়ন। যখন দলীয় স্বার্থে পেশিশক্তি ব্যবহারকে নীরবে মেনে নেওয়া হয়, তখনই এই ধরনের হিংসার বীজ বপন হয়।

নির্বাচনের সময় এই শক্তিকে ব্যবহার করা হয়, আর ফল প্রকাশের পর তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে, যে কোনও রাজনৈতিক পালাবদলের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়ে পড়ে।প্রশাসনের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে, ২০০টিরও বেশি এফআইআর দায়ের হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন ৪৩৩ জন এবং সতর্কতামূলকভাবে আটক করা হয়েছে প্রায় ১১০০ জনকে। পুলিশ প্রধান সিদ্ধনাথ গুপ্ত রাজ্যবাসীকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ‘জেসিবি উদ্‌যাপন’ বা বুলডোজার প্রদর্শনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কারণ, ভয় প্রদর্শনের রাজনীতি গণতন্ত্রের পরিপন্থী।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এই পদক্ষেপগুলি কতটা কার্যকর হবে? কেবল গ্রেফতার বা নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই কি সমস্যার মূল সমাধান সম্ভব? বাস্তবে দেখা যায়, এই ধরনের পদক্ষেপ অনেক সময় সাময়িক শান্তি আনলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করতে পারে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা— যেখানে অপরাধীকে তার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতে বিচার করা হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই হিংসার মধ্যে সাধারণ মানুষ ক্রমশ আস্থা হারাচ্ছেন। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হল মানুষের নিরাপত্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু যদি ভোট দেওয়ার পরেই মানুষ আতঙ্কে দিন কাটান, যদি রাজনৈতিক মতভেদ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তবে সেই গণতন্ত্র কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ড এই বৃহত্তর সংকটের প্রতীক। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ, যা রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন সর্বস্তরের সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ।

রাজনৈতিক দলগুলির উচিত, প্রকাশ্যে এবং কার্যত, দুই ক্ষেত্রেই হিংসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। প্রশাসনের উচিত, নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। আর নাগরিক সমাজের দায়িত্ব, এই হিংসার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি একসময় বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার জন্য পরিচিত ছিল। সেই ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করা আজ সবচেয়ে জরুরি। কারণ রক্তের উপর দাঁড়িয়ে কোনও গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না