‘ধর্ম রক্ষতি রক্ষিত’

প্রতীকী চিত্র

হীরক কর

চলে গেল ১২ সেপ্টেম্বর। ‘র’-এর জন্মদিন। না, আমি বিদ্যাসাগর মশাইয়ের লেখা বর্ণপরিচয়ের বর্ণ ‘র’-এর কথা বলছি না। বলছি, ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ (RAW)-এর কথা।

গুপ্তচর শব্দটির সমাস করলে হয় গুপ্ত যে চর; অর্থাৎ- যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে। প্রাচীন গ্রিস ও রোম এবং ভারতবর্ষের শাসকগোষ্ঠীর রাজ্য পরিচালনার কাজে এই চরদের সাহায্য নেওয়ার অনেক নজির পাওয়া যায়। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ বলুন, সান জু-র ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ অথবা বেদব্যাসের ‘মহাভারত’- সবখানেই চর বা গুপ্তচর শব্দটির উল্লেখ বারবার এসেছে। অর্থশাস্ত্রে এভাবে বলা হয়েছে-
‘রাজ্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য রাজাকে গুপ্তচর বা গোয়েন্দা বিভাগের সাহায্য নিতে হবে। শক্তিশালী প্রতিবেশীকে প্রতিহত করতে দুর্বল রাজ্য সর্বদা ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যার তথ্য যোগাবে অনুগত চরগণ।”


বর্তমানে পৃথিবীতে প্রত্যেকটি দেশেরই গোয়েন্দা বিভাগ বা সংস্থা রয়েছে। আমেরিকার আছে ‘সিআইএ’, রাশিয়ার ‘কেজিবি’, ব্রিটিশদের ‘এমআই-৬’, ইসরাইলের ‘মোসাদ’, ভারতের ‘র’, পাকিস্তানের ‘আইএসআই’, ফ্রান্সের ‘ডিজিএসই’, অস্ট্রেলিয়ার ‘এএসআইএস’ ইত্যাদি। ‘সিআইএ’ এবং ‘মোসাদ’কে বলা হয় সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা। এদের অনেক গোপন মিশনের ব্যাপারে পৃথিবীবাসী এখন ওয়াকিবহাল।

‘র’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর। সংস্থার প্রথম প্রধান হিসাবে নিযুক্ত হন রামেশ্বর নাথ কাও আর শঙ্করণ নায়ার হন তার দু-নম্বর অফিসার। এই দুজন ছাড়াও ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো বা আইবি থেকে ২৫০ জনকে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ে বদলি করা হয়। পরে, ১৯৭১ সাল থেকে রামনাথ কাও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি ‘র’ এজেন্ট বেছে নেওয়ার প্রথা শুরু করেন। ফলে ‘র’-এ কর্মরত অনেকের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুরা সেখানে চাকরি পেয়ে যান । আর তখন মজা করে সংস্থাটিকে ‘রিলেটেড অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ বলা হত।

কিন্তু ১৯৭৩ সালের পর ওই সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়া বদলে যায়। শুরু হয় সরাসরি নিযুক্ত কর্মকর্তাদের এক কঠিন প্রতিযোগিতা। তাদের বেশ কয়েকটি পরীক্ষা পার করতে হয়। নীতিন গোখলে তাঁর ‘আরএন কাও, জেন্টলম্যানস্ স্পাইমাস্টার’ বইয়ে লিখেছেন, ‘প্রথমটি হত মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। পরীক্ষার্থীদের ভোর তিনটের মধ্যে একটি জায়গায় আসতে বলা হত। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের অবজেক্টিভ টাইপ টেস্ট দেওয়া হত। যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেন, তাদের ইন্টারভিউ নেওয়া হত। ওই ইন্টারভিউ নিতেন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এক অফিসার।’

র-এর প্রথম সেক্রেটারি ছিলেন রমেশ্বর নাথ কাও। যিনি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছে ‘রামজি’ এবং জুনিয়র কলিগদের কাছে ‘স্যার’ বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ‘র’-এর প্রতিষ্ঠাতা। কাওকে ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর বাবা জওহরলাল নেহরু ভালোভাবে চিনতেন। পেশাগত সততার ব্যাপারে অবহিত ছিলেন বলে তাকে এই সম্মানজনক পদের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে আরো কারণ ছিল। তিনি ‘আইবি’র বৈদেশিক গোয়েন্দা শাখার প্রধান ছিলেন এবং ‘ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব সিকিউরিটির’ (ডিজিএস) প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। আর এই ‘ডিজিএস’ সৃষ্টি করা হয়েছিল আমেরিকা ও ব্রিটেনের সহায়তায় সংঘটিত ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর। ওই যুদ্ধে ভারতীয় গোয়েন্দাদের মধ্যে দক্ষতার যে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল সেটা পূরণ করার জন্যই সৃষ্টি করা হয় ‘রিসার্চ অ্যান্ড এনালাইসিস উইং’ যাকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘আরঅ্যান্ডএডব্লিউ’ বা ‘র’।

সংস্থাটি কোনো তথ্য প্রকাশ করে না। অনেকের সন্দেহ ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অনেক নীতিনির্ধারকও ‘র’-এর প্রকৃত তৎপরতা সম্পর্কে জানেন না। ভারতীয় জনগণ তো নয়ই। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এর বার্ষিক বাজেট গোপন রাখা হয়েছে। এমনকি সংসদেও সংস্থাটির আয়-ব্যয় নিয়ে কোনো আলোচনা করা যায় না। অবশ্য সংস্থাটি সম্পর্কে জানার ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে ভারতের জনগণের মধ্যে।

‘র’-এর উদ্দেশ্য প্রতিবেশী দেশে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
‘র’ পার্শ্ববর্তী সব দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাবলি ও অবস্থান যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতিতে যার প্রভাব অবশ্যম্ভাবী সেদিকে লক্ষ্য রাখে। সংস্থাটি পাশের দেশগুলোতে ভারতের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এসব অঞ্চলে প্রকাশ্য বা পরোক্ষ কোনোরূপ ভারতবিরোধী সম্ভাবনা সৃষ্টির সুযোগ দিতে চায় না। এ জন্য সংস্থাটি পণ্ডিত নেহরুর ‘অখণ্ড ভারতমাতা’র কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে। ভারত মহাসাগরসহ সমগ্র উপমহাদেশে ভারতীয় সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে কাজ করছে।

ওই ১৯৭৩ সালে ‘র’-তে যাদের নিয়োগ হয়েছিল, তাঁদেরই একজন জয়দেব রানাডে অতিরিক্ত সচিব হিসাবে অবসর নেন। তিনি বলছিলেন, ‘পরের রাউন্ডে ‘র’-এর সিনিয়র কর্মকর্তা এনএন সন্তুক এবং শঙ্করণ নায়ার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। এই পর্যায়টি পাশ করার পরে আমরা মুখোমুখি হই পররাষ্ট্র সচিব, র-এর প্রধান আর এন কাও এবং একজন মনোবিজ্ঞানী সহ ছয় সদস্যের বোর্ডের। আমার সাক্ষাৎকার চলেছিল ৪৫ মিনিট।’
মি. রানাডে দুমাস পরে জানতে পারেন যে তিনি ‘র’-এ চাকরির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে প্রতাপ হেবলিকর, চক্রু সিনহা ও বিধান রাওয়ালও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

‘র’-এর বিশেষ সচিব পদ থেকে অবসর নেওয়া রানা ব্যানার্জি বলছিলেন, ‘১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে এরকম আরও কয়েকজনকে নেওয়া হয়েছিল, ‘র’-যাঁদের নিয়ে স্পেশাল সার্ভিস গঠন করে। পরে অজ্ঞাত কারণে এভাবে নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।’ এখন ৯৫ শতাংশেরও বেশি কর্মী ভারতীয় পুলিশ সেবা বা আইপিএস থেকে নির্বাচিত হন এবং অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজের জন্য কিছু কর্মকর্তাকে কাস্টমস এবং আয়কর বিভাগ থেকে নেওয়া হয়।

‘৬৫-এর যুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন সেনাপ্রধানের একটি মন্তব্য আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় কাজ করে। ভদ্রলোক স্বয়ং বলে বসেন, ‘প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সহজলভ্য নয়’। এ বক্তব্য পুরো প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। তার মন্তব্যের ওপর ভিত্তি করে দুই সদস্যের একটি কমিশন গঠন করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী সরকার প্রতিরক্ষা সচিব পি ভি আর রাও এবং স্বরাষ্ট্র সচিব এল পি সিংয়ের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করে।

কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়, আইবির সফলতা ও ব্যর্থতার আলোকে নতুন সংস্থা গঠনের ও পরিচালনার একটি রিপোর্ট পেশ করতে। আইবির পাশাপাশি পৃথক একটি গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত যখন বাস্তব রূপ লাভ করে, তখন স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একে অপরের ওপর দায় চাপানো শুরু করে। সংস্থাটি কার অধীনে থাকবে, এ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কমিশন শঙ্কর নায়ারকে তলব করে নিয়ে আসে। তিনি ছিলেন আইবির পাকিস্তান বিশেষজ্ঞ। তাকে ৬০টির অধিক গোয়েন্দা রিপোর্ট সঠিকভাবে সংকলন ও সন্নিবেশ করতে বলা হয়। কমিশন এক পর্যায়ে তাদের রিপোর্ট পেশ করে। সেখানে বলা হয়,“আনীত অভিযোগগুলো ব্যাপক অর্থে সঠিক নয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের কাজ ঠিকমতো করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রধান সমস্যা হলো- ‘গোয়েন্দা তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে না’।”

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সামনাসামনি প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে অপরকে দোষারোপ করলেও গোপনে দু’পক্ষই প্রধানমন্ত্রীর দফতরে তদবির চালাচ্ছিল, যাতে নবগঠিত সংস্থাকে তাঁর অধীনে রাখা হয়।
নতুন গোয়েন্দা সংস্থার গঠন যখন নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন বারবার আলোচনায় আসে- সংস্থাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে নাকি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের। প্রাথমিক পর্যায়ে একে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেনাবাহিনীর আওতায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই লক্ষ্যকে আরো সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য জেনারেল চৌধুরী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ওয়াই বি চ্যবনের তত্ত্বাবধানে ব্রিগেডিয়ার এম এন ভদ্রের পেশকৃত একটি রিপোর্টের পর্যালোচনা করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের সুপারিশ করা হয়।
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মন কষাকষি আরো চরমে পৌঁছায়। দুই মন্ত্রণালয়ই নিজেদের নতুন সংস্থার দাবিদার বলতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটান। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নবগঠিত সংস্থা থাকবে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে।

সংসদকেও এটি জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। নবগঠিত বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার স্থপতি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর মুখ্যসচিব পি এন হাকসার। তারা উভয়েই উদ্ভূত পরিস্থিতির জটিলতা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। নবগঠিত গোয়েন্দা সংস্থা নিয়ে জনগণের মাঝেও কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
‘র’ এর সহযোগী সংস্থা:
‘দ্য এভিয়েশন রিসার্স সেন্টার’,
‘দ্য রেডিও রিসার্চ সেন্টার’,
‘ইলেকট্রনিক ও টেকনিক্যাল সার্ভিসেস’, ‘ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ফেসিলিটিস অর্গানাইজেশন’, ‘স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স’৷
এরা তথ্যের জন্য দূতাবাসের ছদ্মাবরণ ব্যবহার করে।

বিদেশে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য সংস্থাটি ভারতীয় দূতাবাসের ছদ্মাবরণ ও কূটনৈতিক সুবিধাকে কাজে লাগায়। যাকে দিয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয় তিনি সরকারি কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মকর্তা হলেও তাকে ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা বলা হয়। এসব কর্মকর্তা হতে পারেন রাষ্ট্রদূত, অ্যাটাশে (সামরিক, নৌ, বিমান), সিভিল এভিয়েশন, বাণিজ্যিক, পেট্রোলিয়াম অথবা কৃষিসহ যেকোনো ক্ষেত্রে কর্মরত। এমনকি দূতাবাসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। কেন্দ্রে তথ্য পাঠানোর জন্য সংস্থাটি ভারতীয় দূতাবাসের এন্টেনার সহায়তা নেয় । এ ছাড়া একজন ছাত্র, সাধারণ গৃহবধু, পর্যটক, সাংবাদিক, বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী অথবা একজন শিল্পীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দানের পর পার্শ্ববর্তী দেশে বিশেষ সময়ে বা স্থায়ীভাবে পাঠায় এই ‘র’। সীমান্তে বিএসএফ’র সঙ্গে মিলিতভাবে গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করে। টার্গেট দেশের প্রতিভাবান তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের আড়ালে ভারতীয় চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটানোয় তৎপর সংস্থাটি।

সীমান্তবাসীদের দেয় বিশেষ প্রশিক্ষণ। সংস্থাটি ‘বিশেষ কার্যক্রম বিভাগের’ অপারেটিভদের মাধ্যমে ভারতের সীমান্তবাসীদের ছোটখাটো যুদ্ধাস্ত্র ও যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়। যাতে কোনো দেশ ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে নিজেদের রক্ষা করতে সমর্থ হয়। এবং অপারেটরদের সাথে সীমান্ত অতিক্রম করে শত্রুর পশ্চাতে সক্রিয় থাকতে পারে। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নতাবাদী ও নাশকতামূলক কাজে টার্গেট দেশের এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও প্রয়োজনে নিজ অপারেটিভদের কাজে লাগানো ‘র’-এর অন্যতম কাজ।

‘র’-এর উল্লেখযোগ্য অপারেশন হল, চিনের বিরুদ্ধে সিআইএ’র সঙ্গে হিমালয়ে ইএলআইএনটি অপারেশন (১৯৬৪)। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯৭১)। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা। অপারেশন স্মাইলিং বুদ্ধ (১৯৭৪)। সিকিম একত্রীকরণ। পাকিস্তানের প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রের ব্লুপ্রিন্ট সংগ্রহ। কণিষ্ক বোম্বিং কেস (১৯৮৫) ও বাংলাদেশে অপারেশন ক্যাকটাস (১৯৮৮)। শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এলটিটিইকে প্রশিক্ষণ প্রদান। কাশ্মীরে অপারেশন চানাকিয়া। পাকিস্তানে বিভিন্ন সহিংসতায় মদতদান। কারগিল যুদ্ধ (১৯৯৯)।

আফগানিস্তানে মিলিটারি হাসপাতাল পরিচালনা। মায়ানমারে অপারেশন লিচ। ওসামা বিন লাদেনসহ তালিবানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণ।

আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে রয়েছে র-এর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সামরিক সহায়তার জন্য আমেরিকার সঙ্গে ভারতের চুক্তিও রয়েছে। পারমাণবিক বোমার শক্তিধর দেশ ভারত আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা করছে। স্বপ্ন দেখছে ইউনাইটেড ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠার। এগিয়েছেও অনেক দূর। সিকিম এখন ভারতের অঙ্গরাজ্য।
রামেশ্বর নাথ কাও, যিনি আরএন কাও নামে পরিচিত, তিনি ছিলেন ভারতের বহিরাগত গোয়েন্দা সংস্থা, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW)-এর প্রতিষ্ঠাতা। RAW এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থায় তাঁর অসাধারণ অবদান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভূদৃশ্যকে রূপ দিয়েছে। ১৯১৮ সালে বেনারসে জন্মগ্রহণকারী আরএন কাও এক সমৃদ্ধ কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৩৯ সালে ভারতীয় ইম্পেরিয়াল পুলিশে যোগদান করেন এবং পরে গোয়েন্দা ব্যুরোর অংশ হন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় কাওর গোয়েন্দা বিভাগে ভবিষ্যতের প্রচেষ্টার ভিত্তি স্থাপন করে।

আরএন কাও-এর নেতৃত্বে, ‘র’ দ্রুত একটি পেশাদার গোয়েন্দা সংস্থায় রূপান্তরিত হয়। সূক্ষ্ম পরিকল্পনা এবং হাতে-কলমে নির্বাচিত অপারেটিভ এবং বিশ্লেষকদের একটি দলের সাহায্যে, কাও একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। “কাওবয়” নামে পরিচিত তাঁর এজেন্টরা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বুদ্ধিমত্তার বাইরেও, আরএন কাও ছিলেন বৈচিত্র্যময় প্রতিভার অধিকারী। তিনি একজন দক্ষ ভাস্কর ছিলেন, ঘোড়ার ভাস্কর্যের জন্য পরিচিত, যা বন্যপ্রাণীর প্রতি তাঁর আবেগকে প্রতিফলিত করে। কাওর কাছে গান্ধার চিত্রকলার একটি চমৎকার সংগ্রহও ছিল। যা শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর উপলব্ধি প্রদর্শন করে। ভারতীয় গোয়েন্দাদের জনক কাও সাহেবকে প্রণাম।

বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর আসে নাম খোঁজার পালা। ধারণা করা হয়, ক্যাবিনেট সচিবের দেওয়া নামের তালিকা থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ‘র’ নামটি পছন্দ করেন।
শুরুতে এর নাম ছিল R&AW। পরে সাংবাদিকরা একে RAW বলে প্রচার করতে থাকে। ‘আরএন্ডএডব্লিউ’-কে ‘র’ বললে কাও সাহেব খুব রেগে যেতেন। যদিও ‘র’ এর শ্লোগান করা হয়-‘ধর্ম রক্ষতি রক্ষিত’। এর অর্থ, ‘ধর্মকে রক্ষা করলে ধর্মও রক্ষা করে’।