ভারত ও শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর যোগাযোগ। ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই দেশের সম্পর্ক যত বেশি মজবুত হবে, ততই উপকৃত হবে গোটা অঞ্চল। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সাম্প্রতিক আশ্বাস এবং ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের শ্রীলঙ্কা সফর সেই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগের মধ্যেই শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থের পরিপন্থী কোনও কর্মকাণ্ডের জন্য শ্রীলঙ্কার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে এমন আশ্বাস স্বাভাবিকভাবেই ভারতের উদ্বেগ অনেকটাই কমাতে পারে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার জলসীমার কাছাকাছি অতীতে চিনা গবেষণা ও নজরদারি জাহাজের উপস্থিতি নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ ছিল। ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে এই সম্পর্ককে কোনও তৃতীয় দেশের বিরোধিতার কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। ভারত-শ্রীলঙ্কা সহযোগিতার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং অভিন্ন স্বার্থ। ভারত যেমন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন, তেমনই শ্রীলঙ্কার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করবে।
রাজনাথ সিংয়ের সফরের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বিপদের সময় ভারত যে শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়ায়, তার পুনরায় প্রকাশ। ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়াহের সময় ‘অপারেশন সাগর বন্ধু’-র মাধ্যমে ভারত যে ত্রাণ ও সহায়তা দিয়েছে, তার জন্য শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি দ্বীপদেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্য ভারতের দেওয়া ব্যাপক সহায়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। রাজনাথ সিং যথার্থই বলেছেন, শ্রীলঙ্কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রতিবেশী হিসেবে বিপদের সময় সাহায্য করা ভারতের কাছে কোনও ‘অনুগ্রহ’ নয়, বরং দায়িত্ব। এই মানসিকতাই প্রতিবেশী সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি।
তিনটি বেইলি সেতু ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহযোগিতায় নির্মিত হয়ে দুই দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে উদ্বোধন হওয়াও প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যে শুধু অস্ত্র বা সামরিক প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও পরিকাঠামোর উন্নয়নেও তার ভূমিকা থাকতে পারে— এই উদ্যোগ তারই উদাহরণ।
শ্রীলঙ্কার বিমানবাহিনীর ছয়টি এল-৭০ বিমান প্রতিরক্ষা বন্দুক আধুনিকীকরণের জন্য সমঝোতাপত্রও দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ভারত সরকারের অনুদানের আওতায় এই কাজ সম্পন্ন হবে। এর ফলে শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (এনসিসি) এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের মধ্যে সহযোগিতার সমঝোতাও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামরিক ও কৌশলগত বোঝাপড়া বাড়াতে সাহায্য করবে।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথ এবং অবাধ নৌচলাচল অত্যন্ত জরুরি। রাজনাথ সিংয়ের এই বক্তব্যের গুরুত্ব তাই যথেষ্ট। বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বড় অংশই সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত। এই সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখা কোনও একটি দেশের দায়িত্ব নয়; সংশ্লিষ্ট সব দেশের সম্মিলিত দায়িত্ব।
ভারত ও শ্রীলঙ্কার সম্পর্কের সামনে তাই সম্ভাবনার ক্ষেত্র অনেক। দুর্যোগ মোকাবিলা, প্রতিরক্ষা, সমুদ্র নিরাপত্তা, পরিকাঠামো, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সহযোগিতা আরও বাড়ানো সম্ভব। আস্থার যে বার্তা কলম্বো থেকে এসেছে, তাকে কাজে পরিণত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক
PIC-X
প্রতিবেশীকে শক্তিশালী করে নিজেও শক্তিশালী হওয়া— ভারতের ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতির মূল কথাই এটি। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও গভীর হলে শুধু দুই দেশ নয়, সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলই আরও নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।