অস্তিত্বের সঙ্কটে আঞ্চলিক দল, এগোচ্ছে বিজেপি

Image: File Photo

গত এক দশকে বিজেপির উত্থান চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক কৌশল ভারতের রাজনীতিকে এক বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, আগামী দিনে কি আঞ্চলিক দলগুলির গুরুত্ব আগের মতো থাকবে? গত এক দশক ধরে বিভিন্ন রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক কৌশল দেখে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, দেশের রাজনীতি ক্রমশ দ্বিমুখী বা এককেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।

বর্তমানে ২৮টি রাজ্যের মধ্যে বিজেপি সরাসরি বা জোটের মাধ্যমে ২১টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে বা ক্ষমতার অংশীদার। সম্প্রতি ৪ রাজ্য ও ১ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ফল প্রকাশের পর পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে মধ্য ভারত সর্বত্রই গেরুয়া রঙের আধিপত্য। উত্তরাখণ্ড, হরিয়ানা, দিল্লি, রাজস্থান, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, গোয়া বিজেপির হাতে। দেশের মানচিত্রে একমাত্র দক্ষিণ ভারতে এখনও পদ্ম ফোটেনি।

গত এক দশকে বিজেপির রাজনৈতিক বিস্তার লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দলটি শুধুমাত্র কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই লড়াই করেনি, বরং রাজ্যভিত্তিক শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলির জমিতেও তাদের প্রবেশাধিকার ঘটেছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিজেপি বা এনডিএ কোনও না কোনওভাবে ক্ষমতার অংশীদার। এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে।


বিজেপির কৌশল সাধারণত দুই রকম। যেখানে কংগ্রেস প্রধান প্রতিপক্ষ, সেখানে সরাসরি লড়াই করে সাফল্য বেশি। আর যেখানে আঞ্চলিক দল শক্তিশালী, সেখানে প্রথমে জোট, পরে নিজেদের সংগঠন মজবুত করে সেই দলকেই চ্যালেঞ্জ জানানো। উত্তরপ্রদেশ তার বড় উদাহরণ। একসময় মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি এবং মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। আজ এই রাজ্যে মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি অস্তিত্বের সঙ্কটে। বিজেপি সেখানে সব রকম সমীকরণ বদলে দিয়ে তাদের ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ভাঙন ধরিয়েছে।

ওড়িশায় দীর্ঘ ২৪ বছর ক্ষমতায় থাকা নবীন পট্টনায়েকের বিজু জনতা দলকে সরিয়ে ২০২৪ সালে প্রথমবার সরকার গড়ে বিজেপি। সেখানে বিজেপি সরাসরি সংগঠন গড়ে তুলে এবং কেন্দ্রের প্রকল্পকে হাতিয়ার করে ধীরে ধীরে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে। এই রাজ্যে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির মোহন চরণ মাঝি। ২০২৪-এর ১২ জুন থেকে তিনি এই পদে রয়েছেন।

বিহারে বিজেপির পথ ছিল জোট রাজনীতি। নীতীশ কুমারের জেডিইউ এবং রামবিলাস পাসোয়ানের রাজনৈতিক উত্তরসূরিদের সঙ্গে বারবার সমীকরণ বদল করে তারা নিজেদের জমি শক্ত করেছে। এই রাজ্যে বিজেপি নেতা সম্রাট চৌধুরী ২০২৬-এর ১৫ এপ্রিল থেকে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী পদে রয়েছেন। তিনিই এই রাজ্যে প্রথম বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী। এই রাজ্যের রাজনীতিতেও আঞ্চলিক দলগুলির স্বাধীন প্রভাব অনেকটাই কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মহারাষ্ট্রে বিজেপির কৌশল আরও স্পষ্ট। প্রথমে শিবসেনার সঙ্গে জোট, পরে দল ভাঙানোর মাধ্যমে একনাথ শিন্ডে শিবিরকে পাশে আনা। একইভাবে এনসিপিতেও ভাঙন ঘটে অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বে। এর ফলে একসময়ের দুই শক্তিশালী আঞ্চলিক দল আজ বিভক্ত, আর বিজেপি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। মহারাষ্ট্রে বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী পদে বিজেপির শীর্ষ নেতা দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ।

আসামে ২০১৫ সালে কংগ্রেসে থাকাকালীন তৎকালীন হাইকমান্ডের উপেক্ষার শিকার হয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বিজেপিতে যোগ দেন। তাঁকেও দলে টানতে বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ করে। ২০২১ বিপুল জয়ের পর তাঁকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বসায় বিজেপি।

উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপি আঞ্চলিক দলগুলিকে সঙ্গে নিয়ে নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা নেডা গড়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট দলগুলিকে এনডিএ-র অংশ করে বিজেপি প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

ঝাড়খণ্ডে এখনও পর্যন্ত বিজেপি পুরোপুরি সফল নয়। হেমন্ত সোরেনের নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী দিনে সেই রাজ্যেও নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবে বিজেপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ১০টি রাজ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ে কংগ্রেসকে হারিয়ে দ্রুত ক্ষমতা দখল করতে পেরেছে বিজেপি এবং প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। ভারতের উত্তর ও মধ্যভাগের রাজ্যগুলিতে মূলত বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে সরাসরি ক্ষমতার লড়াই চলে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও জনসমর্থন কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে বিজেপি খুব সহজেই আধিপত্য বিস্তার করেছে।

কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক দল, যেমন তৃণমূল কংগ্রেস, টিডিপি বা বিজু জনতা দলের মতো দলগুলির ক্ষেত্রে তাদের কৌশলী অবস্থান ও আধিপত্য খর্ব করতে তাদের অনেক বেশি সময় ও রাজনৈতিক শক্তি ক্ষয় করতে হয়েছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ, বিহার মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলিতে আঞ্চলিক দলগুলির শিকড় অনেক গভীরে। ফলে এই সব রাজ্যের ক্ষেত্রে বিজেপিকে আঞ্চলিক জোট বা অন্য ধরণের কৌশল গ্রহণ করতে হয়েছে।

বিজেপির সমর্থকদের দাবি, এই কৌশলের লক্ষ্য জাতপাত, পরিবারতন্ত্র এবং আঞ্চলিক স্বার্থের রাজনীতিকে দুর্বল করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তাঁদের মতে, পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি যেমন সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, ডিএমকে বা তৃণমূল কংগ্রেসের মতো দলগুলি গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। ‘নেশন ফার্স্ট’ নীতির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার পথে দেশের নিরাপত্তা ও বৃহত্তর স্বার্থের অগ্রাধিকারকে হাতিয়ার করেছে বিজেপি। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক মুনাফা, ছোট খাট জাতপাতভিত্তিক ইস্যু, বিভাজনের সমস্যা কিংবা ব্ল্যাকমেলিং-এর সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ পদ্মশিবির।

অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, আঞ্চলিক দল দুর্বল হলে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং রাজ্যভিত্তিক সমস্যাগুলি জাতীয় রাজনীতির আড়ালে চাপা পড়ে যাবে। ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন’-এর বিরোধিতার অন্যতম কারণও এটাই।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে, ২০১৪-র পর থেকে বিজেপি ধারাবাহিকভাবে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বদল ঘটিয়েছে। কোথাও সরাসরি লড়াই করে, কোথাও জোট গড়ে, কোথাও আবার প্রতিপক্ষের ভিত দুর্বল করে তারা নিজেদের বিস্তার ঘটিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ এবং ‘নেশন ফার্স্ট’ নীতি।

২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৫৪২টিতে ভোট অনুষ্টিত হয়েছিল। এই ভোটে বিজেপি একাই ২৪০ আসনে জয়লাভ করে। তবে এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ২৭২ আসন সংখ্যা পায়নি। তবে তারা ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের থেকে দ্বিগুণেরও বেশি আসন পায়। কংগ্রেস পায় ৯৯টি আসন।

আবার ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২১৬টি আসনে কংগ্রেসের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৫৪টি, অর্থাত ৭১ শতাংশ জয় পেয়েছিল। কংগ্রেস পেয়েছিল ৬২টি আসন, অর্থাত ২৯ শতাংশ। সেই ফল দেখিয়ে দলটির দাবি, জাতীয় স্তরে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়েছে।

সম্প্রতি ঝাড়খণ্ড রাজ্যসভা নির্বাচন এবং শিবসেনা ইউবিটি-তেও বড় ধরণের রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। ঝাড়খণ্ডে রাজ্যসভার দুটি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ইন্ডিয়া জোটের অভ্যন্তরীণ ক্রস ভোটিংয়ের সুযোগ নিয়ে এনডিএ সমর্থিত নির্দল প্রার্থী পরিমল নাথওয়ান ২৮টি ভোট পেয়ে অপ্রত্যাশিত জয় পান। জোটের শরিক দল, যেমন আরজেডি এবং সিপিআইয়ের বিধায়কদের একাংশের ক্রস ভোটিংয়ের ফলেই এই জয় সম্ভব হয়। এনডিএ শিবির এই ঘটনাকে নিজেদের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে কংগ্রেস এই ফলাফলকে বিরোধী জোটের মধ্যে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে উল্লেখ করেছে।

অন্যদিকে উদ্ধব ঠাকরের দল শিবসেনাতেও বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। শিবসেনার ৬ জন বিদ্রোহী সাংসদ দিল্লিতে দলের প্রধান উদ্ধব ঠাকরের ডাকা গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় দলের বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন। জল্পনা, এবার দলের ৬ জন বিদোহী সাংসদ উদ্ধবের হাত ছেড়ে রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শাসকদল শিবসেনায় যোগ দিতে চলেছেন। উদ্ধব শিবিরের এই অন্তর্দ্বন্দ্বকে বিজেপি তাদের রাজনৈতিক কৌশলগত জয় হিসেবে দেখছে, যা বিরোধী জোটকে জাতীয় স্তরের আরও দুর্বল করেছে। আর এর পরোক্ষ রাজনৈতিক সুবিধে পাচ্ছে বিজেপি। এই পরিস্থিতিতে সত্যিই কংগ্রেসমুক্ত ভারত এবং আঞ্চলিক দলবিহীন রাজনৈতিক কাঠামো ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে সম্ভব কি না, তা ঠিক না ভুল তা নিয়ে বিতর্ক চলবেই। কিন্তু ভারতের রাজনীতিতে বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল যে আঞ্চলিক দলগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আগামী দিনে ভারতের রাজনীতি আঞ্চলিক শক্তির উপর নির্ভর করবে, নাকি আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হবে এখন সেই উত্তর খুঁজছে দেশের রাজনৈতিক মহল।