আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় কেবল পাঠ্যবই-কেন্দ্রিক শিক্ষা শিশুর সার্বিক বিকাশকে সীমিত করে তোলে। বইয়ের পাতা উল্টে অচেনা জগতকে জানার যে আনন্দ, তা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীন পঠনঅভ্যাস গড়ে তুলতে ‘রিডিং কর্নার’ বা ‘পঠন কোণ’ এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।
আমাদের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নিজস্ব বা পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও স্থানের অভাব দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেখানে পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে শ্রেণিকক্ষের এক কোণেই একটি সহজগম্য, আকর্ষণীয় ও শিশুবান্ধব ‘রিডিং কর্নার’ গড়ে তোলা সম্ভব। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তেও শিশুকাল থেকেই বইয়ের সঙ্গে পরিচয় ও সহজ পঠন সংস্কৃতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
একটি আদর্শ রিডিং কর্নার হবে অত্যন্ত প্রাণবন্ত, বর্ণময় ও শিশুবান্ধব। শ্রেণিকক্ষের নির্দিষ্ট স্থানটিকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে শিশুরা সরাসরি ও সহজে বইয়ের সান্নিধ্যে আসতে পারে। শ্রেণিকক্ষের মেঝেতে আসনব্যবস্থা হিসেবে রঙিন কার্পেট, মাদুর বা ছোট কুশন ব্যবহার করা যায়, যা শিক্ষার্থীদের এক মুক্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে বসে পড়ার অনুভূতি দেয়।
এখানে সংগ্রহের বৈচিত্র্যই মূল প্রাণ। ছোটদের আকর্ষণ করতে গল্প, শিশুসাহিত্য, ছড়া, চিত্রিত বই ও বড় হরফের বই রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি দ্বিভাষিক বই, মানচিত্র, বিজ্ঞান ও গণিতের বিভিন্ন কার্যকলাপের বই রেখে স্থানটিকে কৌতূহল-উদ্দীপক ও শেখার অনুকূল করে তোলা উচিত।
কেবল সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একটি রিডিং কর্নারকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করে তোলা সম্ভব। এর জন্য শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় শুভানুধ্যায়ীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যালয়ে ‘বই দান করুন’ কর্মসূচির আয়োজন করে সকলের কাছ থেকে নতুন বা পুরোনো ভালো মানের বই সংগ্রহ করা যেতে পারে।
এছাড়াও, আগের শিক্ষাবর্ষের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত ভালো অবস্থাযুক্ত বইগুলি পুনরায় ব্যবহার করলে সহজেই সংগ্রহের কলেবর বৃদ্ধি পায়। কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগই নয়, স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি, প্রকাশক, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা (এনজিও) ও বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ও সহযোগিতা নিয়েও রিডিং কর্নারের বইয়ের ভাণ্ডারকে নিয়মিত সমৃদ্ধ রাখা সম্ভব। রিডিং কর্নার কেবল বই সাজিয়ে রাখার স্থান নয়, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জীবন্ত ও কর্মমুখর কেন্দ্র হওয়া উচিত। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বইয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে বিদ্যালয়ে নানা বৈচিত্র্যময় কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
দৈনিক বা নির্দিষ্ট সময়ে ‘DEAR Session’ (ড্রপ এভরিথিং অ্যান্ড রিড) চালু করে সকল কাজ সরিয়ে কেবল আনন্দের জন্য পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। শিক্ষকরা সশব্দে পাঠ বা গল্প বলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারেন। এছাড়া পড়া বইয়ের ওপর ভিত্তি করে দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ, বই পর্যালোচনা, কুইজ ও শব্দজট খেলা এবং বইয়ের গল্পের ওপর ভিত্তি করে নাটকে চরিত্র রূপায়ণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
বিদ্যালয়ের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পঠনপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে রিডিং কর্নারের নকশা বিশেষ নজর দিয়ে তৈরি করা প্রয়োজন। সব শিশুর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এখানে স্পর্শভিত্তিক উপকরণ, ব্রেইল বা বড় হরফের বই এবং বর্ণময় ভিজ্যুয়াল সামগ্রী রাখা উচিত। পরিবেশটি এমনভাবে তৈরি করা প্রয়োজন যাতে শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতিটি শিশু সমান আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে বই পড়া ও শেখার সুযোগ পায়। একটি রিডিং কর্নার কেবল একটি বইয়ের তাক বা শ্রেণিকক্ষের সাধারণ একটি কোণ নয়; এটি শিশুর সহজাত কৌতূহল, স্বাধীন চিন্তাশক্তি এবং আজীবন শেখার সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। বই পড়ার মধ্য দিয়ে শিশুরা যে কল্পনার জগতে ডানা মেলে, তা তাদের মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় সমাজের যৌথ উদ্যোগ ও সক্রিয় অংশগ্রহণে শ্রেণিকক্ষের এই ছোট্ট পরিসরটি হয়ে উঠতে পারে বিদ্যালয়ের সবচেয়ে আকর্ষক ও আনন্দদায়ক ঠিকানা। এটি শিশুদের বইয়ের ভালোবাসায় সমৃদ্ধ করে ভবিষ্যতের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।