রাজা সেন: লোকজ জীবনের গল্প থেকে ‘দামু’র হাতি, ‘মায়ামৃদঙ্গ’-এর আলকাপ

File Photo

বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের দীর্ঘ পথচলায় রাজা সেন এমন এক পরিচালক, যাঁর কাজের ভিতরে বারবার ফিরে এসেছে প্রান্তিক মানুষ, লোকজ সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং সাধারণ জীবনের গল্প। তাঁর ছবির পরিসর কখনও একটি সরল গ্রাম্য মানুষের হাতির প্রতি ভালোবাসা, কখনও বা হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্পের জীবনসংগ্রাম। ‘দামু’ দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতে আত্মপ্রকাশ থেকে ‘মায়ামৃদঙ্গ’— রাজা সেনের যাত্রাপথ আসলে বাংলা সংস্কৃতির নানা স্তরকে ক্যামেরায় ধরে রাখার এক দীর্ঘ চেষ্টা। সেই প্রবীণ পরিচালক আর নেই। তাঁর চলে যাওয়ায় শেষ হল বাংলা বিনোদন জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কোমরে চোট নিয়ে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন রাজা সেন। কিন্তু ক্রমশ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়, হৃদ্‌রোগেও আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে কিডনির সমস্যাও দেখা দেয়। ভেন্টিলেশনে ছিলেন পরিচালক। এই কঠিন সময়ের মধ্যেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

অথচ রাজা সেনের জীবন ও কর্মের গল্প শুধুই শেষ জীবনের অসুস্থতার গল্প নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ৭০ পূর্ণ করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ কেরিয়ারে একের পর এক ধারাবাহিক, ছবি ও তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন। ১৯৮৭ সালে তাঁর পরিচালিত ‘সুবর্ণলতা’ ধারাবাহিক বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পরে ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর মতো ধারাবাহিকও দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। দূরদর্শনের সেই সময়ে তাঁর কাজ এক বিশেষ দর্শক তৈরি করেছিল।

তবে বড়পর্দায় তাঁর প্রথম বড় পরিচয় ‘দামু’। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল তাঁর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চাননের হাতি’ অবলম্বনে তৈরি ছবিটির কেন্দ্রে এক সরল, অনাথ মানুষ দামু এবং একটি শিশুকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি। রঙ্কুকে হাতির পিঠে চড়ানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে দামুর যাত্রা ক্রমে হয়ে ওঠে আশা, অপমান, সংগ্রাম এবং মানবিকতার গল্প। ছবিটি সেরা শিশুচলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার পায়।

‘দামু’র সাফল্যের পিছনের গল্পটিও কম আকর্ষণীয় নয়। ছবিটি তৈরি করতে গিয়ে রাজা সেনকে প্রযোজকের টাকা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। শুটিংয়ের সময় বোলপুরে জেনারেটর থাকলেও তেলের অভাবে তা চালানো যায়নি। ফলে রাজবাড়ির ভিতরের যে দৃশ্য করার কথা ছিল, সেটি বাইরে করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এমনকি শুটিং ইউনিটকে নিয়মিত সবজি পাঠানোর পাশাপাশি এক সাধারণ সবজি বিক্রেতা আর্থিক সাহায্যও করেছিলেন। অর্থাৎ প্রথম ছবির পথটি তাঁর জন্য মোটেই মসৃণ ছিল না। কিন্তু সেই প্রতিকূলতার মধ্যেই তৈরি হয় এমন একটি ছবি, যা তিন দশক পরেও বাংলা দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।


‘দামু’র পরে রাজা সেনের চলচ্চিত্রভুবন আরও বিস্তৃত হয়। ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘চক্রব্যূহ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘তিনমূর্তি’, ‘দেশ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ল্যাবরেটরি’, ‘খাঁচা’—বিভিন্ন ধরনের গল্প নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর ছবির একটি বড় অংশের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের যোগ রয়েছে। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যকে পর্দায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ‘ল্যাবরেটরি’-তে রবীন্দ্রনাথের জটিল উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে নিয়ে আসেন। সব ছবি সমানভাবে সমাদৃত হয়নি; কিছু কাজ নিয়ে তীব্র সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা তাঁর কাজের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

তাঁর কেরিয়ারের আর একটি স্মরণীয় ছবি ‘মায়ামৃদঙ্গ’। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবি বাংলা লোকসংস্কৃতির এক প্রায়-বিলুপ্ত শিল্পরূপ— ‘আলকাপ’-কে কেন্দ্র করে। এখানে রাজা সেন শুধু একটি গল্প বলেননি, হারিয়ে যেতে বসা একটি সাংস্কৃতিক পরম্পরার স্মৃতিও ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

‘মায়ামৃদঙ্গ’-এর কেন্দ্রে ঝাঁকসু উস্তাদ, আলকাপ দলের প্রধান শিল্পী। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে গান, নাচ ও অভিনয় করে জীবনধারণ করা এই শিল্পীদের অস্তিত্ব আধুনিক বিনোদনের চাপে ক্রমশ সংকুচিত। টেলিভিশন ও সিনেমার বিস্তারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তাঁদের লোকশিল্প হারাচ্ছে দর্শক। ঝাঁকসুর ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর শিল্পের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দুই স্ত্রী, পরিবার, দলের সদস্য— সবকিছুর চেয়ে তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে গান ও আলকাপের জগৎ।

এই ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল ‘ছোকরা’ চরিত্র। আলকাপের পরিবেশনায় তরুণ পুরুষ শিল্পী নারীর সাজে, ভঙ্গিতে ও অভিনয়ে বিশেষ ভূমিকা নিতেন। ঝাঁকসুর দলের শান্তি সেই পরম্পরারই প্রতিনিধি। শিশুকাল থেকে তাকে শিল্পের জন্য তৈরি করা হয়। ফলে শিল্প, পরিচয় এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ছবিটি এই লোকশিল্পের সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার ভিতরে থাকা কঠিন বাস্তবতাকেও সামনে আনে।

একটি সমালোচনায় ছবিটির সংগীত, নৃত্য, বাংলার নদী, খোলা আকাশ, গ্রামীণ পরিবেশ এবং লোকজ জীবনের আবহ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একই সঙ্গে ছবিটির অতিরিক্ত নাটকীয়তা, দীর্ঘ দৈর্ঘ্য এবং নারী চরিত্রগুলির তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ ‘মায়ামৃদঙ্গ’ নিখুঁত ছবি না হলেও তার বিষয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তাকে আলাদা করে রাখে। বিশেষত বিলুপ্তির মুখে থাকা একটি লোকশিল্পকে বড়পর্দায় নথিবদ্ধ করার চেষ্টা ছবিটিকে মূল্যবান করে তোলে।

রাজা সেনের নিজের জীবনেও যেন ‘মায়ামৃদঙ্গ’-এর মতোই এক অসমাপ্ত প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল। ২০১৯ সালে মুক্তি পায় তাঁর শেষ ছবি ‘ভালবাসার গল্প’। তারপরও তিনি পরিচালনায় ফিরতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর কাছে গল্পের অভাব নেই, অভাব প্রযোজকের। এক সময় বছরে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে বহু ছবি তৈরি হলেও সেই সংখ্যা অনেক কমে যাওয়াকে তিনি নতুন পরিচালকদের কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেছিলেন। বয়সকেও তিনি বাধা মনে করতেন না; তরুণ মজুমদারের দীর্ঘ কর্মজীবনের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, ভালো প্রযোজক পেলেই তিনি আবার ছবি করতে চান।

কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন আর হল না। কোমরের পুরনো চোটও শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ‘মায়ামৃদঙ্গ’-এর শুটিংয়ের সময় পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছিলেন তিনি। বহু বছর হাঁটতে অসুবিধা হলেও তা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। পরে শারীরিক জটিলতা বাড়লে অস্ত্রোপচার হয় এবং কিছুদিন সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

রাজা সেনের ছবিগুলির দিকে ফিরে তাকালে তাই শুধু পুরস্কার বা জনপ্রিয়তার হিসাব সামনে আসে না। দেখা যায় এক পরিচালকের দীর্ঘ অনুসন্ধান— সাহিত্য থেকে লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন থেকে আধুনিক সমাজ, শিশুর সরলতা থেকে মানুষের জটিলতা। ‘দামু’ তাঁকে জাতীয় স্বীকৃতি দিয়েছিল; ‘মায়ামৃদঙ্গ’ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল বাংলার প্রায় বিস্মৃত এক লোকশিল্পের ভেতরে। মাঝখানে ছিল বহু সাফল্য, কিছু ব্যর্থতা, সমালোচনা এবং নিরন্তর কাজ করে যাওয়ার ইচ্ছা।

শেষ পর্যন্ত রাজা সেনের উত্তরাধিকার হয়তো কোনও একটি ছবিতে আটকে থাকবে না। বোলপুরের মাঠে অর্থসংকটের মধ্যেও তৈরি ‘দামু’ কিংবা নদী-আকাশ-গ্রাম পেরিয়ে আলকাপের শিল্পীদের জীবন তুলে ধরা ‘মায়ামৃদঙ্গ’— দুটি ছবিই তাঁর সৃষ্টিশীল মানসিকতার দুই ভিন্ন মুখ। একটিতে শিশুর জন্য পূরণ করা প্রতিশ্রুতি, অন্যটিতে হারিয়ে যেতে বসা এক শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা। এই দুই প্রান্তের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছেন রাজা সেন— বাংলা চলচ্চিত্রের এক অক্লান্ত, কখনও প্রশংসিত, কখনও বিতর্কিত, কিন্তু নিঃসন্দেহে এক স্বতন্ত্র পরিচালক।