বর্ষা, বন্যা ও মুম্বাইয়ের জনজীবন

Photo: Statesman

মুম্বাই শহরের জন্য বর্ষা নতুন কিছু নয়, কিন্তু প্রতি বছর বৃষ্টির সঙ্গে যে বিপর্যয়ের ছবি উঠে আসে, তা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায়, ব্যাহত জনজীবন, বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— এ যেন এক চেনা চিত্র। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনা সমস্যার গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কবার্তা বলছে, বৃষ্টি এখনও থামার নয়— ফলে আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বরং প্রশ্ন উঠছে, কেন প্রতি বছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে শহরের ইতিহাস ও পরিকল্পনার মধ্যে। একসময় সাতটি দ্বীপের সমষ্টি ছিল মুম্বাই, যার বড় অংশই ধীরে ধীরে সমুদ্র ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে শহরের বহু অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যা প্রাকৃতিক জলনিকাশ ব্যবস্থাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে।
অতীতে মুম্বাইয়ে ছিল বিস্তীর্ণ জলাভূমি, খাল ও নোনা জমি, যেগুলি বর্ষার জল স্বাভাবিকভাবে ধরে রাখত এবং ধীরে ধীরে সমুদ্রে পৌঁছে দিত। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নির্মাণের চাপে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলি হারিয়ে গিয়েছে বা সংকুচিত হয়েছে। ফলে প্রবল বৃষ্টি হলেই জল তার পুরনো পথ খুঁজে নিতে চায় এবং শহরের বহু এলাকা দ্রুত জলমগ্ন হয়ে পড়ে। পশ্চিম মুম্বাই কিংবা উপনগরীর বিভিন্ন অংশে নিয়মিত জল জমার ঘটনা তারই ফল।
২০০৫ সালের ভয়াবহ বন্যার পর প্রশাসন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল। পাম্পিং স্টেশন তৈরি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নতি— এসব উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হল, বর্তমান নিকাশি ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে যখন স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টি হয়, তখন এই ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে।
সমস্যার আরও একটি জটিল দিক রয়েছে। মুম্বাইয়ের নিকাশি ব্যবস্থা মূলত মাধ্যাকর্ষণের উপর নির্ভর করে, অর্থাৎ জল স্বাভাবিক ঢাল অনুসরণ করে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। কিন্তু যখন প্রবল বর্ষণের সঙ্গে জোয়ারের সময় মিলে যায়, তখন সমুদ্রের জল উল্টো চাপ সৃষ্টি করে। ফলে নিকাশি পথ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং শহরে জল জমে যায়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই কারণটি আবারও সামনে এসেছে।
এই প্রেক্ষিতে এ কথা স্পষ্ট যে, কেবল ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টির ধরন বদলাচ্ছে, স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এখন ক্রমশ বাড়ছে। তাই শহর পরিকল্পনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সমস্যা মোকাবিলায় নতুন চিন্তা দেখা যাচ্ছে। চিনের ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সেখানে শহরের পরিকাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তা বৃষ্টির জল শোষণ ও সংরক্ষণ করতে পারে। কংক্রিটের বদলে জলধারণক্ষম পেভমেন্ট, জলাভূমির পুনরুদ্ধার, কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ— এসব উদ্যোগ শহরকে বন্যা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করছে। একইভাবে নেদারল্যান্ডসে ‘ওয়াটার স্কোয়ার’-এর মতো ধারণা বাস্তবায়িত হয়েছে, যা সাধারণ সময়ে জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা, আর বর্ষায় জল সংরক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এছাড়া সবুজ ছাদ বা ‘গ্রিন রুফ’-এর মতো উদ্যোগও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের বিভিন্ন শহরে এই ধরনের ‘ব্লু-গ্রিন’ পরিকাঠামো এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। মুম্বাইয়েও কিছু পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তার বাস্তবায়ন সীমিত। অথচ বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, প্রকৃতির সঙ্গে বিরোধে গিয়ে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।
আজকের শহরের চাহিদা বহুমুখী— বাসস্থান, পরিবহন, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, আধুনিক সুবিধা। কিন্তু এই উন্নয়ন যদি প্রাকৃতিক জলনিকাশ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে, তবে তার ফল ভোগ করতে হয় নাগরিকদেরই। প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।
অতএব, এখনই সময় পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। জলাভূমি সংরক্ষণ, পুরনো জলপথ পুনরুদ্ধার, সবুজ এলাকার বৃদ্ধি, এবং নতুন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ— এই সবকিছুকে একত্রে ভাবতে হবে। কেবল প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
মুম্বাইয়ের বর্তমান সংকট তাই একটি সতর্কবার্তা। উন্নয়নের পথে এগোতে গিয়ে যদি প্রকৃতিকে উপেক্ষা করা হয়, তবে তার মূল্য বারবার দিতে হবে। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের প্রতিটি বড় শহরকে ভবিষ্যতের জন্য কতটা প্রস্তুত করা যায়, সে কথাও ভাবতে হবে।