নোটন কর
বিহারের পর পঃবাংলায় শুরু হয়েছে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা যাচাই (SIR)। নির্বাচন কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনুমারেশন ফর্ম দেওয়া হবে ৪ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে ৯ ডিসেম্বর। এই তালিকা নিয়ে অভিযোগ থাকলে তা ৯ ডিসেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারির মধ্যে জানাতে হবে। অভিযোগ শোনা এবং খতিয়ে দেখার কাজ চলবে ৯ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬-এর ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন কমিশন SIR-এর নামে নাগরিকত্ব যাচাই করছে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন হল, এই এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনের আছে কিনা? যে ধরনের প্রশ্নমালা বা নথিপত্র চাওয়া হয়েছে তা এনআরসি (NRC) প্রক্রিয়ার নামান্তর।
১৯৫৫ সালের ভারতের নাগরিকত্ব আইনে বলা হয়েছে এদেশে জন্মালেই, এ দেশের নাগরিক হওয়া যাবে। তার বহুদিন পর ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন কংগ্রেস সরকার এই নাগরিকত্ব আইনে সংশোধন আনে। তারপর ২০০৩ সালে বিজেপি সরকার এই নাগরিক অধিকার আইনকে আরও সংকুচিত করে। ২০১৯ সালে সর্বশেষ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) সংসদে পাশ করানো হলে নাগরিক অধিকার আরো মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে যায়।
১৯৫৫ সালে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি সংশোধনগুলির মাধ্যমে হওয়ায় ‘জন্মসূত্রে’ ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার শেষপর্যন্ত ‘উত্তরাধিকার’ সূত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। এখন ‘নাগরিকত্ব’ বিষয়টি যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তা হল: (ক) ১৯৮৬ সালে সংশোধনীতে বলা হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি বা তার পরে এবং ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে যাঁদের ভারতে জন্ম তাঁরা ভারতের নাগরিক। ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই বা তার পরে যাঁদের জন্ম ভারতে তাঁরা জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন না, পেতে হলে তাঁদের পিতা-মাতার যে কোনও একজনকে সন্তানের জন্মের সময় ভারতের নাগরিক হতে হবে। এইভাবে জন্মসূত্রে নগরিকত্বের অধিকার আংশিক খর্ব করা হয়। (খ) এরপর ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব আইনে গুরত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে নাগরিকত্ব হওয়ার বিষয়টি আরো জটিল করা হয়। এই আইন লোকসভায় পাশ করাতে তখনকার সমস্ত বিরোধী দল সোচ্চার সমর্থন দেয়। বলা হয় ১৯৮৬ সালের আইন ২০০৪ সালের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর। ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বা তারপর যাঁদের ভারতে জন্ম তাঁদের পিতা-মাতা দুজনকেই সন্তানের জন্মের সময়ে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।
২০০৩ সালে সংশোধীত নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫’র মূল আইনের মর্মার্থ পাল্টে দেয়, এখন সকল ভারতবাসীকে বিভিন্ন নথিপত্র দিয়ে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে আর যারা সরকার নির্ধারিত নথিপত্র দেখাতে পারবেন না তারা সকলেই বে-নাগরিক বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য হবেন। এনআরসি যে কত ভয়ঙ্কর তা আসামের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। উনিশ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় নাগরিক সেখানে বাদ গিয়েছেন। মূলত বাদ গিয়েছেন বাংলাভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিম এবং নিম্নবর্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের গরিব শ্রমজীবী মানুষ। এছাড়াও বাদ গিয়েছেন আসামের জনজাতিদের মধ্যে– বোড়ো, রাজবংশী, হাজং সহ গোর্খারা।
বিহারে নিবিড় ভোটার তালিকা যাচাই (SIR)-এর নামে ৪৭ লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছেন। এর মধ্যে ২২ লক্ষ নারী ভোটার। নির্বাচন কমিশন বলেছে ২১ লক্ষ ভোটার মৃত। বাদবাকিদের বর্তমান ঠিকানায় খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বিশেষ নিবিড় ভোটার (SIR) যাচাইয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মূল উদ্দেশ্য হল, দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষকরে মুসলিম, জনজাতি সহ নারী, শ্রমজীবী, পরিযায়ী শ্রমিক, গরীব মানুষকে হেনস্থা ও অপদস্থ করা এবং বে-নাগরিক করা। বিরোধীরা দাবী করেছেন বিহারে ৬ জেলার ৬০ কেন্দ্রে মুসলিম ও নারী ভোটারদের টার্গেট করা হয় নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে। কারণ এই ৬০ কেন্দ্রে ২০২০ সালের বিধানসভা ভোটে এনডিএ এবং বিরোধী প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল। পরিকল্পনা করেই এই কেন্দ্রগুলি থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আগামীদিনে বিভিন্ন রাজ্যে জাতীয় নির্বাচন কমিশন এসআইআর (SIR) করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের নির্দেশে এই পদ্ধতি অবলম্বন করার যথেষ্ট কারণ আছে। পঃবাংলায় বিজেপি নেতারা বারবার দাবি করে আসছে এরাজ্যে বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা মিলে ১কোটি অনুপ্রেবেশকারী আছে। SIR এর অজুহাতে ভোটার সংখ্যা ৬০-৭০ লক্ষ বাদ দিতে পারলে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির লাভ হবে। বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এটাই করিয়ে নিতে চাইছে। সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে তারা এখানে ভোট পেয়েছিল ৩৯ শতাংশ। তার আগে যে বিধানসভা নির্বাচন হয়, সেখানে তারা ২৯৪টির মধ্যে ৭৭টি আসন পায়। ওই নির্বাচনে ভোট পেয়েছিল ৩৮ শতাংশ। গত এক বছর আরএসএস-বিজেপি বিশ্লেষকেরা ভোট ও আসনের এসব হিসাব খতিয়ে দেখেছে। তাদের বিশ্লেষণে দলের ৩৮-৩৯ শতাংশ ভোটের অল্প অংশ আছে ভাসমান ভোট। রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী স্থায়ী ভোট আছে এখন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এটা যদি ৫ শতাংশ কমে কিংবা ৫ শতাংশ বাড়ে, তাহলে আসনের হিসাবে কী ঘটতে পারে, সেসব হিসাব সাম্প্রতিক বিহার নির্বাচনে কষা হয়ে গেছে। এখন কেবল পঃ বঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে এসআইআর-এর মাধ্যমে উক্ত সংখ্যক ভোটার কমিয়ে দিতে পারলে কেল্লা ফতে।
২০১৯ সালে সর্বশেষ নাগরিকত্ব সংশোধনী (সিএএ) আইনে বলা হয়েছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা সংখ্যালঘু হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষজন যারা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র আগে যদি ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে এদেশে আসেন তবে তারা ভারতের নগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আইনটি খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় ধর্মীয় নিপীড়ণের কারণে এদেশে এলেও নাগরিকত্ব পাওয়া খুব সহজ নয়। বিধিতে বলা হয়েছে যিনি ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে উপরে উল্লেখিত দেশগুলি থেকে এসেছেন তাকে ধর্মীয় নিপীড়নের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ তিনি যে দেশ থেকে এসেছেন সেখানকার কোনো থানায় ধর্মীয় অত্যাচারের অভিযোগ (FIR) করেছেন কিনা তার নথি দেখাতে হবে। এটা কি কোন উদ্বাস্তুর পক্ষে প্রমাণ করা সম্ভব? সিএএ ২০১৯ সংশোধিত আইন কোনভাবেই বাংলাদেশ বা সাবেক পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা কোটি কোটি বাঙালি নমঃশূদ্র উদ্বাস্তুদের, মতুয়াদের নাগরিকত্ব পেতে সাহায্য করবে না বরং তাদেরকে বেআইনী অভিবাসী চিহ্নিত করার জন্যে একটি ফাঁদ হিসাবে কাজ করবে। আর এই আইনে মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে আলাদা করে কিছু বলা নেই। ফলতঃ বিজেপি নেতৃত্ব মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যে গ্যারান্টি দিচ্ছেন তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এটি ভাওতা ছাড়া আর কিছু নয়।
SIR-এর সময় যে ১১টি নথির মধ্যে ১টি চাওয়া হচ্ছে তা ভারতের অনেক নাগরিকের কাছে নেই। বিশেষকরে ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ শ্রমজীবী মানুষের কাছে। তাদের বেলায় যাচাই কিভাবে হবে সে সমন্ধে নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট কিছু বলা নেই। সন্দেহ হয় যারা নির্দিষ্ট কাগজপত্র দেখাতে পারবেন না তারা তালিকা থেকে বাদ পড়বেন। দারিদ্র-অশিক্ষা-অসচেতনতা অধ্যুষিত রাজ্যে রাজ্যে বহু প্রান্তিক মানুষ, ‘নথি দেখানো’র অপারগতায় বাদ পড়বেন। বিরোধীরা অজস্র পদ্ধতিগত ত্রুটির কথা তুলে ধরেছেন।
সম্প্রতি বিজেপি শাসিত রাজ্যেগুলিতে বাংলাভাষিক পরিযায়ী শ্রমিকদের বিশেষকরে মুসলিমদের বাংলাদেশে একাধিক ‘পুশ ইনের’ ঘটনা ঘটেছে। সোনালী বিবিরা আজও বাংলাদেশের জেলে আটক আছেন। হাইকোর্ট তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ দিলেও কেন্দ্র সরকার তা মানছে না। ‘পুশ ইন’ করতে ভাষাকে অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ বাংলাভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সম্প্রতি আসামের করিমগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার বাংলা’ গান গাইবার জন্য গায়কের বিরুদ্ধে ‘দেশবিরোধী’ মামলা রুজু করা হয়েছে।
এসআইআর (SIR) বিহার মডেল সফল হওয়ার পর এবং বিহার নির্বাচনে এনডিএ বিপুলভাবে জিতে যাবার পর পঃবাংলায় এবার SIR আক্রমণ আরো ভয়াবহভাবে আরএসএস-বিজেপি নামিয়ে আনবে। কোনো কিছু আইন কানুনের পরোয়া তারা আর করবে না। আগামী নির্বাচনে যেনতেন প্রকারে ফ্যাসিবাদীরা জেতার মরিয়া চেষ্টা চালাবে।
প্রশ্ন হল, নির্বাচন কমিশন SIR-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে কিনা? উত্তর হল না। সংবিধানের ৩২৪ নং ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা। নাগরিকত্ব যাচাই করে কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রকের দপ্তর।
SIR-এর মাধ্যমে দেশের শ্রমজীবীদের নাগরিকত্ব হরণ করার ষড়যন্ত্র, বিজেপি-র ভোট ফায়দা, জনগণকে বে-নাগরিক করা, একই সঙ্গে বাংলাভাষীদের ওপর আক্রমণ ও মুসলিমদের জোর জবরদস্তি করে বাংলাদেশে পাঠানোর বন্দোবস্তের মধ্যে দিয়ে আরএসএস-বিজেপি তার ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গড়ার উদ্দেশ্য (agenda) সফল করতে চাইছে।