প্রতিবাদের অধিকার ও আইনের শাসন

প্রতীকী চিত্র

নিট পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্ট যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল, অভিযোগগুলির সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন, প্রশাসন ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্যের বিষয়টিকেও সামনে এনে দিয়েছে।
ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অঙ্গ। সংবিধান নাগরিককে মত প্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে এই অধিকার আরও তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা, পরীক্ষা, ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থান নিয়ে তাঁদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা প্রয়োজন। মতের সঙ্গে মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মত প্রকাশের সুযোগ থাকাটাই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচয়।
যন্তর মন্তরের ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস বা পেলেট বন্দুকের ব্যবহার কিংবা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগগুলি কতটা সত্য, কোথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল এবং কোথায় মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল— এসবই নিরপেক্ষ তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার। অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশের বক্তব্যও শোনা জরুরি। কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশকেও অনেক সময় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
এই কারণেই সুপ্রিম কোর্টের গঠিত কমিটির গুরুত্ব অনেক। কমিটিতে বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রাক্তন পুলিশকর্তাদের রাখা হয়েছে। ফলে বিষয়টি একদিকে যেমন নাগরিক অধিকারের দৃষ্টিতে দেখা যাবে, অন্যদিকে পুলিশের কাজের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় আসবে। সত্য সামনে আসার জন্য এই ভারসাম্য জরুরি।
প্রতিবাদস্থলে যদি সত্যিই কিছু সমাজবিরোধী বা অপরাধমূলক কাজে যুক্ত ব্যক্তি ঢুকে পড়ে থাকে, তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কয়েকজনের আচরণের দায় যেন শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা সব ছাত্রছাত্রীর উপর না বর্তায়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যক্তির ভূমিকা ও অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই ন্যায়সঙ্গত পথ।
একই সঙ্গে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। পুলিশ এবং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনই নাগরিকদেরও বিশ্বাস থাকতে হবে যে, তাঁদের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে শোনা হবে। সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগ সেই আস্থাই পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ— দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি তাঁদের কথা শুনতে প্রস্তুত। প্রতিবাদ মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা মানেই নাগরিকের অধিকার উপেক্ষা করা নয়। এই দুইয়ের মধ্যে একটি দায়িত্বশীল ভারসাম্যই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরেই দেশের নানা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের পরিচিত স্থান। সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখা দরকার। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তদন্ত যদি সত্যকে সামনে আনে এবং ভবিষ্যতে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের জন্য আরও স্পষ্ট নিয়ম ও সীমারেখা তৈরি করে, তবে এই ঘটনাও একটি ইতিবাচক শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত কাউকে শুধু দোষী সাব্যস্ত করাই নয়, বরং আইনের শাসন, নাগরিকের অধিকার এবং প্রশাসনের দায়িত্ব— তিনটিকেই আরও শক্তিশালী করা।