মতুয়া সমাজের সমস্যা

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে নাগরিকত্ব কোনও জটিল আইনি বিষয় নয়, এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনের এক বাস্তব সমস্যা। বিশেষ করে মতুয়া সমাজের বহু মানুষের কাছে নাগরিকত্ব মানে এখনও অনিশ্চয়তা। দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় যাঁরা এপারে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজও নিজেদের পুরোপুরি স্বীকৃত নাগরিক বলে মনে করতে পারেন না।

অনেক বছর ধরে একই জায়গায় বসবাস করেও ‘বাসিন্দা’ আর ‘নাগরিক’-এর মধ্যে পার্থক্য যেন পুরোপুরি মুছে যায়নি। এই অনিশ্চয়তা সাম্প্রতিক সময়ে আরও বাড়ছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নাগরিকত্ব আইন প্রয়োগের ধীর গতির কারণে সমস্যা আরও জটিল হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একই পরিবারের একজনের নাম ভোটার তালিকায় আছে, কিন্তু অন্যজনের নেই। কেউ বহু বছর ধরে একই গ্রামে থাকলেও তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। এতে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি নাগরিকত্ব স্থায়ী নয়? এটা কি কাগজপত্র আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে?


এই বিষয়টির রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। উত্তর ২৪ পরগনার মতো জেলায় মতুয়া সমাজ একটি বড় ভোটব্যাঙ্ক। তাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস, তাদের সমর্থন পেতে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কখনও সম্মান জানানো হয়েছে, কখনও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, আবার কখনও আইনি সমাধানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— নাগরিকত্বের স্পষ্ট স্বীকৃতি, এখনও তা পুরোপুরি মেলেনি। ফলে মানুষ নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সমস্যা— নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া নিয়ে ভয়। অনেককে পুরনো নথি, এমনকি সীমান্তপারের বাসস্থানের প্রমাণও দিতে বলা হচ্ছে। যাঁদের জীবনই কেটেছে উদ্বাস্তু হিসেবে, তাঁদের কাছে এই ধরনের প্রমাণ জোগাড় করা কঠিন। এতে অনেকেই মনে করছেন, এই প্রক্রিয়া তাঁদের সাহায্য করার বদলে সমস্যায় ফেলতে পারে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতৃত্বের বিভাজন। মতুয়া সমাজের বিভিন্ন সংগঠন ও নেতৃত্ব এখন একজোট নয়। তাদের মধ্যে মতভেদ ও রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। এর ফলে তাদের দাবি একসঙ্গে জোর দিয়ে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। একসময় যে দাবি ছিল সবার, এখন তা ভেঙে গিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে।

এই সবকিছুর প্রভাব পড়ছে গণতান্ত্রিক অধিকারেও। ভোট দেওয়া একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু যদি সেই অধিকারই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়। যদি মানুষ নিশ্চিত না হয় যে, তারা ভোট দিতে পারবে, তাহলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর আস্থা কমে যায়।

এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে— গণতন্ত্র কি শুধুই ভোট নেওয়ার প্রক্রিয়া, নাকি সবার জন্য সমান ও নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি ব্যবস্থা? যদি অনেক মানুষের নাগরিকত্বই স্পষ্ট না হয়, তাহলে সেই গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী?

মতুয়া সমাজের অভিজ্ঞতা আমাদের এই কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, মৌলিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা রেখে দিলে তার প্রভাব গভীর হয়। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা শুধু কে কাকে ভোট দেবে, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো— মানুষ কি নিশ্চিন্তে বলতে পারবে যে তারা এই দেশের পূর্ণ নাগরিক, এবং তাদের সেই অধিকার আর কখনও প্রশ্নের মুখে পড়বে না?