বেঙ্গল কেমিক্যালে ফের অ্যান্টিভেনম তৈরি এখন সময়ের দাবি

Youth Deadbody Found Photo-Representative

সমস্ত রকম আন্দোলনের পিছনে থাকে একটা লক্ষ্য। ত্যাগ, আদর্শ এবং সঠিক নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই সেই আন্দোলনের বিকাশ ও প্রাপ্তি। বিজ্ঞান আন্দোলনও এর বাইরে না। প্রফুল্লচন্দ্র রায় থেকে হাল আমলের বিজ্ঞান আন্দোলনের যোদ্ধাদের মধ্যেও সেই ভাবনা, একই আদর্শ। বিজ্ঞান যেমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, তেমনি মানুষের ভাবনাও জড়ভরত অবস্থায় নেই। বিজ্ঞান চেতনা ও সংস্কৃতির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবর্তন লক্ষণীয়। সেই হিসেবে বিজ্ঞান আন্দোলনও পরিবর্তিত রূপ নিয়ে হাজির হয় কালের নিয়মে। কিছুদিন আগে বিধানসভায় ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির বেঙ্গল কেমিক্যালে এভিএস পুনরুৎপাদনের দাবি শুনে কথাগুলি মনে এল। বর্ষায় সাপে-কাটা রোগীর মৃত্যুর বাড়বাড়ন্তর ছবিটা সেই  দিনের অধিবেশনে যথার্থভাবে তুলে ধরেছেন ওই বিধায়ক। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, গত মরসুমে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষ সর্পদংশনে আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যুর সংখ্যাটা প্রায় ১৫০-এর কাছাকাছি। এবছরও সাপে-কাটা রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা যথেষ্ট উৎকণ্ঠাজনক। তবে এখনও পর্যন্ত সরকারি তথ্য স্পষ্ট  নয়। তবে সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যাবে আক্রান্তের বেশিরভাগই দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং দক্ষিণবঙ্গের জেলা থেকে আগত।
সাপে কাটলে কোনও ওঝা-গুণিনের কাছে নয়, একেবারে হাসপাতালে যান— আশির দশকের শুরু থেকেই বিজ্ঞানকর্মীদের এটা ছিল মুখ্য প্রচার ও লাগাতার কর্মসূচি আর এমন নিরবিচ্ছন্ন প্রচারের ফলেই গ্রামে-গঞ্জের বেশিরভাগ সাপে-কাটা রোগী আজ হাসপাতালমুখী। কিন্তু হাসপাতালে আসার পরও যদি অনেক রোগী না বাঁচে তখন গ্রামাঞ্চলের এই মানুষদের মনেও প্রশ্ন উঠে আসে— হাসপাতালে গিয়ে কী লাভ? এদের একাংশ তখন হাসপাতালে যাওয়ার খরচ ও হয়রানি এড়িয়ে আবার ছুটে যায় ওঝার কাছে। আবার তখনই ‘ঝড়ে বক মরে আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে’ এই প্রবাদবাক্যটি বিজ্ঞান-সচেতন মানুষের কানে বেজে ওঠে। কেননা ওঝার কাছেও কিছু সংখ্যক মানুষ তো বাঁচে, এটা তথ্য! কিন্তু আসল বৈজ্ঞানিক সত্য হল— আসলে বিষহীন সাপের কামড় বলেই সেই মানুষটি বেঁচে যায়। এই বিষ ঢালা, না ঢালার মধ্যে আছে বৈজ্ঞানিক ভাবনা ও অন্ধবিশ্বাসের সংঘাতের সুপ্ত লড়াই। যে মানুষটি ওঝার কাছে গিয়ে বেঁচে গেলেন, আবার যে মানুষটি হাসপাতালে গিয়ে মারা গেলেন, দুটি ঘটনাই বিজ্ঞানকর্মীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও তাঁরা প্রচারের প্রথম দিন থেকেই বলেন, অধিকাংশ সাপের বিষ নেই৷ আবার এই বিষধর সাপের অনেকে পুরো বিষ ঢালতে পারে না বলে তাঁরা বেঁচে যান। কিন্তু সত্যের এই সরল তথ্যটিকে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে দাঁড় করানো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সাপে-কাটা এত রোগী হাসপাতালে কেন মারা যাচ্ছে? সদর মহকুমার মেডিক্যাল কলেজের এক বন্ধু প্রফেসারের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে একটা দায়সারা অথচ জুতসই উত্তর দিয়েছিলেন— বিলম্ব! বিলম্ব! রোগী যখন আসে তখন তো শেষ অবস্থা। তখন আর এভিএস কাজ করে? তাঁদের হাসপাতাল থেকে সাত আট কিলোমিটার দুরের বেশ কিছু রোগী বিলম্ব না করে এসেও মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছে এই তথ্যের উপর জোর দিলে বন্ধুবর যা বলেছিলেন তা যথেষ্ট আশঙ্কাজনক। তাঁর কথায়, বিষধর সাপের  দেশের চারণভূমি অস্ট্রেলিয়ায় আক্রান্তের মৃত্যুর হার মাত্র ০.০২% থেকে ০.০৩%। আর এক সাপের দেশ শ্রীলঙ্কাতেও মৃত্যুর হার কম৷ তার কারণ উন্নত মানের এন্টিভেনম এবং সুচিকিৎসা। সাপে-কাটা রোগীর অন্যতম চিকিৎসা এই অ্যান্টিভেনম। সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনমের যোগান নিয়ে আন্দোলন করেছিল বিজ্ঞান কর্মীদের ক্ষুদ্রাংশ। প্রত্যেকটি ব্লক, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই অ্যান্টিভেনম রাখার নির্দেশনামা জারি হয়েছিল, কিন্তু তাতেও দেখা গিয়েছিল অ্যান্টিভেনম না পেয়ে রোগী এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যেতে গিয়েই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছে। এই অসুবিধার কথা ভেবে অবশ্য স্বাস্থ্যভবন, তথ্য-প্রযুক্তি দপ্তর এবং আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের পয়জন রিসার্চ অ্যান্ড মেডিক্যাল সেন্টার একটি অ্যাপ তৈরি করেছিল, যেখান থেকে কোন ব্লক, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কতগুলি অ্যান্টিভেনম মজুত আছে তা জানা যেত। জানা গিয়েছে, এটি এখনও চালু। তবে তার প্রচার এবং প্রসারে এই শৌথিল্য কেন প্রশ্ন
এসে যায়।
এভিএসের জোগানেই কি সমস্যার সমাধান মিটবে? ডাক্তার বন্ধুর কথায়, এভিএস দেওয়ার এক প্রটোকলও আছে, রোগীর শারীরিক অবস্থা লক্ষ্য করে এভিএস দিতে হবে। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এমনকি বর্তমান সরকারি কলেজগুলোতে মেডিক্যাল ছাত্ররা যারা বেশিরভাগই গ্রামে কর্মরত, তারা কি এ ব্যাপারে যথেষ্ট শিক্ষণপ্রাপ্ত? ওই ডাক্তার বন্ধুর মতে, শুধু অ্যান্টিভেনম নয় একই সঙ্গে প্রয়োজন নিওস্টগমিন অ্যাড্রনালিন ও অ্যাট্রোপিন যা প্রয়োজন মতো ব্যবহার করা খুব জরুরী। তার থেকেও গুরুত্বপুর্ণ এগুলির উপযুক্ত সংরক্ষণ এবং উপযুক্ত ব্যবহার পদ্ধতি। সাপে-কাটা রোগীর বেশি ভিড় এখন সদর হাসপাতালেই। সাপে-কাটা রোগী মৃত্যুর যে কারণ দেখিয়েছেন আর এক সর্প চিকিৎসাবিশারদ, তা কিন্তু যথেষ্ট অশনি সংকেত। তাঁর মতে, দক্ষিণবঙ্গের বেশির ভাগ মৃত্যু চন্দ্রবোড়ার দংশনে হয় আর চন্দ্রবোড়ার দংশনে এভিএস নাকি ভালোভাবে কাজই করছে না। কেননা দক্ষিণভারত থেকে আমদানি করা এই এভিএসে গলদ আছে। এই এভিএস সাপের বিষ দিয়ে তৈরি হয়, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের সাপের বিষের প্রোটিনের গঠন থেকে এই বাংলার সাপের বিষের প্রোটিনের রকম ফের থাকায় ভাল ফল দিচ্ছে না ।
সরকারি হিসেবে, বছরে ভারতে ৫৮ থেকে ৬০ হাজারের মতো মানুষ সাপের কামড়ে মারা যাচ্ছে, যা পৃথিবীতে সাপে-কাটা মৃত্যুর সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। ভারতের মধ্যে সাপে-কাটা রোগীর নিরিখে এই রাজ্যের স্থান প্রথম দিকে। পূর্ববর্তী সরকারের শেষ বছরেও বিধানসভায় এই এভিএস ভায়ালের যোগান এবং গুণমান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল৷ কিন্তু কাজ কিছু হয়নি। এক সময়ে এ রাজ্যের বেঙ্গল কেমিক্যালে এভিএস তৈরি হত। নানান কারণে ২০০৯ সাল থেকে তা বন্ধ হয়ে যায়৷ আবার বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে এভিএস তৈরি হোক এই নিয়ে জোরালো দাবি তুলেছেন সংযুক্ত মোর্চার ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। ভৌগলিক কারণে তামিলনাড়ু থেকে আসা বিষ যে কার্যকরী হচ্ছে না, এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। নতুন সরকার যদি বেঙ্গল কেমিক্যালে ফের এভিএস উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু করতে পারে তাহলে যে শুধু অনেক রোগী বাঁচবে তা নয়, রাজ্যের শিল্প পুনরুদ্ধারের এক সদর্থক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
যদি উন্নতমানের অ্যান্টিভেনম না পাওয়া যায় তাহলে এ ব্যাপারে দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলনকারীদের কাছে স্বয়ং প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কথাটাই শেষ পর্যন্ত সত্য হয়ে ওঠে— ‘আমি ক্লাসে এত করিয়া ছাত্রদের পড়াইলাম, যে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপরে পড়িয়া চন্দ্রগ্রহণ হয়। তাহারা তা পড়িল, লিখিল, নম্বর পাইল, পাস করিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হইল যখন আবার সত্যি সত্যি চন্দ্রগ্রহণ হইল তখন চন্দ্রকে রাহু গ্রাস করিয়াছে বলিয়া তাহারা ঢোল, করতাল, শঙ্খ লইয়া রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল। ইহা এক
আশ্চর্য ভারতবর্ষ৷’