পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মতুয়া সম্প্রদায় বহুদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি। দেশভাগের পর এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসে বসতি গড়েন। তাঁদেরই একটি বড় অংশ হল নমশূদ্র সম্প্রদায়ভুক্ত মতুয়ারা। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অবহেলা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নানা জটিলতার মধ্যে দিয়ে তাদের জীবনযাপন করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আবার এই সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ও অধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মতুয়া বড়মা বীণাপাণি দেবীর মৃত্যুবার্ষিকীতে এক বার্তায় অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিশেষত বিজেপি মতুয়াদের নাগরিকত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক খেলা খেলছে। তাঁর বক্তব্য, বহু প্রজন্ম ধরে যাঁরা এ দেশের নাগরিক, যাঁদের ভোটে সরকার গঠিত হয়েছে, তাঁদেরই আজ নতুন করে নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় বহু মতুয়া মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ এই আশঙ্কাকে আরও তীব্র করেছে।
এই প্রসঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে, নাগরিকত্ব কি সত্যিই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় হতে পারে? বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী, কর প্রদানকারী, সমাজের অংশ হয়ে ওঠা মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে যদি বারবার সংশয় তৈরি হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য সুস্থ লক্ষণ নয়। বিশেষ করে যখন সেই সংশয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ ওঠে, তখন বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
গত এক দশকে মতুয়া রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০১৯ বা সিএএ। এই আইনের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বিজেপি বারবার দাবি করেছে, এই আইনের মাধ্যমে মতুয়াদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নাগরিকত্বের আশ্বাসই যেন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভোটের আগে এই প্রতিশ্রুতি সামনে আনা হয়েছে, আবার নির্বাচন পেরিয়ে গেলে তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে।
এসআইআর নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ। যদি কোনও নাগরিক বহু বছর ধরে ভোট দিয়ে থাকেন, বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা পেয়ে থাকেন, তবে হঠাৎ তাঁর নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষ নতুন করে সিএএ-র অধীনে আবেদন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা এক ধরনের মানসিক অনিশ্চয়তারই প্রতিফলন।
এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, হাওড়া, কোচবিহার বা মালদার মতো জেলাগুলিতে মতুয়াদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তফসিলি জাতিভুক্ত সম্প্রদায়গুলির মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে তারা অন্যতম বড়। ফলে নির্বাচন রাজনীতিতে তাদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত দুটি লোকসভা নির্বাচনে এই সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নাগরিকত্বের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়েছে।
অন্যদিকে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা জরুরি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার মতুয়া সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। মতুয়া উন্নয়ন বোর্ড গঠন, উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রকল্প— এই সব পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজ্য সরকার মতুয়া সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখানোর চেষ্টা করেছে। মতুয়া ধর্মগুরুদের স্মৃতি ও ঐতিহ্যকে মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হল, কোনও সম্প্রদায়ের উন্নয়ন কেবল রাজনৈতিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তা— এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। মতুয়াদের ক্ষেত্রেও সেই একই সত্য প্রযোজ্য।আজকের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হল অনিশ্চয়তার অবসান। নাগরিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা, এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভরশীলতা— এই সব মিলিয়ে মতুয়া সমাজের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত দূর করা দরকার। খুব সঙ্গতভাবেই এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটাধিকার বা নাগরিকত্ব কোনও রাজনৈতিক দয়া নয়, এটি সংবিধানসম্মত অধিকার।
মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির অংশ। তাঁদের পরিচয় বা অধিকার নিয়ে যদি বারবার প্রশ্ন তোলা হয়, তবে তা কেবল একটি সম্প্রদায়ের সমস্যাই নয়, এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোরও চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক দলগুলির উচিত এই সংবেদনশীল বিষয়কে ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধানের পথ খোঁজা। কারণ শেষ পর্যন্ত নাগরিকত্বের প্রশ্নে অনিশ্চয়তা নয়, নিশ্চয়তাই গণতন্ত্রের ভিত্তি। মতুয়া সমাজের ক্ষেত্রেও সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করাই এখন কর্তব্য।