প্রতিকূলতার মধ্যেও ফিজার জয়

Photo: Pexels (প্রতীকী ছবি)

‘আমার ছেলে থাকলে সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতো’— বাবার মুখে উচ্চারিত একটি সাধারণ বাক্যই চার বছরের একটি শিশুর জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে, তা হয়তো নাজির আহমেদ নিজেও ভাবেননি। কিন্তু সেই কথাই তাঁর কন্যা ছোট্ট ফিজা নাজিরের মনে তৈরি করেছিল এক অদম্য সংকল্প— ছেলে না হয়েও তিনি বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করবেন। আজ সেই সংকল্পই তাঁকে নিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক মিক্সড মার্শাল আর্টসের মঞ্চে।

ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরের এই তরুণী শুধু একজন সফল অ্যাথলিট নন, প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পথ তৈরি করে নেওয়া এক সাহসী নারী। শৈশব থেকেই খেলাধূলায় তাঁর আগ্রহ। পাঁচ বছর বয়সে থাং-টা দিয়ে শুরু। স্কুল-কলেজে পৌঁছনোর আগেই জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং পদক অর্জন। পরে ২০১৯ সালে মিক্সড মার্শাল আর্টসকে বেছে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা। ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দুটি স্বর্ণপদক-সহ একাধিক পদক অর্জন তাঁর সেই যাত্রারই ফল।

ফিজার সাফল্যের তাৎপর্য কেবল পদকের সংখ্যায় নয়। যে ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাজনিত সমস্যা ও সামাজিক অনিশ্চয়তা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে, সেখানে একজন তরুণীর আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে নিজের জায়গা করে নেওয়া নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রীড়া-পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। এমএমএ-র মতো একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ও কঠিন খেলায় বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ কাশ্মীরে এখনও সীমিত। সেই কারণেই ফিজাকে দীর্ঘ সময় থাইল্যান্ডে থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে।


এখানেই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বের দিকে যায়। কোনও প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে যদি আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছতে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে প্রশিক্ষণ নিতে হয়, তবে শুধু সেই খেলোয়াড়ের অধ্যবসায়ের প্রশংসা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্র, দক্ষ কোচ, আধুনিক সরঞ্জাম, ক্রীড়া-চিকিৎসা এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতার সুযোগ। বিশেষ করে কাশ্মীরের মতো অঞ্চলে খেলাধূলাকে তরুণ প্রজন্মের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখার প্রয়োজন আরও বেশি।

ফিজার গল্পের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নারী-স্বাধীনতা। এমএমএ এমন একটি শারীরিকভাবে কঠিন খেলা, যেখানে আঘাতের ঝুঁকি রয়েছে এবং যা এখনও অনেকের চোখে পুরুষের ক্ষেত্র। ফলে একজন তরুণীর এই খেলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া সহজ নয়। তাঁর বাবা-মায়ের উদ্বেগও ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা মেয়ের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছেন। এই মানসিক পরিবর্তনও সমাজের পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ, ফিজা একসময় চিকিৎসক হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করেন, তাঁর প্রকৃত স্বপ্ন অন্যত্র। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার এই সাহসও তাঁর সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। কারণ সাফল্য শুধু অন্যের নির্ধারিত নিরাপদ পথ অনুসরণ করে আসে না, কখনও কখনও নিজের জন্য অনিশ্চিত পথটিই বেছে নিতে হয়।

ফিজার বাবা-মা তাঁর লড়াই সরাসরি দেখেন না। মেয়ে জয়ী হওয়ার পরের ছবিই তাঁরা দেখেন। এই ছোট্ট ঘটনাটির মধ্যে যেন রয়েছে এক পরিবারের ভালোবাসা, উদ্বেগ এবং গর্বের সম্পূর্ণ গল্প।

ফিজা নাজির তাই শুধু কাশ্মীরের একজন নারী এমএমএ ফাইটার নন, তিনি একটি সম্ভাবনার নাম। এখন প্রয়োজন তাঁর মতো আরও প্রতিভাকে উঠে আসার সুযোগ দেওয়া। কারণ একজন ফিজা নিজের শক্তিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছতে পারেন, কিন্তু একটি প্রজন্মকে এগিয়ে দিতে হলে তৈরি করতে হবে একটি শক্তিশালী ক্রীড়া-পরিকাঠামো। কাশ্মীরের তরুণদের হাতে সেই সুযোগ তুলে দেওয়াই হবে ফিজার সাফল্যের সবচেয়ে অর্থপূর্ণ স্বীকৃতি।