‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ ও যুদ্ধের খরচ এখন মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু

Photo: Statesman

পশ্চিম এশিয়ার আকাশে আবার আগুনের রেখা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন করে জ্বলে ওঠার পর কেবল মিসাইল বা ড্রোনের লড়াই নয়— এটি এখন সংখ্যার যুদ্ধও। কত ডলার খরচ হলো, কত জীবন হারাল, আর কতদিন এই যুদ্ধ চলবে— এই প্রশ্নগুলো ক্রমশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির সামনে দাঁড়িয়ে হেগসেথ যে পরিসংখ্যান তুলে ধরলেন, তা একদিকে যেমন বিস্ময়কর, অন্যদিকে উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইতিমধ্যেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার— যা মাত্র এক মাস আগের হিসাবের চেয়ে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেশি। অর্থাৎ যুদ্ধ কেবল চলছে না, তা দ্রুত আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই সংখ্যার ভেতরে শুধু অস্ত্র বা অপারেশনের খরচই নয়, রয়েছে এক বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মূল্য।

হেগসেথের বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি ছিল তাঁর সতর্কবার্তা— যদি কংগ্রেস দ্রুত নতুন তহবিল অনুমোদন না করে, তবে সামরিক প্রশিক্ষণ কমাতে হবে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে সেনাবাহিনীর প্রস্তুতিতে। তিনি কংগ্রেসের কাছে ৮৭ বিলিয়ন ডলারের নতুন বরাদ্দ চেয়েছেন, যার মধ্যে ৬৭ বিলিয়ন ডলার সরাসরি পশ্চিম এশিয়ার সামরিক অভিযানের জন্য। এই অঙ্কগুলো দেখলেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতকে সাময়িক বা সীমিত হিসেবে দেখছে না; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে বিতর্কের মূল সুর। ডেমোক্র্যাটদের একটি বড় অংশ এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, এই যুদ্ধের প্রকৃত খরচ আরও অনেক বেশি— কারণ ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘাঁটির পুনর্গঠন বা দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক ব্যয় এখনও এই হিসাবের বাইরে। সিনেটর প্যাটি ম্যুরে সরাসরি বলেছেন, ‘এটার কোনও অর্থ হয় না।’ আর ডিক ডারবিন জানতে চেয়েছেন, প্রকৃত ব্যয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব আদৌ আছে কি না।


এই প্রশ্নগুলো অমূলক নয়। সাম্প্রতিক ইতিহাসই দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রকৃত খরচ প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় বহুগুণ বেশি হয়ে দাঁড়ায়। ইরাক বা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা তার বড় উদাহরণ। ফলে ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার হয়তো কেবল আইসবার্গের চূড়া— নিচে লুকিয়ে রয়েছে আরও বড় আর্থিক দায়।

তবে হেগসেথের যুক্তিও সরল নয়। তিনি ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন— একটি পুরনো আমেরিকান সামরিক দর্শন, যা মনে করে যে শক্তিশালী অবস্থানই শেষ পর্যন্ত সংঘাত ঠেকাতে পারে। তাঁর মতে, এই বিনিয়োগ না করলে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে, এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা সুযোগ নেবে। এই বক্তব্যে একটি স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—চিন, রাশিয়া বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দিকে তাকিয়েই এই সতর্কতা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ আদৌ কতটা কার্যকর? বাস্তবতা হলো, গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক যুদ্ধ চালিয়েছে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই নতুন সংঘাতের জন্ম হয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রেও কি একই চক্র পুনরাবৃত্তি হচ্ছে?
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। হেগসেথ শুনানিতে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে দায়ী করেছেন সামরিক খাতে কম তহবিল বরাদ্দের জন্য। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ তুলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন নিয়মিত বাজেট প্রক্রিয়া এড়িয়ে জরুরি তহবিলের নামে অস্বচ্ছ ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে এই যুদ্ধ কেবল আন্তর্জাতিক নয়, এটি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনেরও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

নিউইয়র্কের সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্রান্ডের মন্তব্য সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে— যখন সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকার বোমা কেনার জন্য সীমাহীন অর্থ চাইছে। এই বক্তব্য আমেরিকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের উদ্বেগকে তুলে ধরে। যুদ্ধের খরচ শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপরই বর্তায়— এবং সেই চাপ এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

শুনানির সময় যে বিক্ষোভ দেখা গেল, সেটিও এই জনমতের প্রতিফলন। ‘ইরান ও প্যালেস্তাইনে আমাদের সন্তানদের ওপর বোমা হামলা বন্ধ করো’— এই স্লোগান কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, এটি যুদ্ধবিরোধী একটি বৃহত্তর সামাজিক মনোভাবের প্রকাশ। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যেমন আমেরিকার রাস্তায় প্রতিবাদ নেমেছিল, আজকের পরিস্থিতিও সেই স্মৃতিকে উসকে দিচ্ছে।

অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতাও কম কঠিন নয়। টানা ১১ দিন ধরে হামলা চলছে, পাল্টা হামলাও অব্যাহত। ইতিমধ্যেই কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, এবং আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এই মানবিক মূল্য যে কোনও আর্থিক হিসাবের বাইরে। একটি যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য কেবল ডলারে মাপা যায় না— তা মাপা যায় জীবনের ক্ষতিতে, পরিবারগুলোর শোকে, এবং সমাজের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাবের মধ্যে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি একদিকে যুদ্ধের সাফল্যের দাবি করছেন, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে পরোক্ষভাবে সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন। এই দ্বৈত অবস্থান আসলে রাজনৈতিক— একদিকে শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে জনমতের চাপ সামলানোর চেষ্টা।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি জটিল দ্বিধার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে সীমাহীন ব্যয় ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা। কংগ্রেস যদি এই তহবিল অনুমোদন করে, তবে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর যদি না করে, তবে সামরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

এই দ্বিধার কোনও সহজ সমাধান নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— এই যুদ্ধ কেবল ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের নয়, এটি আমেরিকার নিজস্ব ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি ‘প্রজন্মভিত্তিক সিদ্ধান্ত’ হয়ে উঠছে, যেমনটি হেগসেথ নিজেই বলেছেন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়— শান্তি কি সত্যিই শক্তির মাধ্যমে আসে, নাকি কূটনীতির মাধ্যমে? ইতিহাস বলছে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। আর্থিক ও মানবিক খরচ যত বাড়বে, ততই এই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে উঠবে। আমেরিকা এখন সেই প্রশ্নের মুখোমুখি—এবং তার উত্তর নির্ধারণ করবে শুধু এই যুদ্ধের পরিণতি নয়, আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথও।