বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বারবার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর হিংসাত্মক আন্দোলন দমনের সময় বহু মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়বদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিছক দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইন, মানবিকতা এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার বিষয়ও। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত সংযত, দায়িত্বশীল এবং আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত।
ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই অবস্থানকেই স্পষ্ট করেছে। তিনি জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে একটি আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া যথাযথ নিয়ম মেনেই এগোচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই প্রক্রিয়ার জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা সম্ভব নয়। ভারতের জন্য এটিই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য অবস্থান। কারণ, একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রত্যর্পণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আবেগ বা রাজনৈতিক চাপের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শেখ হাসিনা ভারতে এসেছিলেন অত্যন্ত আকস্মিক এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তিনি প্রথমে সামরিক হেলিকপ্টারে করে তাঁর বাসভবনের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হন এবং পরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিমানে ভারতে আসেন। ভারতের হাইকমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে ভারতে নিয়ে আসেনি ভারতীয় বায়ুসেনা বা ভারতীয় সেনা। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের ব্যবস্থাপনাতেই তাঁর দেশত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। সেই মুহূর্তে তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সামনে কার্যত সীমিত বিকল্পই ছিল।
এই বাস্তবতাটি মনে রাখা জরুরি। প্রতিবেশী দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছে যায় এবং একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তার কারণে আশ্রয় চান, তখন মানবিক বিবেচনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা কোনও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পক্ষে সহজ নয়। ভারত সেই সময় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা কোনও রাজনৈতিক পক্ষকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং সেটিকে দেখা উচিত তৎকালীন পরিস্থিতিতে মানবিক ও বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ যে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে, তাকেও ভারত অগ্রাহ্য করছে না। দুই দেশের মধ্যে ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তিতে প্রত্যর্পণ বন্ধ করার নির্দিষ্ট কিছু কারণের কথাও বলা হয়েছে, যার মধ্যে রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধের বিষয়টি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের দাবি পাওয়ার পর ভারতের দায়িত্ব হল অভিযোগগুলির আইনি ভিত্তি, প্রমাণ, চুক্তির শর্ত এবং প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা।
ভারতের আরও একটি মৌলিক অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে ভারত হস্তক্ষেপ করতে পারে না এবং করা উচিতও নয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল একটি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নয়; এটি দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই শেখ হাসিনার প্রশ্নে এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা ভারত-বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে অকারণে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হল— আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া। বাংলাদেশের দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা, কিন্তু কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি না স্বীকার করা; মানবিক দিকটি বিবেচনায় রাখা, আবার আইনের শাসনের প্রয়োজনীয়তাও অক্ষুণ্ণ রাখা— এই ভারসাম্যই ভারতের কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় হবে।
প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে তাড়াহুড়ো নয়, উত্তেজনাও নয়— প্রয়োজন স্বচ্ছতা, সংযম এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা। ভারতের অবস্থান যদি এই নীতির উপর অটুট থাকে, তবে তা শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলাতেই সহায়ক হবে না, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ককেও আরও স্থিতিশীল ভিত্তি দেবে।