ভারতের শীর্ষ আদালতের বিচারপতির সংখ্যা ৩৪ থেকে বাড়িয়ে ৩৮ করার জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিচারব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়— এতে কি সত্যিই বিচারপ্রক্রিয়ার জট খুলবে, নাকি এটি কেবল একটি সাময়িক উপশম মাত্র?
বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলার জট ক্রমেই বাড়ছে। কয়েক বছরের মধ্যে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। যদিও পরিসংখ্যান বলছে, সর্বোচ্চ আদালতে মোট বিচারাধীন মামলার শতাংশ খুবই কম, কিন্তু এই তথ্য আংশিক সান্ত্বনা দিলেও মূল সমস্যাকে আড়াল করে। কারণ, বিচারব্যবস্থার প্রকৃত সংকটটি নিহিত রয়েছে নিম্ন ও মধ্যস্তরের আদালতগুলিতে, যেখানে অধিকাংশ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে কেবলমাত্র শীর্ষ আদালতে বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি সমস্যার মূলে পৌঁছতে পারে না। বরং এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার সামান্য উপসর্গমাত্র। সর্বোচ্চ আদালত মূলত আপিল ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নানা কারণে এর কার্যপরিধি ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। ফলে, এমন অনেক মামলা এখানেও পৌঁছে যাচ্ছে, যেগুলি নিম্ন আদালত স্তরেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত ছিল।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকার নিজেই দেশের বৃহত্তম মামলাকারী। বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কর সংক্রান্ত বিরোধ, জমি অধিগ্রহণ বা পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যা— এসব ক্ষেত্রেই সরকার প্রায়শই আদালতের দ্বারস্থ হয় অথবা মামলার পক্ষভুক্ত হয়। ফলে মামলার সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে, দায়িত্বশীল মামলাকারী হিসেবে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় মামলা এড়ানো এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথকে উৎসাহ দেওয়া— এই দুটি দিকেই জোর দেওয়া প্রয়োজন।
বিচারব্যবস্থার আরেকটি গভীর সংকট হল বিচারকের স্বল্পতা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় ভারতে বিচারক-জনসংখ্যার অনুপাত অত্যন্ত কম। এর ফলে প্রতিটি বিচারকের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ে, যার ফলে মামলার নিষ্পত্তির গতি কমে যায়। শুধুমাত্র শীর্ষ আদালতে নয়, জেলা ও অধস্তন আদালতগুলিতেও ব্যাপক সংখ্যায় বিচারক নিয়োগ জরুরি। কারণ, বিচারপ্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি এই স্তরেই গড়ে ওঠে।
এছাড়া, বিচারপ্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে, ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি এবং কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম উন্নত করে বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই দিকটি কিছুটা অগ্রসর হলেও এখনও অনেক পথ বাকি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচারপ্রার্থীর দৃষ্টিকোণ। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে বিচারপ্রাপ্তির অধিকার কার্যত ক্ষুণ্ণ হয়। বিশেষ করে, যাঁরা বিচারাধীন অবস্থায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকেন, তাঁদের জন্য এই বিলম্ব এক গভীর মানবাধিকার সমস্যার রূপ নেয়। তাই দ্রুত এবং কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও।
এই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক সূচনা হলেও, এটি কোনও চূড়ান্ত সমাধান নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার পরিকল্পনা, যেখানে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিচারপ্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণ, সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা— সবকিছুকে একত্রে বিবেচনা করা হবে।
অতএব, এই সিদ্ধান্তকে একটি বৃহত্তর সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত। নচেৎ, বিচারব্যবস্থার জটিল সমস্যার সামনে এটি কেবল একটি সাময়িক প্রতিকার হিসেবেই থেকে যাবে।