ইউজিসি-নেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। এর ফলের উপর নির্ভর করে পিএইচডি-তে ভর্তির সুযোগ, জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ এবং সহকারী অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতা। ফলে এই পরীক্ষাকে ঘিরে ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতি দীর্ঘদিনের। পরীক্ষা বাতিল হলে শুধু একটি পরীক্ষার দিন নষ্ট হয় না; তাঁদের সময়, শ্রম, মানসিক প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
এবারের পরীক্ষায় একাধিক প্রশ্ন আগের পরীক্ষার সঙ্গে হুবহু বা প্রায় একই ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সমাজতত্ত্বের প্রশ্নপত্রে বানান ভুল ছিল, এমন প্রশ্নও ছিল যা নির্ধারিত পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উত্তরপত্রের চাবিকাঠি প্রকাশে বিলম্ব। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ভর্তি ও পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের নানা প্রক্রিয়াও এর ফলে পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, পরীক্ষার পরেই নাকি এই অসঙ্গতিগুলির কথা এনটিএ-কে জানানো হয়েছিল। অথচ সংশ্লিষ্ট সংস্থা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছে। একটি জাতীয় স্তরের পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার ক্ষেত্রে এমন উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।এনটিএ-র ব্যর্থতার তালিকা নতুন নয়।
প্রতিবারই প্রশ্ন ওঠার পর সংস্কারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির সাহায্যে নজরদারি, প্রশ্নপত্রের গতিবিধি অনুসরণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, দক্ষ আধিকারিক নিয়োগ— বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে আইনও কঠোর করা হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও যদি একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসে, তা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে— সমস্যাটি কি কেবল ব্যবস্থার, নাকি প্রতিষ্ঠানের কাজ করার পদ্ধতির মধ্যেই গভীর ত্রুটি রয়েছে?
এখানে সরকারের দায়িত্বও কম নয়। এনটিএ কোনও স্বাধীন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। তার কাজকর্মের উপর প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। ফলে এনটিএ ব্যর্থ হলে তার দায় থেকে সরকারও সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারে না। নতুন শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে গোটা ব্যবস্থাটিকে নতুন করে পর্যালোচনা করার।
সবচেয়ে জরুরি হল, পরীক্ষার্থীদের যেন আর পরীক্ষাব্যবস্থার ভুলের মূল্য দিতে না হয়। একটি পরীক্ষা পরিচালনার মূল দায়িত্ব হল নির্ভুল প্রশ্নপত্র, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, সময়মতো ফল এবং দ্রুত অভিযোগের নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা। এর কোনও একটি ব্যর্থ হলে তার প্রভাব হাজার হাজার তরুণের জীবনে পড়ে।
তাই এখন শুধু নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া যথেষ্ট নয়। এনটিএ-র প্রতিটি স্তরে কোথায় গলদ হচ্ছে, কেন অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নিতে দেরি হচ্ছে এবং বারবার একই ধরনের ভুল কেন ঘটছে— তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে পরীক্ষার দায়িত্ব বিকেন্দ্রীকরণের কথাও ভাবতে হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে তাদের নিজস্ব পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অন্তত গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
পরীক্ষা কোনও পরীক্ষার্থীর কাছে নিছক একটি দিনের ঘটনা নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু মাসের পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নিয়ে কোনও সংস্থার গাফিলতি বা অদক্ষতার সঙ্গে আপস করা যায় না। এনটিএ-কে তাই শুধু পরীক্ষার আয়োজনকারী সংস্থা হিসেবে নয়, পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। সময় এসেছে প্রশ্ন করার— আর কত ব্যর্থতার পরে এই ব্যবস্থার সত্যিকারের সংস্কার হবে?