মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভা ১২০ একর জমি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামরিক পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য এই জমি ব্যবহার করা হলে ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও
শক্তিশালী হবে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এক সরু ভূখণ্ড— শিলিগুড়ি করিডর, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি সংলগ্ন এই অঞ্চল একদিকে নেপাল, অন্যদিকে বাংলাদেশ, খুব কাছেই ভুটান এবং অদূরে চিনের উপস্থিতির কারণে বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এই করিডর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ভারতের উত্তর-পূর্বের আটটি রাজ্যের সঙ্গে স্থল যোগাযোগ কার্যত ভেঙে পড়বে। তাই সামরিক বিশেষজ্ঞরা একে ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক জুগুলার ভেইন’ বলেও উল্লেখ করেন। চিকেনস নেক শুধুমাত্র একটি রাস্তা নয়, এটি ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং কূটনৈতিক স্থিতিশীলতার ‘লাইফলাইন’।
চিকেনস নেকের বর্তমান গুরুত্বের পেছনে রয়েছে দেশভাগের ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে পূর্ববঙ্গ, আসাম ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে বিস্তৃত রেল ও সড়ক যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টি হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল একটি সরু করিডরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় তৎকালীন জওহরলাল নেহরু সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভারতের মূলধারার সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে যুক্ত রাখার উদ্যোগ নেয়। নেহরু উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। তাই সীমান্ত সড়ক, সেনা ঘাঁটি ও প্রশাসনিক পরিকাঠামো নির্মাণের সূচনা হয়। যদিও সেই সময় জাতীয় নিরাপত্তার তুলনায় রাজনৈতিক সংহতিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধ ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনে। যুদ্ধের সময় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে পুরো অঞ্চল ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর পরবর্তী সময়ে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার সীমান্ত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। সীমান্ত সড়ক সংস্থার কার্যক্রম জোরদার হয়। উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বে সেনা মোতায়েন বাড়ানো হয়। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময়ও চিকেনস নেকের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ এই করিডর দিয়েই ভারতীয় সেনার রসদ, অস্ত্র ও সামরিক যোগাযোগের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়েছিল।
১৯৮০ এবং ৯০-এর দশকে উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, জঙ্গি কার্যকলাপ এবং সীমান্ত চোরাচালান কেন্দ্রীয় সরকারকে আরও সতর্ক করে তোলে। কংগ্রেস সরকার সেই সময় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি এবং রেল ও সড়ক উন্নয়নের দিকে জোর দেয়। একই সঙ্গে শিলিগুড়িকে উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘গেটওয়ে’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে পি ভি নরসিংহ রাও ‘লুক ইস্ট পলিসি’ চালু করেন, যার লক্ষ্য ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত করা। এই নীতির ফলে চিকেনস নেক শুধুমাত্র সামরিক করিডর নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে শুরু করে।
এরপর অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে জাতীয় সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এবং সীমান্ত পরিকাঠামো নির্মাণ নতুন গতি পায়। উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতে রেল যোগাযোগ বাড়ানো হয়। একাধিক সামরিক ঘাঁটি আধুনিকীকরণ করা হয়। তবে বর্তমান সময়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ চিকেনস নেককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ বর্তমান সরকার উত্তর-পূর্ব ভারতকে শুধু সীমান্ত অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং ভূরাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। একাধিক এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন রেলপথ, প্রতিরক্ষা করিডর, আধুনিক বিমানবন্দর এবং সীমান্ত নজরদারি প্রযুক্তি এই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে চিকেনস নেকের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। চিনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল, দক্ষিণ এশিয়ায় তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব, এবং ডোকলাম ইস্যু ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে বাড়িয়েছে। ২০১৭ সালের ডোকলাম অচলাবস্থার সময় ভারতীয় সেনা ও চিনা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, ভুটান-চিন সীমান্তে যে কোনও পরিবর্তন ভারতের জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ ডোকলাম মালভূমি চিকেনস নেকের খুব কাছেই অবস্থিত।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি চিন কখনও এই অঞ্চলে কৌশলগত আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ বিপন্ন হতে পারে। সেই কারণেই ভারত সরকার উত্তরবঙ্গ ও সিকিম অঞ্চলে সামরিক পরিকাঠামো, রাস্তা, রেলপথ, বিমানঘাঁটি এবং নজরদারি ব্যবস্থাকে দ্রুত শক্তিশালী করছে। চিকেনস নেক বা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা কেবল সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক আর্থসামাজিক স্থিতি ও উন্নয়ন। ইতিহাস দেখিয়েছে, যে কোনও কৌশলগত সীমান্ত অঞ্চল তখনই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও স্থিতিশীল থাকে, যখন সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবকাঠামো শক্তিশালী হয়। শুধুমাত্র সেনা মোতায়েন, নজরদারি বৃদ্ধি বা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি স্থানীয় মানুষের মধ্যে বঞ্চনা, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার-সহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ আজও শিল্পোন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও আধুনিক পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে ভারতের বহু অঞ্চলের তুলনায় পিছিয়ে। চা শিল্পের সংকট, কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা, যুবসমাজের বেকারত্ব এবং পর্যাপ্ত উচ্চশিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যপরিষেবার অভাব এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এই ধরনের পরিস্থিতি সীমান্তবর্তী এলাকায় অসন্তোষ, অবৈধ অর্থনীতি, চোরাচালান, মাদক পাচার কিংবা বিদেশি গোয়েন্দা ও জঙ্গি নেটওয়ার্কের প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেবল সীমান্ত পাহারার বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে উন্নয়ন ও মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এই কারণেই চিকেনস নেকের সুরক্ষা বলতে শুধু সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি নয়, বরং একটি শক্তিশালী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলাকে বোঝায়। উত্তরবঙ্গকে যদি পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস, পর্যটন, শিক্ষা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এই অঞ্চল ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উত্তরবঙ্গ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগের একটি প্রাকৃতিক প্রবেশদ্বার। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও পরিবহন সংযোগ উন্নত করা গেলে এখানে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
পর্যটন, চা-ভিত্তিক শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ, সীমান্ত বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিবহন পরিষেবাকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গকে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডরে রূপান্তরিত করা সম্ভব। একইসঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে যুবসমাজের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা গেলে এই অঞ্চল আরও স্থিতিশীল ও আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে। তখন চিকেনস নেক কেবল একটি দুর্বল ভূ-রাজনৈতিক করিডর নয়, বরং ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।