নিরাপত্তায় আর কোনও আপস নয়

Image: ANI

কলকাতার কেন্দ্রস্থলে হোটেল, গেস্টহাউস ও রেস্তোরাঁগুলিতে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক কড়া পদক্ষেপকে ইতিবাচক ভাবেই দেখতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম না মানার অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এবার নোটিসের পর নোটিস না দিয়ে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা সময়োপযোগী। মানুষের জীবন নিয়ে কোনও প্রশাসনিক গাফিলতি বা আপস বরদাস্ত করা যায় না।

সম্প্রতি মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুনে ন’জন মানুষের মৃত্যু আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। হোটেলে মানুষ আসেন নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশায়। পর্যটক, কর্মী কিংবা সাধারণ অতিথি— কেউই সেখানে গিয়ে আগুনের ঝুঁকি নিয়ে থাকার কথা ভাবেন না। অথচ যদি কোনও হোটেল প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই বছরের পর বছর চলতে থাকে, তাহলে সেটি শুধু নিয়মভঙ্গ নয়, মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবহেলা।

এই কারণেই রাজ্য সরকারের বর্তমান উদ্যোগকে স্বাগত জানানো দরকার। কেন্দ্রীয় কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মারকুইস স্ট্রিট ও নিউ মার্কেট অঞ্চলের ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে খালি করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে অতিথিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান সিল করে দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা প্রশাসনের কঠোর মনোভাবেরই পরিচয়। কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমতি ঠিকঠাক থাকলে পরে পুনরায় খোলার সুযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু নিয়ম না মেনে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আর থাকা উচিত নয়।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই ব্যবস্থা এত দিন নেওয়া হল না কেন? যেসব প্রতিষ্ঠানকে আগে একাধিকবার নোটিস দেওয়া হয়েছিল, তারা কীভাবে আবারও ব্যবসা চালিয়ে গেল? অগ্নিনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিস জারি করেই যদি প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেই নোটিসের কার্যকারিতা কোথায়? ন’জন মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ার পর কেন এত তৎপরতা?


এই প্রশ্নগুলির উত্তর অবশ্যই খুঁজতে হবে। দায় শুধু বর্তমান প্রশাসনের নয়, অতীতে যাঁরা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতাও খতিয়ে দেখা দরকার। কোন প্রতিষ্ঠান কী অনুমতিতে চলেছে, ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট ছিল কি না, পরিদর্শন নিয়মিত হয়েছে কি না এবং নিয়মভঙ্গ ধরা পড়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল— সবকিছু স্বচ্ছভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ যদি সত্যি হয় যে, অর্থের বিনিময়ে অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, তাহলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। তবে রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে বিষয়টি আটকে গেলে চলবে না। দোষী যে-ই হোন, তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

কলকাতা একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যিক শহর। কেন্দ্রীয় কলকাতার হোটেল ও অতিথিশালাগুলিতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বহু মানুষ থাকেন। তাঁদের নিরাপত্তার দায় প্রশাসনের যেমন, তেমনই হোটেল মালিকদেরও। ব্যবসা করার অধিকার আছে, কিন্তু সেই অধিকারের সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্বও জড়িয়ে আছে।

ন’টি প্রাণের বিনিময়ে আমরা যেন শুধু কয়েক দিনের অভিযান না দেখি। এই অভিযানকে নিয়মিত ও স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা—সবকিছু নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। কোথাও গাফিলতি ধরা পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকারের কঠোর পদক্ষেপ তাই অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই কঠোরতা যেন সাময়িক না হয়। নোটিসের সংস্কৃতি থেকে বাস্তব প্রয়োগের সংস্কৃতিতে প্রশাসনকে যেতে হবে। কারণ আগুন লাগার পর ক্ষতিপূরণ দিয়ে হারানো জীবন ফিরিয়ে আনা যায় না। মানুষের জীবন রক্ষাই প্রশাসনের প্রথম এবং সর্বোচ্চ দায়িত্ব।